আন্ডাররেটেড

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ২০ মার্চ, ২০১৮ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
72

কাভি হা কাভি না’ সিনেমাটা আমি দুবার দেখেছি। নাম দেখে মনে হতে পারে একটা ছেলের সঙ্গে একটা মেয়ে হ্যাঁ/না বলার প্র্যাকটিস করছে, আর এটা নিয়েই সিনেমা। সত্যি সত্যি মনে হলে এটা তা না, এর বাইরে আরও অনেক কিছু আছে। লোকাল একটা গল্প, অথচ পরিষ্কার গাঁথুনি আছে। স্বপ্নদৃশ্য দিয়ে গল্পের চক্র শুরু, এরপর নানা চড়াইউতরাই পেরিয়ে একই জায়গায় নিয়ে এসে পরিচালক কুন্দন শাহ্‌ দর্শকের মুখবরাবর ঠাণ্ডা পানির ঝাঁপটা মারেন।

কুন্দন শাহ্‌’র পরিচয় দিচ্ছি।

সার্কাজমের ওস্তাদ ছিলেন। মারা গেলেন কিছুদিন আগে, গত অক্টোবরে। যাওয়ার আগে পৃথিবীতে উনসত্তুর বছর কাটিয়ে গেছেন। অনেক আগে ক্লার্কের চাকরি করছিলেন, কিন্তু একসময় বুঝতে পারলেন, চাকরি নয়, ফিল্মমেকিং হল তার প্রিয় বিষয়। তিনি পুনের এফটিআইআইএ ডিরেকশন নিয়ে পড়লেন। সেখানে পেলেন সাঈদ মীর্জা, বিধু বিনোদ চোপড়াদের। যদিও ছেলে নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে সিনেমা বানাবে, এই ভাবনাটা ওই সময় একদমই পছন্দ করেন নি তার বাবা।

তিনি অপছন্দ করার কারণেই হয়তো, জীবদ্দশায় কুন্দন শাহ্‌কে সিনেমাতে কম দেখা গেছে, টেলিভিশনেই বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।

প্রয়াত কুন্দন শাহ্‌’র মৃত্যুর খবর শুনে তার পরিচালিত ‘কাভি হা কাভি না’র মূল চরিত্র সুনীলের কথা মনে পড়েছিল। সিনেমায় দেখা যায়, সুনীল গেঞ্জি পড়ার সময় নাকে আটকে যাচ্ছে, পেপসি খাওয়ার সময় বাচ্চাদের মত অদ্ভুত শব্দ করছে। তাদের ছ’জনের একটা ব্যান্ড আছে, সেই ব্যান্ডের প্র্যাকটিসেও সে সময়মতো যেতে পারে না। প্রতিদিনই দেরী হয়ে যায়, অথবা কেউ না কেউ দেরী করিয়ে দেয়। সুনীলের মুহূর্তের মধ্যে গল্প বানানোর ক্ষমতা আছে। মিথ্যে তার সঙ্গেই থাকে। সে একেকসময় একেকটা বলে দেরী হওয়ার ব্যাখ্যা দেয়। একটু পর নিজ থেকেই সত্যটা বলে ফেলে।

এই ভালোখারাপের দ্বন্দ্বের সঙ্গে যুক্ত হয় আনা নামের একটি মেয়ে। তার প্রতি একতরফা আগ্রহ সুনীলের। আগ্রহ শেষ হলে দেখা যায়, আনার কারণে সুনীল ব্যান্ডের বাইরে চলে গিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও সে বৃত্তে ঢুকতে পারছে না। পরিচালকের নিজের জীবনও এমন। তিনি সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এর বাণিজ্যকরণ দেখে বৃত্তে ঢুকতে পারেননি।

স্কুল লাইফে প্রথমবার ‘কাভি হা কাভি না’ দেখে সুনীলের জন্য খারাপ লেগেছিল। মনে হচ্ছিল, সুনীলের বেদনা আমাকে বহন করতে হচ্ছে। যদিও দ্বিতীয়বার আমি কোনও বেদনা বহন করিনি, সিনেমার স্ক্রিনপ্লে চিন্তা করে কুন্দন শাহ্‌’র ছবি খুঁজে বের করেছি। তিনি দেখতে ভদ্রলোকের মতোন ছিলেন।

