আজ চৈত্র অবসান

ঋত্বিক নয়ন

শুক্রবার , ১৩ এপ্রিল, ২০১৮ at ১১:১৭ অপরাহ্ণ
17

রবীন্দ্রনাথের শাশ্বত বাণী ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও/তারি রথ নিত্যই উধাও/জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয় স্পন্দন/চক্রেপিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন’কালের এ রথ এগিয়ে চলছে তার নির্দিষ্ট গতিবেগে। পেছন ফিরে তাকানোর কোনো অবকাশ নেই। এ রথ চরম নিরাসক্ত, ভাবাবেগহীন। দুর্যোগে যেমন নিস্পৃহ, উৎসবেও তেমনি নিরুচ্ছ্বাস। আজ সকল হিসেব চুকিয়ে বন্ধ হবে হাল খাতা। ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসের কাসুন্দি ভেসে যাবে কালের স্রোতে। অতীত শুধু স্মৃতি হয়ে প্রেরণা যুগিয়ে যাবে, হতাশার মাঝে আশার আলো জ্বালিয়ে পথের সারথি হবে। শুধু চট্টগ্রামবাসীই নয়, নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব পুরো দেশ। ব্যর্থতার দায়ভার পুরনোর কাঁধে তুলে নতুনের আবাহনে ব্যস্ত সবাই। জীর্ণ, পুরনো, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধ শক্তি ধুয়ে মুছে যাক; বিদায়ী সূর্যের কাছে এই প্রণতি জানাবে বাঙালি। কিন্তুফলে আসা দিন, রাত জাগা পাখি হয়ে হরহামেশাই মনের গহীনে জানান দেবে নিজের উপস্থিতি।

আজ চৈত্রসংক্রান্তি। ১৪২৪ সনের চৈত্রের শেষ দিন। বসন্তেরও শেষ দিন। বাংলা লোকসংস্কৃতির নানা আচারঅনুষ্ঠানে হাজার বছর ধরে বহমান চৈত্রসংক্রান্তির মূলকেন্দ্র গ্রামবাংলা হলেও নগর সংস্কৃতিতে এখন এর উজ্জ্বল প্রভাব রয়েছে। নানা আয়োজনে আজ যখন চৈত্রসংক্রান্তির পার্বণ, তখন একইসঙ্গে দুয়ারে কড়া নাড়ছে সর্বজনীন উৎসবের নববর্ষ পহেলা বৈশাখ। শুক্রবার রাত পোহালেই নববর্ষ উৎসবে মুখর হয়ে উঠবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ সারাদেশ। বৈশাখকে বরণ করার জন্য চলছে চারদিকে সাজগোজ আর ধোয়ামোছা। নববর্ষের আয়োজনে ব্যস্ত উৎসবপ্রেমীরা। সব প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে।

চিন্তাবিদরা বলে থাকেন, সময়ের বিভাজন মূলত একটি কল্পিত ধারণা মাত্র। কেননা অনন্ত, অনাদি, অদৃশ্য মহাকাল হলো এমন একটি পূর্ণতা, যার বিভাজন ঘটানো কখনোই সম্ভব নয়। মানুষের জীবনভাবনা জুড়ে রয়েছে আবেগ আর হৃদয় গভীরতার প্রশ্ন। সেই ভাবনা থেকেই অখণ্ড, অনাদি, বিরতিহীন মহাকালকে মানুষ আপন প্রয়োজনে জীবন সীমানার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিধির মধ্যে নতুনরূপে সৃষ্টি করে নিয়েছে। বর্ষবিদায় এবং নতুন বছরের ভাবনা সেই প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিয়েছে হাজার হাজার বছর আগে।

সংক্রান্তি’ শব্দটি বাংলায় হুবহু এসেছে সংস্কৃত ‘সংক্রান্তি’ থেকে। এর অর্থ, আকাশে পরিক্রমণের পথে এক রাশিচক্র থেকে অন্য রাশিচক্রে সূর্যের আবর্তন। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন একটি সৌরবছর। কৃষিনির্ভর বাংলার সামাজিক জীবনে একদা এটি ছিল বৃহত্তম উৎসব। দার্শনিক এবং সাংস্কৃতিক উভয় প্রেক্ষাপটেই অসীম তাৎপর্য বহন করে চৈত্রসংক্রান্তি, কেননা, এ দিনের মধ্য দিয়েই পূর্ণতায় উপনীত হয় ঋতুচক্রের আবর্তন, শুরু হয় নতুন ঋতুর আবাহন। গ্রামবাংলায় রকমারি সামাজিক আচারের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ যেমন মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং কম্বোডিয়াতে সংক্রান্তির অপর নাম ‘সোংক্রান’। এটি তাদের প্রতিবছর প্রতিপালিত জাতীয় পানি উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ।

