অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক এসো হে বৈশাখ

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ২১ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:১১ পূর্বাহ্ণ
6

স্বাগত জানাচ্ছি ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে। সব অমঙ্গল দূর হয়ে যাক। নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে দেশের মানুষের দিন কাটুক। রাত কাটুক। আমার ঘরের সাহায্যকারী সেলিনারা লাল শাড়ি লাল টিপ পরে নিরাপদে আনন্দ নিয়ে মেলায় হেসে খেলে চুড়ি কিনুক। আইসক্রিম খাক। নির্ভয়ে সহি সালামতে ঘরে ফিরে আসুক। “যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি।”

সবকিছুই যেন বেশি বেশি। সবকিছুই যেন মাত্রা ছাড়িয়ে তবুও শান্তি। তবুও আনন্দ। ১৪২৫ বঙ্গাব্দের দিনের শুরুতে প্রত্যাশা করছি বাঙালির প্রাণের এই উৎসবে কোথাও কোন খারাপ কিছু যেন না ঘটে। নারী পুরুষ নির্বিঘ্নে যেন আনন্দ করতে পারে। কোন মেয়ে যেন অপমানিত, লাঞ্ছিত না হয়। কেমন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিছু দুর্বৃত্ত! সেটা সব শ্রেণিতে, সব জায়গায়। সকালে আমার বাসার সাহায্যকারীকে দরজা খুলতে গিয়ে একটু চমকে উঠলাম, ফেয়ার এন্ড লাভলীর গন্ধ এসে, নাকে লাগলো, দরজা খোলার সাথে সাথেই বাক বাকুম শুরু করেছে তার কিছু কথা কানে ঢুকছে বাকীটা উপচে পড়ছে। আমি বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে। শ্যামলা হলেও চেহারা ও গাঁয়ের গড়ন সুন্দর। আমার চোখ আটকে আছে ওর দিকে। ঢোলের ছবি, হাতির ছবি, একতারার ছবি, কুলার ছবি ওয়ালা লাল শাড়ি পরেছে, চোখে কাজল টেনেছে লম্বা করে। চুলে খোঁপা করে প্লাস্টিকের একটা ফুলও গুঁজেছে। লাল রং একটা লম্বা টিপও পরেছে। বললাম, বাহ! তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে, কি হয়েছে, এত সাজগোজ কেন? থেমেছিল কথা। প্রশ্ন পেয়ে আবার শুরু, কি বলেন আন্টি, আজকে বছরের প্রথম দিন না? আপনিও নতুন শাড়ি পরেন! আমি কিন্তু আজ বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।

সে কি কাল বিকেলেও তো আসোনি?

আন্টি মার্কেট গেছিলাম, এই শাড়িটা কিনছি। আপনাকে ফোন দিছিলাম। আপনি মনে হয় পড়তে বসছিলেন। ধরেন নি।

ওর উচ্ছ্বাস দেখে বললাম, ঠিক আছে। যা কাজ আছে এখন করে যাও। বিকেলে আসতে হবে না।

মন মেজাজ একটু খারাপ করে রাজী হলো। ঘরের পিচ্চিটার সাথে কাজ কিছু ভাগাভাগি করে নিলো। সকালে প্রাতরাশে টেবিলে আসলো পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা আর ডিম ভাজা। আমার এবারের বৈশাখ একেবারে রঙচঙহীন। যেন আন্দামান দ্বীপে আমি একাকী মানুষ। স্বামী গেছে গ্রামের বাড়িতে। মেয়ে কক্সবাজার আর ছেলে তো ইউএসএ। এবার আমার একাকী বৈশাখ। এমনটা মনে হয় আর কখনো হয়নি। মনটা ভারী হয়ে আসে। হঠাৎ ফোনের শব্দে ভাবনায় ছেদ পড়লো। খুব প্রিয় নরম একটা গলা কানে লাগার সাথে সাথে মনটা দোলা দিয়ে ঊঠলো। আমার মায়ের মতো আপা ফেরদৌস আরা আলীম আপা, আপার ফোন মানেই ‘রুনু লিখ’। কি যাদু যে আছে উনার কথায় জানি না। আমি সম্মোহিত হই। জেগে উঠি। সব খারাপ লাগাগুলো উড়ে যায়। আপা বিভিন্ন লেখা নিয়ে কথা বলেন। আমি আমার কথা বলি। কিছুক্ষণ এইভাবে কাটে। আপা বলেন এই সময়টা কাজে লাগাও। লিখ। আপা নিরলস লিখে যাচ্ছেন। উনার কোন ক্লান্তি দেখি না। উনার প্রতিটি লেখা তথ্য উপাত্তে ভরা। প্রচুর পড়াশোনা করেন। আর আমাদের মতো অলসদের জাগিয়ে তোলেন। মনে মনে বলি আপা আপনি ভাল থাকুন। আপনার কলম ভাল থাকুক, আপনার এই মায়াভরা প্রশ্রয়টা বড় বেশি উপভোগ করি। দীর্ঘজীবী হউন।