মাজরুহ সুলতানপুরীর কলম চলেছে ‘কাভি হা কাভি না’ সিনেমার গানে। সঙ্গে যতিনললিতের মিউজিক। পঙ্কজ আদভানী ছিলেন সহকারী লেখক হিসেবে। পার্শ্বচরিত্রে নাসিরউদ্দিন শাহ, অঞ্জন শ্রীবাস্তবের মতো অভিনেতারা আছেন। আছেন আশুতোশ গোয়ারিকরও। ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করা মানুষটি যে একসময় ‘লাগান’ কিংবা ‘স্বদেশ’ এর মত সিনেমা বানাবেন, সেটা তখনও কেউ জানে না।

এছাড়াও আরেকটা ব্যাপারণ্ডকুন্দন শাহ্‌’র প্রথম সিনেমার নাম ‘জানে ভি দো ইয়ারো,’ ১৯৮৩ সালের সিনেমা। এর খ্যাতি তাকে সারাজীবন মুড়ে রেখেছিল। যখন মারা গেলেন, তখনও পত্রিকায় শিরোনাম এসেছে, ‘জানে ভি দো ইয়ারো ডিরেক্টর কুন্দন শাহ্‌ পাসেস এওয়ে।’

যারা ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ দেখেন নি, তারা একটা কাল্ট সিনেমা দেখা থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন। বলা হয়ে থাকে, কমেডি আর স্যাটায়ারের এমন মিশ্রণ এই সিনেমার আগে বলিউড দেখে নি।

জানে ভি দো ইয়ারো’তে ডেডবডি চরিত্রে অভিনয় করা সতিশ শাহ্‌ কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘আমি আমার সফলতার জন্য কুন্দনকে ধন্যবাদ জানাই। তার আগে কেউ আমাকে বিশ্বাস করে নি। নাসিরুদ্দিন শাহ্‌, আমি ও অন্যরা সিনেমার লাইনে সুদর্শন বলতে যা বোঝায় তা ছিলাম না, কিন্তু কুন্দন আমাদের মধ্যে অন্যকিছু দেখেছিল।’

সতিশ শাহ্‌’র এই কথা মিথ্যা না।

কাভি হা কাভি না’তে তার মুখে একটা চমৎকার সংলাপ আছে। গল্পে তিনি আনা মেয়েটার বাবা। দৃশ্যে দেখা যায়, আনা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে মুষড়ে পড়ে। এক পর্যায়ে সুনীলের সঙ্গে বিয়েতে রাজি হয়। প্রপোজাল নিয়ে সুনীল আসে আনার বাড়ি। এই সময় আনার বাবা সুনীলকে বলে উঠেন, ‘আমি খুবই আনন্দিত, তুমি ভেতরে আসার জন্য দরজাকে পছন্দ করেছো, জানালা দিয়ে আসো নি।’

রঞ্জিত কাপুরের সংলাপ এমনিতেই ভালো,‘জানে ভি দো ইয়ারো’তেও তিনি এই কাজ করেছিলেন।

জীবনের প্রথম সিনেমাতেই কুন্দন শাহ্‌ জাতীয় পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় সিনেমা ‘কাভি হা কাভি না’ এর দশ বছর পরের কাজ। সিনেমার গীতিকার ও কম্পোজার দুই জেনারেশনের মানুষ। যাদের নিয়ে গল্পটা ঘুরছে তারা নতুন, আর যারা তাদের সঙ্গে আছেন, তারা অভিজ্ঞ সব অভিনেতা। উনারা কঠিন বাঁধনে নতুনদের জড়িয়ে রেখেছেন। তা না হলে এই আন্ডাররেটেড সিনেমা কিছুটা হলেও ঝুলে যেতো।

মাঝখানে নদশ বছর বিরতির সময় কুন্দন শাহ্‌ টিভির জন্য কিছু কাজ করেছিলেন। এর মধ্যে আছে কার্টুনিস্ট আর কে লক্ষ্মণের চরিত্র নিয়ে ‘ওয়াগলে কী দুনিয়া।’ সেখানে অভিনয় করেছিলেন অঞ্জন শ্রীবাস্তব ও শাহ্‌রুখ খান। এর পরেই তিনি শাহ্‌রুখ খানকে নিয়ে ‘কাভি হা কাভি না করেন।