চৈত্রসংক্রান্তির মেলা ও নানা পার্বণ মনে করিয়ে দেয় নতুন বছর দোরগোড়ায়। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে লোকমেলা গ্রামগঞ্জেই বেশি হয়। গানবাজনা, মেলা, নাগরদোলা, প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতির নানা সম্ভার উঠে আসে এই দিনে। কালের বিবর্তনে চৈত্রসংক্রান্তির গুরুত্ব ও উদযাপন এখন অনেকটা ম্লান। নাগরিক সভ্যতার ডামাডোলে নগরীতে এর আবেদন নেই বললেই চলে। তারপরও কোনো কোনো গ্রামে ও শহরে কিছু কিছু সংগঠন এ ঐতিহ্যকে লালন করে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রতিবছরের মতো এ বছরও বর্ষবিদায় উপলক্ষে নগরীতে আয়োজন করা হয়েছে দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানমালার।

পুরোনো বছরের সকল লেনদেন ঘুচিয়ে নতুন বছরের হালখাতা খুলে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ধোয়ামোছা, নতুন ব্যবহার্য সামগ্রী কেনা, পুরনো দেনাপাওনা মিটিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে ব্যস্ত তারাও। হালখাতায় সবাই যে টাকা পরিশোধ করতে পারেন তা নয়। মূলত টাকা দিতে পারুক আর নাই পারুক, বছরের শুরুর দিনে ক্রেতাবিক্রেতা একত্রে বসে মিষ্টি মুখ করাই হচ্ছে হালখাতা খোলার উদ্দেশ্য। নতুন হিসেবের খাতা খোলা ও ব্যবসায়ীক্রেতার মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য হালখাতার কোনো তুলনা হয় না বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।

সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ : নগরীর ডিসি হিলে বৈশাখী উৎসবের আয়োজন করেছে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদ। চট্টগ্রামে বর্ষবরণের সবচেয়ে বড়ো আয়োজন এটি। নগরবাসীই শুধু নয়, দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসে এ আয়োজনে শরীক হতে। সাম্প্রতিক সময়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নগরীর বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত হলেও, ডিসি হিলের এ আয়োজনের আবেদন কমেনি এতটুকু। অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী নাট্য ব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার আজাদীকে বলেন, এবার বর্ষবিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানের ৪০ বর্ষে পদার্পণ হবে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল থেকে দু’দিনব্যাপী এ আয়োজন শুরু হবে। ওইদিন বর্ষবিদায় অনুষ্ঠান শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। এই উপলক্ষে এবার চট্টগ্রামের লোক সংগীত গবেষক সৈয়দ মহিউদ্দিন ও পুঁথি সংগ্রাহক মোহাম্মদ ইছহাককে সম্মাননা প্রদান করা হবে। এছাড়া দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে বর্র্ষবিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে গানকবিতানৃত্য শিল্পীদের সম্মিলিত উপস্থাপনের মাধ্যমে চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখকে আবাহন করা হবে।

নববর্ষ উদযাপন পরিষদ : সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নগরীর সিআরবি এলাকায় এবারও ৩০ চৈত্র বেলুন উড়িয়ে ঢোল বাদনের মধ্য দিয়ে দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হবে। আয়োজক কমিটির সহসভাপতি শওকত ইকবাল জানান, এবার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক। দু’দিনব্যাপী এই আয়োজনে আঞ্চলিক গান, বাউল গান, উপজাতীয় পরিবেশনাসহ থাকছে নানা আয়োজন। তবে এবারও মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে সাহাবুদ্দিনের বলী খেলা।

এছাড়া বৈশাখকে বরণ করে নিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিকসামাজিক সংগঠন হাতে নিয়েছে নানা কর্মসূচি। নগরীর ডিসি হিলে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে দু’দিনব্যাপী বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সঙ্গীতানুষ্ঠান, ঢোল বাদন, চিরায়ত বাংলা গান, লোকগান, যন্ত্রসঙ্গীত, প্রদর্শনী, নৃত্যানুষ্ঠান, আবৃত্তি, নাটক ও বৈশাখী মেলা।

x