আব্বাস আত্তার বিশ্বাস ও বিপ্লবের আলোকচিত্রী

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ১ মে, ২০১৮ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
26

‘জীবন জুড়ে যত কাজ এবং সেই কাজ যা ধ্যানের পথে পরিচালিত হয়, আমার আলোকচিত্র মূলত তারই প্রতিচ্ছবি। স্বতঃস্ফূর্ততা আর আটকে পড়া মুহূর্ত, আমার ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডার এ-দুয়ের অন্তর্বর্তীকালীন স্বাক্ষর। কোনো একটি বিষয়ের উপর এর প্রতিফলন স্থান-কাল-পাত্রভেদে এগিয়ে থাকে। শেষতক ধ্যানই অনুসরণীয়, আর এখানেই আসে সার্থকতা যখন ভঙ্গুর আর হারিয়ে যেতে থাকা মুহূর্ত দুই-ই আমরা ধারণ করতে পারি। এ-কারণেই একজন রচয়িতার জন্য এমতন উদ্যোগ থাকা জরুরী। আলোকচিত্র কি ‘আলোর মাধ্যমে রচিত’ নয়? পার্থক্যটি এই যে, একজন রচয়িতা যেখানে শব্দকে বশে রাখেন, সেখানে একজন আলোকচিত্রী নিজেই নিজেকে বশে রাখেন। কেননা শব্দের প্রকাশ মানেই রচয়িতার প্রকাশ নয়, যেখানে আলোকচিত্র এবং আলোকচিত্রী একে অপরের পরিপূরক।’
আলোকচিত্র ও আলোকচিত্রী বিষয়ে, প্রায় দার্শনিক স্তরের এই উপলব্ধি ব্যক্ত করেছিলেন ইরানের বিখ্যাত আলোকচিত্রী-ফটো সাংবাদিক আব্বাস আত্তার, যিনি ‘আব্বাস’ নামেই সুপরিচিত। ইরানের সিস্তান প্রদেশে ১৯৪৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কাটিয়েছেন ইরানে। আলোকচিত্রী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন সত্তুর-আশির দশকে। সেসময় ইরানে চলছে ‘শাহ্‌ পাহলভী রাজ’ হটাও আন্দোলন, যা বিশ্বব্যাপী ইসলামিক রেভ্যুলসন নামে পরিচিত। সেই ইরান বিপ্লবের প্রামাণ্য দলিল ধারণে সরব হয়ে উঠল তার ক্যামেরা। ইরান বিপ্লবের নানা আঙ্গিকের ছবি তুলেছেন, যা এককথায় বহুমাত্রিক। নিজেও জড়িয়ে পড়েছিলেন বিপ্লবের একজন সহযোদ্ধা হিসেবে। ‘ইরান বিপ্লব’ তাঁর আলোকচিত্রী জীবনের গতিপথ তৈরি করে দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, আয়ারল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য, কিউবা, চিলি, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, বর্ণবাদী সমাজ কিংবা সামরিক জান্তার করালগ্রাস, সশস্ত্র বিপ্লব কিংবা সেনা বর্বরতা, সবখানেই তার ক্যামেরার ঝলকানি দেখা গেছে। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের একজন উল্লেখযোগ্য আলোকচিত্রী। বগুড়া রণাঙ্গনে, ঢাকার রাজপথে, ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়োল্লাসে, তার ক্যামেরা বন্দী করেছে অসংখ্য মুহূর্ত যা মহান মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসময়কার সবচেয়ে আলোচিত ছবিটি হচ্ছে ণ্ড বাংলাদেশের নতুন পতাকা সেলাইয়ের ছবিটি।
আলোকচিত্রের পাশপাশি লেখালেখিতেই ছিলেন সরব। মেক্সিকো ভ্রমণ নিয়ে তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিটার্ন টু মেক্সিকো, জার্নি বিয়ন্ড দ্য মাস্ক’, যে কোনো উপন্যাসকেও হার মানায়। ধর্ম বিষয়ে ছিল তার অগাধ আগ্রহ। সেই আগ্রহেরই ফসল ‘ফেসেস অব খ্রিস্টিয়ানিটি’, ‘আল্লাহু আকবর : এ জার্নি থ্রু মিলিট্যান্ট ইসলাম’। বৌদ্ধমত এবং হিন্দু ধর্মের উপর আগ্রহী হয়ে ওঠেন শেষদিকে, রচনা করেন ‘লে এনফানৎস দু লোটাস, ভয়ে শে লে বুড্ডিস্তে’ এবং ‘লে কমবেত সনাতনি’ নামের গ্রন্থসহ আরও অনেক রচনা।
আলোকচিত্রীদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ম্যাগনাম ফটো’-তে যোগ দেন ১৯৮১ সালে। মূলত এই সংস্থাটির সঙ্গে যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি বেরিয়ে পড়েন বিশ্বব্যাপী নানা ঘটনার দালিলিক ছবি তোলার কাজে। আজীবন যুক্ত থেকেছেন সংস্থাটির সঙ্গে।
মাত্র আঠারো বছর বয়সে আব্বাসের সাংবাদিক জীবনের শুরু। সেসময় ইরানের একটি দৈনিকে ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। তরুণ বয়েসে ইসলামী বিপ্লব তাঁর ভেতর ধর্ম-বিষয়ে দ্বান্দ্বিকতার জন্ম দেয়। এ-প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান বিপ্লবের আগে কখনো ভাবিনি যে ‘ধর্ম’ আমার আলোকচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু দুবছর ধ’রে বিপ্লবের ছবি তুলতে তুলতে আমি বুঝতে পারলাম, বিপ্লবে জয়ী হওয়ার জন্য যে-প্রবল অনুরাগ আর শত বছরের অনাচারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্রোধ, তা একটি দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।’ অন্যান্য ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার পিছনে নিজের উপলব্ধি বলেছেন, ‘আমি যে কেবল মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাসকে ধারণ করতে চেয়েছি তা-ই নয়, আমি চেয়েছি স্রষ্টার নামে, ধর্মের নামে দলবব্ধ মানুষ কী কী করতে পারে তার সবকিছুকে ক্যামেরায় টুকে রাখতে। কখনো হয়তো বেশ মহান কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে মানুষ, কখনো ভয়ানক বর্বর কিছু, যা-ই করুক, সবই তারা ঘটিয়েছে ধর্মের নামে।’
দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মময় জীবনে, তাঁর আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে বিশ্বের সব নামীদামী গ্যালারিতে। তাঁর প্রায় সব ছবিই ইন্টারনেটে তুলে দেওয়া আছে আগ্রহী আলোকচিত্রীদের জন্য। তিনি মনে করতেন, এসব কুক্ষিগত করে রাখার কিছু নয়। বরং এসব আলোকচিত্র যত ছড়িয়ে পড়বে, তরুণ আলোকচিত্রীরা নতুন চিন্তার, ভিন্নভাবে দেখার খোরাক পাবে। আলোকচিত্রের এই পরিব্রাজকের জীবনাবসান ঘটেছে গত ২৫ এপ্রিল’ ২০১৮। তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

x