‘আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হবেন খালেদা’

পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে শীঘ্রই সরকার পতন আন্দোলন

আজাদী প্রতিবেদন

শনিবার , ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ
129

তৃদজিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা হবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই, আন্দোলন চালিয়ে নয়। আর এ প্রক্রিয়ায় তিনি যে মুক্ত হচ্ছেন তা নিয়ে অনেকটা আশাবাদী বিএনপির নেতাকর্মীরা।

এদিকে শীঘ্রই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হবে। তবে এবার রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দলটির সমর্থিত ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর সমন্বয়ে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এ আন্দোলন শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি সমর্থিত পেশাজীবী নেতারা।

গতকাল শুক্রবার বিকালে চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং সংলগ্ন আইনজীবী মিলনায়তনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ এ কথা বলেছেন। সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, উনার (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) কোনো পথ নেই। উনি বা আওয়ামী লীগ যে পথে চলছে সেটা একনায়কতন্ত্রের পথ। সেই পথ হচ্ছে শোষণের পথ, স্বৈরাচারীর পথ, ফ্যাসিস্ট ও নির্যাতনের পথ। সুতরাং যে ব্যক্তিটি এই পথে চলছে, তার কাছ থেকে কোনো প্রত্যাশা থাকার কারণ নেই। খসরু বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আসবে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মুক্তির মাধ্যমে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আসবে আইনের মাধ্যমে, বাক স্বাধীনতার মাধ্যমে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মাধ্যমে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, দেশনেত্রী যে পথ দেখিয়েছেন, সেটা গণতন্ত্রের পথ। সেটা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের নাগরিক অধিকার আদায়ের পথ। যেটাকে বলা হয় মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি, চিন্তাশীলদের, জ্ঞান বীরদের চিন্তার প্রতিফলনের মাধ্যমে রাজনীতি। সুতরাং আমরা চলছি গণতন্ত্রের পথে, তারা চলছে অগণতান্ত্রিক পথে। আর গণতন্ত্রের পথই হচ্ছে মুক্তির পথ। সেই পথ বাংলাদেশের নাগরিকদের মুক্তির পথ। এই পথই হচ্ছে জনগণের ওপর নির্ভরশীলতা, রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা। অগণতান্ত্রিক পথ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় চেহারায় সন্ত্রাসের ওপর নির্ভরশীলতা। তাদের দলীয় ক্যাডার, সন্ত্রাসের বা অন্য কোনো শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা। শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রের পথ কিন্তু হাতপা গুটিয়ে বসে থাকার পথ নয়।

খসরু বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের শক্তি এখন ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুরু থেকে এই পর্যন্ত আমি যতগুলো কর্মসূচি দেখেছি, সেখানে দেখা গেছে তারা গ্রেপ্তার হচ্ছেন, কিন্তু ভয়ে পালাচ্ছেন না। তারা এখন গ্রেপ্তারের ভয় করেন না।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া জেলের ভেতরে অনেক বেশি শক্তিশালী। আওয়ামী লীগ এখন আছে মহাবিপদে। তারা নেত্রীকে জেলের ভেতর রাখলে এক ধরনের বিপদ, আবার বেলে (জামিন) বাইরে এলে আরেক ধরনের বিপদ। এগুলো তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

আওয়ামী লীগের অবস্থান খুবই খারাপ মন্তব্য করে খসরু বলেন, আওয়ামী লীগ শেষ কার্ড খেলে ফেলেছে। তাদের কাছে আর কিছুই নেই। এখন যা আছে তা দেশের জনগণের কাছে, বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে, অতি শীঘ্রই তারা গন্তব্যে পৌঁছবে।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমাকে প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে হয়। শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখবেন আর এ ব্যাপারে সাংবাদিকেরা আমার কাছে প্রতিক্রিয়া চাইবেন। তখন আমি বলি, উনি যদি কোনো কিছু বলে থাকেন তাহলে প্রতিক্রিয়া জানাব। উনি তো কিছু বলেননি।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষানীতি দুটোই ধ্বংস হয়ে গেছে। ফার্মার্স ব্যাংকের মালিক মহিউদ্দিন খান আলমগীর ব্যাংক লুটপাট করে শেষ করেছেন। দুদকের মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। এরপরও তিনি এমপি রয়ে গেছেন, মন্ত্রীও হয়েছেন। এ হচ্ছে বাংলাদেশের আইনের স্বাধীনতা। এখন নাকি জনগণের টাকায় ফার্মার্স ব্যাংকে রিজার্ভ তৈরি হবে। জনগণের টাকা এভাবে লুট করার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক থেকে টাকা লুটপাট হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকার কোনো খোঁজ নেই। শেয়ার বাজার থেকে টাকা লুটপাট করেছে দরবেশ এবং তার সহযোগীরা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের নেতারা বাড়ি করেছেন।

