অন্তরা’র পরিবেশনা সুরালোক

বিশ্বজিৎ পাল

বৃহস্পতিবার , ১০ মে, ২০১৮ at ৪:৪৮ পূর্বাহ্ণ
37

২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় সুরের তরঙ্গে নিজেকে বিলিয়ে দিতে থিয়েটার ইনস্টিটিউটে ভিড় জমিয়েছিলেন সঙ্গীতপ্রেমীরা। নগর ব্যস্ততা উপেক্ষা করে ছুটে এসেছেন অন্য রকম অনুভূতি,অন্যরকম পরিবেশনার শুদ্ধ সঙ্গীতের মূর্ছনায় সুরের সাগরে ঝাঁপ দিতে।

৩৫ বর্ষপূর্তি উদ্‌যাপন উপলক্ষে অন্তরা হাওয়াইয়ান গীটার শিল্পী গোষ্ঠী, চট্টগ্রাম গিটারের মোহণীয় সুরে সংগীত পিপাসুদের এই সন্ধ্যার উপহার দেন। গিটার ও নাচের যুগলবন্দী দিয়েই শুরু হাওয়াইয়ান গীটার বাদন সন্ধ্যা “সুরালোক ” অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হলেও ৭টা থেকে বর্ণাঢ্য আলোর ঝলকানিতে মঞ্চ উজ্জীবিত হয়। সুরের বাহন হিসেবে হাওয়াইয়ান গিটারকে অনুষঙ্গ করে ‘অন্তরা’ দীর্ঘ তিন দশকের অধিক কাল ধরে পথ চলে আসছে। বাংলাদেশের প্রথম হাওয়াইয়ান গিটার ভিত্তিক এই সংগঠনের যাত্রা চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হয় ১৯৮৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর।

সন্ধ্যার সাথে সাথে মঞ্চের সামনের খালি চেয়ারগুলো ভরে গেল। মঞ্চের পর্দা সরেনি তখনো। পর্দার অপর পাশ থেকে ভেসে আসছে সুর। ধীরে ধীরে পর্দা সরতেই দেখা গেল হাওয়াইয়ান গিটারে সুর তুলছেন ইমন রাগাশ্রিত কম্পোজিশন ‘রিলাক্সেশন ফর সোল’। মোহন বীনায় উপস্থাপন করলেন প্রদীপ দাশ পরাগ। তাঁর সাথে রাজীব চৌধুরী, শুক্লা আচার্য্য ও তারমিলা উর রহমানের সমবেত গীটার বাদনের মাধ্যমেই সুরেলা সন্ধ্যার সূচনা হয়। গিটারের সুরের ছন্দে ছন্দে নাচলেন একদল নৃত্যশিল্পীও। সেলফি, ক্যামেরার ক্লিকে তখন পরিবেশ আলোকময় হয়ে ওঠে। যন্ত্র আর সুর সব তাল মিলে যায় এক স্রোতে। বাদ্যযন্ত্র যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল পুরো প্রাঙ্গন। সংগীতানুরাগীদের হৃদয়ে উঠেছিল মায়াবী শব্দতরঙ্গের স্নিগ্ধ পরশ। সুরপ্রেমীরা ভেসেছেন সুরতাললয়ের সাগরে। অবগাহন করেছে সংগীতের স্বর্গীয় সুধায়।

সুরালোক’ উদ্বোধন করেন কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। ডা. বাবুল সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার মনোজ সেনগুপ্ত। তিনি শিল্পীদের প্রতিভার ক্রমবিকাশে বর্তমান সরকারের গৃহিত বিভিন্ন সুন্দর পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চায় অন্তরা’র কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। অন্তরা’র সাধারণ সম্পাদক স্বাগত বক্তব্যে সংস্কৃতি চর্চায় প্রকৃত ও গুনী শিল্পীদের জীবনমান উন্নয়নে নানা সীমাবদ্ধতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব রয়েছে জানান। গিটারের উৎকর্ষ সাধনে নিয়মিত অনুশীলন ও প্রশিক্ষণের উপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। এ কথামালা শেষে মঞ্চে আবার বেজে ওঠে হাওয়াইয়ান গিটারের সুর। মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদের স্মরণে – ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি দিয়ে নিখুঁতভাবে সুর তুললেন সানু দাশগুপ্ত। মিউজিকের সাথে উপস্থিত সকলে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। এ সুরে ক্ষনিকের জন্য সকলে ফিরে যান স্বাধীনতার সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিতে।

বর্ষীয়ান গীটার শিল্পী মানবেন্দ্র বড়ুয়াকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন আশীষ কুমার বৈদ্য, ডা. নাজনীন আক্তার সেতু, শাশ্বত সেনগুপ্ত ও প্রিয়ম দাশ। অন্তরা’র মিউজিক্যাল স্কুলের গিটার প্রশিক্ষক সানু দাশগুপ্তকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে তাঁরই প্রিয়ভাজন শিক্ষার্থীবৃন্দ। উত্তরীয় পরিয়ে দিয়ে সম্মাননা প্রদান করেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। অনুষ্ঠানে অন্তরাকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন যোসেফ সাংস্কৃতিক পরিষদ, সুরাঙ্গন শিল্পী গোষ্ঠী, চাঁদের হাট, চট্টগ্রামের সদস্য ও সদস্যাবৃন্দ।