যারা সিনেমাটি দেখেছেন, তারা জানেন, সুনীল চরিত্রটি তার ক্যারিয়ারের সেরা পারফর্মেন্সের একটি। ওই সময় রিলিজের আগেই সিনেমাটি ফিল্মফেয়ারের জুরি বোর্ডকে দেখানো হয়, তারা শাহ্‌ রুখ খানকে তখনই এর জন্য ক্রিটিকস এ্যাওয়ার্ড দেন। এ ব্যাপারে পরিচালকের নিজস্ব ভাষ্য:

সিনেমায় একটা গানে (আনা মেরে পেয়ার কো) শাহ্‌রুখকে একটা ট্যাক্সি থেকে আরেকটা ট্যাক্সিতে কয়েকবার লাফ দিতে হয়, এবং এটা তাকে করতে হয় আনার দিকে তাকিয়েই। আমরা দৃশ্যটা এক শটেই নিয়ে নিই। পরবর্তীতে আমি শাহ্‌রুখকে জিজ্ঞেস করি, সে এটা কীভাবে ম্যানেজ করেছে? শাহ্‌রুখ বলেছিল, ‘আমি আমার সুযোগগুলো গ্রহণ করছি।’

যদিও একই কথা কুন্দন শাহ্‌’র জন্যও সত্যি। তিনি সিনেমার জন্য যে বাজেট পেয়েছিলেন, তা ছিল খুব অল্প। এ কারণে শুধু গোয়া’তে শুট করার কথা থাকলেও, তাকে মুম্বাইতে এসে কাজ শেষ করতে হয়েছে। তিনিই বলেছেন, ‘কাভি হা কাভি না’কে তার খরচ তুলতে বারো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিলো।

জীবদ্দশায় কুন্দন শাহ্‌ ব্যাক ব্রাশ করতেন, তার মাথার সমস্ত চুল ছিল সাদা। গায়ের রঙ কালো, প্রায়ই এক রঙা শার্ট পরতেন। চোখে থাকতো সাধারণ ফ্রেমের চশমা। মোটামুটি চুপচাপ চেহারা। এই চুপচাপ মানুষের শেষের দিকের কয়েকটা সিনেমা চলে নি। তিনি মোটামুটি ব্যর্থ হয়েছিলেন। ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ আর ‘কাভি হা কাভি না’ এই মূলত তার ছবি। কিন্তু এরপরেও তিনি স্পষ্টবাদী ছিলেন।

মৃত্যুর তিন বছর আগের এক ইন্টারভিউতে তিনি বলেছেন, ‘এখন শাহ্‌রুখের অভিনয় প্ল্যাস্টিকের মতো, প্রতিটি দৃশ্যে তার ম্যানারিজম।’ আরও জানিয়েছেন, ‘এখন একজন অভিনেতা ফাঁদে পড়ে, যখন তার সিনেমা ১০০ কোটির ব্যবসা করে না। তাই তাদের যা বলে দেয়া হয়, তাই করতে হয়।’ এটা সত্যি যে ‘কাভি হা কাভি না’তে ওই অর্থে বাণিজ্যকরণ নেই। তারপরেও ভালবাসার সিনেমায় যেসব উপাদান থাকা উচিত, তা কিন্তু আছে।

১৯৯৪ সনের ২৫ ফেব্রুয়ারি’র এই সিনেমার বয়স সম্প্রতি দুই যুগ হল। আমি এ উপলক্ষে সিনেমাটি দ্বিতীয়বার দেখলাম। ড্রামার কুশলী ব্যবহার থাকলেও ‘কাভি হা কাভি না’ এখনও পুরনো হয় নি, বেশ চেনা যায়। অর্থহীন এর ‘বয়স’ নামে একটা গান আছে। সেখানে বলা হয়, ‘তোমায় আমি চিনি ছেলে, অনেকদিনের চেনা।’ এই সিনেমার সুনীল হল সেইজন, যাকে আমি খুব ভালো করে চিনি। অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রায় সব ছেলেকেই এই গল্পের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

এজন্য যারা এখনও সুনীলকে চেনেন না, তাদের চিনে নেবার আহ্বান রইল।

x