দুপুরের পর আমার পিচ্চিটা আমার সামনে এসে ঘোরাঘুরি করে। তার মানে এখন টিভি টাইম। কাজ নেই টানা কিছুক্ষণ টিভি দেখবে। মোটু পাতলু। আজকে বললাম দেখ, আজকে তো বাংলা বছরের প্রথম দিন হিন্দি দেখা ঠিক হবে না। তুই বরং বাংলা কোন চ্যানেল দেখ ভালো গানটান চলছে। সে বললোনা না নানু, বাংলা বুঝি না। ভাল লাগে না। মোটু দেন। তাই দিলাম, বেশি বাড়াবাড়ি করলে ঘুমিয়ে যাবে। বিকেলে চাটা ও পাব না। উঠাতে অনেক কষ্ট হবে। সহজে উঠবে না। তাই দিলাম।

চারদিকে উৎসবের আনন্দ রাস্তায় নতুন কাপড় পরা মানুষের ঢল। কত দ্রুত সবকিছু বদলে যাচ্ছে। কয়েক বছর আগেও এমন উৎসব মুখর পরিবেশ ছিল না। বৈশাখ এখন সর্বস্তরে পৌঁছে গেছে। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য সার্বজনীনতা। বাঙালির প্রাণের উৎসব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা নববর্ষ ছিল এক সময় একান্তই সাংস্কৃতিক এবং বৈপ্লবিক। এর সঙ্গে ধর্মীয় কোন অনুষঙ্গ নেই। হালখাতা খোলা হয় পয়লা বৈশাখেই। আদিতে এটা ছিল গ্রামীণ উৎসব। তখন গ্রামে গ্রামে মেলা বসত। নানারকম খেলাধূলার আয়োজন হতো। সেই উৎসব এখন জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। গত তিন বছর ধরে সরকারি কর্মচারী শিক্ষক ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। এভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ষবরণের ব্যাপ্তি বাড়ছে। ফলে বৈশাখ কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্যের আকার বড় হচ্ছে যা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে। এবার সরকারি কর্মচারীরা ৫০০ কোটি টাকার বৈশাখী ভাতা তুলেছেন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা এই বৈশাখ উৎসবকে কেন্দ্র করে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা বাণিজ্য হয়।

বর্ষবরণের উৎসবে নতুন পোশাকের চাহিদা বেশি। বাংলাদেশ ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির তথ্য অনুসারে ফ্যাশন হাউসগুলোতে সারা বছর ৮ হাজার কোটি টাকার বেচা বিক্রি হয়। এর মধ্যে অর্ধেকই রোজার ঈদে। ২৫২৮ শতাংশ পয়লা বৈশাখে। তার মানে এই বৈশাখেই ২০০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা হয়েছে। বৈশাখে দেশীয় পোশাক বেশি বেচাকেনা হওয়ায় প্রান্তিক এলাকার তাঁতিরা উপকৃত হয়।

আগে মানুষ নিজের জন্য কিনত। এখন বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের জন্যও কিনছে। বৈশাখের অর্থনীতির আকার প্রতিবছরই বাড়ছে। যার ছোঁয়া আমাদের কাজের সাহায্যকারীদের কাছে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

মিষ্টি দোকান, ফুলের দোকানগুলো বেশ ব্যবসা জাঁকিয়ে বসেছে এই বৈশাখে। মানুষ কিনছে দেদারসে। ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা সর্বত্র। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের সক্ষমতা বেড়েছে। ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। মানুষ উৎসবমুখী। এর মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠছে বাঙালির স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়।

স্বাগত জানাচ্ছি ১৪২৫ বঙ্গাব্দকে। সব অমঙ্গল দূর হয়ে যাক। নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে দেশের মানুষের দিন কাটুক। রাত কাটুক। আমার ঘরের সাহায্যকারী সেলিনারা লাল শাড়ি লাল টিপ পরে নিরাপদে আনন্দ নিয়ে মেলায় হেসে খেলে চুড়ি কিনুক। আইসক্রিম খাক। নির্ভয়ে সহি সালামতে ঘরে ফিরে আসুক। “যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে যাওয়া গীতি।”

x