এরপর ড. উদিতি দাশ বাজালেন রবি ঠাকুরের ‘আজ জোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’ গানটি। শিল্পী পার্থ প্রতিম দাশগুপ্ত ভারতীয় আধুনিক গান ‘ও তোতা পাখিরে’ গানটিতে গিটারে সুর তুললেন। ‘শত জনমের স্বপ্ন, আমার জীবনে এলে’ এই কালজয়ী বাংলা গানটি শিল্পী শুক্লা আচার্য তার সুন্দর বাদন শৈলীতে মুগ্ধ করলেন। এরপর ‘আমার পরাণ যাহা চায়’ গিটারে বাজিয়ে শোনালেন প্রবীণ গিটার বাদক লায়ন ডাঃ বাবুল সেনগুপ্ত। শিল্পী বিশুতোষ তালুকদার বাজালেন কবি নজরুল এর রাগাশ্রিত গান ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’ গানটি। ‘আমার মনের ফুলদানিতে রেখো তোমার মন’ শেখ ইসস্তিয়াকের গানটি বাদনশৈলিতে হল ভর্তি দর্শকদের মুগ্ধ করলেন শিল্পী রাজীব চৌধুরী। ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে’ যায় গানটি অসাধারণভাবে গিটারে উপস্থাপন করেন শিল্পী তারমিলা উর রহমান। দুর্জয় পাল বাজালেন লোকগীতি ‘সোহাগ চাঁদ বদনী ধনী নাচ তো দেখি’। শিল্পী ইলিয়াছ ইলু ‘চোখের নজর এমটি কইরা’ গানটি বাজিয়ে শ্রোতাদের মাতালেন। অমর শিল্পী মান্না দে এর অনুরাগী শিল্পী প্রদীপ দাশ পরাগ অত্যন্ত মুন্সিয়ানায় গীটারে বাজালেন ‘তুমি নয় নাই কাছে আসলে’। প্রকৃতিকে নিয়ে পাহাড়ী নৃগোষ্ঠির ‘উত্তন প্যাগে মেঘে মেঘে’ গানটিতে শিল্পী আশীষ কুমার বৈদ্য’র গিটার পরিবেশনার সঙ্গে পাহাড়ী ঢং এর নৃত্যটি বেশ উপভোগ্য ছিল। ‘কথা কেন তুই বলিস না’ বাংলা চলচিত্রে গাওয়া না লায়লার গানটি গিটারে পরিবেশন করেন শিল্পী মনজুল হক মঞ্জু। ‘আজ নয় গুনগুন পাশ্চত্য ঢং’ এর এই আধুনিক গানটি গিটারে উপস্থাপন করেন শিল্পী দেবাশীষ দত্ত দেবু। হৃদয়গ্রাহী ভাটিয়ালি গান ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী’ অসাধারণ সুর মূর্চ্ছনায় গিটারে পরিবেশন করেন শিল্পী অরূপ তালুকদার।

শোভন সেনগুপ্ত ও তমালিকা বিশ্বাসের উপস্থাপনায়, সঞ্চিতা দত্ত বেবীর নৃত্য পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করেন সুদীপ দত্ত, সার্বাণী সেনগুপ্ত, প্রণামী চৌধুরী, তন্ময় বড়য়া, দিপ্ত, স্বপ্নীল সেন, মেঘা, শ্রেয়া, সেঁজুতি, বর্ণি, প্রিয়ন্তি, মন্দিরা ও সাবরিনা। গ্রন্থনায় ছিলেন ড. উদিতি দাশ। অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি সুদৃশ্য স্মরণিকা “সুরছন্দ” প্রকাশিত হয়।

এছাড়া যন্ত্রানুষঙ্গে কীবোর্ড ছিলেন,নিখিলেশ বড়ুয়া, তবলায়মৃদুল পারিয়াল, অক্টোপ্যাডরণি চৌধুরী, হাওয়াইয়ান গীটারসানু দাশ গুপ্ত, পারকিউশানরঞ্জিত কর্মকার, বেইস গীটারতন্ময় বড়ুয়া, বাঁশিপ্রাণেশ্বর ভট্টাচার্য, শব্দ নিয়ন্ত্রণেমো: ইলিয়াছ ইলু, অনুষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন শিমুল দত্ত, সুজিত নন্দী, এনামুল হক মজুমদার। সুদৃশ্য মঞ্চ সজ্জায় দুলাল কান্তি দে। পরিশেষে শিল্পী তাজুল ইসলাম টুটুল ‘দেখা হে পেহেলী বারসমধিক শ্রুত হিন্দি গান পরিবেশনার মাধ্যমে সমাপ্ত মিলনমেলা।

x