অদম্য স্বাধীনতা সংগ্রামী সার্জেন্ট জহুরুল হক

মুহাম্মদ শামসুল হক

বৃহস্পতিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৪:০৮ পূর্বাহ্ণ
15

বাংলাদেশকে পাকিস্তানি উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েমের অদম্য আকাঙক্ষা ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ সাহসী সৈনিক সার্জেন্ট জহুরুল হক। বাংলাদেশকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ যে ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে কথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়েছিল তাতে ১৭ নং আসামি ছিলেন সার্জেন্ট জহুর। কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ফাঁসির হুমকি মাথায় নিয়েও তিনি স্বাধীনতার ব্যাপারে অবিচল ছিলেন এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে মামলা চলাকালে সব ঘটনা প্রকাশ্য স্বীকার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জীবন বিপন্নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবার আশঙ্কার ব্যাপারে আইনজীবী, বঙ্গবন্ধু ও অন্য সহকর্মীদের যুক্তি মেনে নিয়ে তিনি ক্ষান্ত হন।

নোয়াখালীর সুধারামপুর থানার সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা কাজী মুজিবুল হকের ছেলে সার্জেন্ট জহুরুল হক ছিলেন করাচিতে বিমান বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষক। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আটক অবস্থায় টয়লেটে যাবার সময় একজন পাকিস্তানি নিরাপত্তা রক্ষী তাঁকে সামনাসামনি গুলি করে হত্যা করে।

আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ব্রিগেডিয়ার (অব.) খুরশিদ উদ্দিন এবং করপোরাল এবিএম সামাদ ছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এ লেখককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁরা জানান, সার্জেন্ট জহুর ও সার্জেন্ট ফজলুল হক ছিলেন কমান্ডো গ্রুপের সদস্য। বন্দী থাকা অবস্থায় তাঁরা দেখেন কারাগার এলাকায় আসা ভিক্ষুক ও স্থানীয় বাঙালি চাকরদের ওপর পাকিস্তানিরা চরম দুর্ব্যবহার করতো। সার্জেন্ট জহুর ও ফজলুল হক এর প্রতিবাদ করতেন। এতে তাঁরা পাকিস্তানিদের রোষানলে পড়েন। ঘটনার আগের দিন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা মন্‌জুর এক বাঙালি ভিক্ষুকছেলের পেটে লাথি মেরে ফটকের বাইরে পাঠিয়ে দেন। এতে উত্তেজিত হয়ে সার্জেন্ট জহুর ওই কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, ‘আজ যে ছেলেটাকে তুমি লাথি মেরে তাড়িয়ে দিয়েছ, সেরকম তোমাদেরও একদিন বাংলাদেশ থেকে লাথি মেরে তাড়ানো হবে।’ এর পরদিন তাঁকে হত্যা করা হয়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য বেয়নেট চার্জ করা হয় তাঁর শরীরে। পরে তিনি সিএমএইচে মারা যান। আগরতলা মামলার আর এক অভিযুক্ত মাহফুজুল বারী বলেন, সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনা আমরা বন্দী অবস্থায় কক্ষের ফটক দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য তাঁর শরীরে বেয়নেট চার্জ করা হয়। সিএমএইচে এক বাঙালি চিকিৎসক মেজর আলী তাঁর অপারেশন করেন। কিন্তু চেষ্টা করেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। গুলিবিদ্ধ ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এ সময় ঐতিহাসিক ছয় দফা ও ১১ দফা এবং শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে জোরদার আন্দোলন চলছিল। সার্জেন্ট জহুরুল হকের মৃত্যু সংবাদ অল্পক্ষণের মধ্যে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজপথের আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু ও অন্য বন্দীদের মুক্তির দাবিতে োগানসমাবেশে মুখর হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মানুষ। বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। অবস্থা দেখে আদালত ১০ মার্চ পর্যন্ত মামলার শুনানি স্থগিত রাখে। তবে তার আগে গণআন্দোলনের মুখে ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এর আগে থার্ড পাঞ্জাব রেজিমেন্টে বন্দী আসামিরা এই হত্যার প্রতিবাদে অনশন পালন করেন।

সার্জেন্ট জহুরুল হক এবং সার্জেন্ট জলিল ছিলেন একই বেসের। জলিলের বাসা একাধিক গোপন বৈঠক ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহূত হতো। সেই সুবাদে জহুরুল হক সম্পর্কে অনেক কিছুই জানার কথা ফ্লাইট সার্জেন্ট (অব.) জলিলের। তিনি বলেন, সার্জেন্ট জহুর আমাদের অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল সাংগঠনিক তৎপরতার এক পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সার্জেন্ট জহুর আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, তিনি অনেক আগে থেকেই এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন যা আমি জানতাম না, জানতেন মফিজ উল্লাহ (মামলার সাক্ষী)। এতে বোঝা যায়, এক একজন সদস্য আর একজন সদস্যের কাছে পরিচয় প্রকাশের আগে কী রকম পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। তবে সার্জেন্ট জহুর দৃশ্যত আমাদের দলভুক্ত হওয়ার আগে, আমাদেরকে অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় (রিফ্রেশার ট্রেনিং) তাঁর কিছু কর্মকাণ্ড আমার নজরে আসে। যেমন প্রশিক্ষণ চলতো বিকেলে অফিস সময়ের পর। অনেকেই চাইতেন কীভাবে প্রশিক্ষণ এড়িয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা যায়। কিন্তু সার্জেন্ট জহুর অবাঙালিদের ছুটি দিলেও বাঙালিদের দিতেন না। আমাদের সঙ্গে খোলামেলা হওয়ার পরই তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, তিনি মনে করতেন, প্রত্যেক বাঙালিকেই অস্ত্র পরিচালনায় পারদর্শী হতে হবে যাতে ডাক এলেই তাঁরা ঠিকমতো কাজ করতে পারেন।

সার্জেন্ট জহুরের দায়িত্ব ছিল গোপন দলে অন্তর্ভুক্তদের ‘হ্যান্ড গ্রেনেড’ চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়ার। এ জন্য এমন এক বাসা খোঁজা হচ্ছিল যা গুপ্তচরদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকবে। শেষে সার্জেন্ট জলিলের বাসাটাই প্রশিক্ষণের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’ নামকরণ করা হয়। ঢাকায় সার্জেন্ট জহুরের স্মৃতি রক্ষায় গঠিত ‘শহীদ সার্জেন্ট জহুর স্মৃতি সংসদ’ প্রতি বছর তাঁর স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

লেখক : সম্পাদক, ইতিহাসের খসড়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকর্মী।

x