তিনি জানান, সামনে বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নাম পরিবর্তন করে সংগ্রাম পরিষদ করা হচ্ছে। পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমেই সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার পতন হবে না, ততক্ষণ এ আন্দোলন চলবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ড. জাফর উল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাই না। আমি চাই, উনি আইনের মাধ্যমে মুক্তি পাক, কারো দয়ায় নয়। বিচারপতিদের বিবেক থাকলে তিনি মুক্তি পাবেন। এ মামলা যে হাস্যকর, সেটি হাসিনাও জানেন।

তিনি বলেন, আসলে মামলাটি করা হয়েছে ভারতের প্রেসক্রিপশনে। আপনাদের এখন দুটো দায়িত্ব। খালেদার মুক্তি আর সুশাসন ফিরিয়ে আনা। আওয়ামী লীগ এখন ভারতের দয়া চাচ্ছে। ভারত সবসময় কম দিয়ে বেশি জিনিশ নিয়ে যায়। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের বড় বাধা ভারত।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যকে উদ্ভট আখ্যা দিয়ে জাফর উল্লাহ বলেন, তিনি আগেই বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচন করার ব্যাপারে কীভাবে বক্তব্য রাখলেন?

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার বক্তব্য নিয়ে মিথ্যা বক্তব্য দিচ্ছেন। ম্যাডাম এতিমের কোনো টাকা আত্মসাৎ করেনি। ১/১১’র সময় শেখ হাসিনার নামে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের টাকা নিয়ে একটি মামলা হয়েছে। আর তখন মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য বেগম খালেদা জিয়ার নামে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের একটি মামলা করা হয়। পরবর্তীতে কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় বেগম জিয়ার মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয় আর শেখ হাসিনার মামলাটিতে চার্জশিট দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার মামলার ফাইনাল রিপোর্টটি আদালতে না পাঠিয়ে তাদের অনুগত ডবল প্রমোশনধারী একজন অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়। পরে এই মামলাটির চার্জশিট দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, আদালত নাকি স্বাধীন? কোনো প্রাইভেট ট্রাস্টির বিরুদ্ধে মামলা চলতে পারে না বলে যুক্তি দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় আর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ঘাবড়াবেন না। গণতন্ত্রের নেত্রীকে বেশি দিন জেলে থাকতে হবে না। আগামী রোববার বেল পিটিশনের শুনানি। এতে ৪৪টি গ্রাউন্ড দিয়ে আপিল দায়ের করা হয়েছে। এই আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই খালেদা জিয়ার মুক্তি হবে।

পেশাজীবী নেতা ডা. খুরশিদ জামিলের পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ড্যাবের মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, ড্যাব কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া, ড্যাব সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম রিজু, ড্যাব নেতা ডা. ফাওয়াজ হোসেন শুভ, ইঞ্জিনিয়ার এসোসিয়েশনের মহাসচিব হাসান জাফরী তুহিন, এমবিএ এসোসিয়েশনের মহাসচিব শাকিল ওয়াহিদ, কৃষিবিদ শামিমুর রহমান, সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য অ্যাডভোকেট কবীর চৌধুরী, সাংবাদিক জাহিদুল করিম কচি, চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর নসরুল কাদির, চট্টগ্রাম জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জহিরুল আলম, ড্যাব চট্টগ্রাম সভাপতি কাজী সুফিয়ান, শিক্ষক নেতা মাহমুদুর রহমান সাকা প্রমুখ। এছাড়া নগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু সুফিয়ানসহ অন্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী, বিভিন্ন পেশাজীবি ছাড়াও নগর বিএনপির নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

x