আলোকের এই ঝর্ণাধারায়…

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১২ মে, ২০১৮ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ
4

হ্যাশ মি টু ঝড়ে স্থগিত হলো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। গায়ে কাঁটা দেওয়া এমন একটি সংবাদ শিরোনামের পেছনের গল্পটা কি? যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হ্যাশট্যাগ মি টুর আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই ঘটনার শুরু। সুইডিশ অ্যাকাডেমির তহবিলে পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ফরাসি ফটোগ্রাফার জঁক্লদঅ্যারনল্টের বিরুদ্ধে ১৮ জন নারীকে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে।

প্রায়ই শুনতে হয় এইসব লেখালেখিতে আদৌ কোনও কাজ হচ্ছে কি? নারীনিগ্রহ এমনকি নিধনও দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। কথাটা সত্যি। কিন্তু এমন তো নয় যে পাগলা সাঁকো নাড়াসনে বলছি আর পাগলা সজোরে সাঁকোটা ঝাঁকিয়ে চলেছে। কেউ কেউ এমনও বলেন যে মন্দ খবরের চাপে ভালো কোনঠাসা হচ্ছে। অবস্থাটা এমন যেন ভালো বলতে কোথাও কিছু নেই। অথচ খবরের কাগজের জন্ম, প্রচারপ্রসারের মূলে মন্দই ছিল মূল আকর্ষণ, একদা। মনস্তত্বও মন্দ, নিষিদ্ধ, উৎকট ও বিভৎসতার প্রতি মানুষের অদম্য আকর্ষণের কথা বলে। আমরা বলি, দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার গল্পটাও কিন্তু সত্য। অতঃপর ফিরতেই হয়। সেই ফেরার গল্পে মন্দের ভূমিকা যদি মানি তাহলে মন্দ যে কেবল অন্ধকারকে ঘনীভূত করে তা তো নয়। ‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’র কথা কেন ভুলে যাবো? ভুলতে দিচ্ছেই বা কে? তেমন কিছু গল্পের বিশ্বজোড়া হাতছানিকে উপেক্ষা করা কি সম্ভব?

মি টু ঝড়ে স্থগিত হলো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার। গায়ে কাঁটা দেওয়া এমন একটি সংবাদ শিরোনামের পেছনের গল্পটা কি? যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে হ্যাশট্যাগ মি টুর আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই ঘটনার শুরু। সুইডিশ অ্যাকাডেমির তহবিলে পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ফরাসি ফটোগ্রাফার জঁক্লদঅ্যারনল্টের বিরুদ্ধে ১৮ জন নারীকে যৌন নির্যাতন ও হয়রানির অভিযোগ ওঠে। অ্যাকাডেমির স্টাফ ও সদস্যদের আত্মীয়রাও এঁর ‘অনিচ্ছাকৃত অন্তরঙ্গতা’র শিকার হয়েছেন। অভিযুক্ত এই ব্যক্তি সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্য কবি ক্যাটরিনা ফ্রস্টেনসনের স্বামী। স্বামীর এই কীর্তি জানাজানি হবার পরে ক্যাটরিনাকে দায়িত্বচ্যুত করার দাবি ওঠে। কিন্তু অ্যাকাডেমি ক্যাটরিনার পক্ষে অবস্থান নেয়। এর প্রতিবাদে ১৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি থেকে ৩ জন গুরুত্বপুর্ণ সদস্য পদত্যাগ করেন। অব্যাহত চাপের মুখে ক্যাটরিনাও পদত্যাগ করেন। এর পরপরই স্থায়ি সচিব (প্রতিষ্ঠান প্রধানও বটে) সারা ডানিয়াস পদত্যাগের ঘোষণা দেন। অতঃপর সুইডিশ অ্যাকাডেমির ওয়েবসাইটে একটি ঘোষণা আসে যে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ায় এবং লোকজনের আস্থার ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে পুরস্কার স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হলো। আপাতত অ্যাকাডেমি পরিচালনা সংক্রান্ত সংকট সমাধানে কাজ করবেন। তাই ২০১৯ এ একাডেমি একসঙ্গে দুবছরের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবে।

২৩০ বছরের পুরনো একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে এ ধরনের বিঘ্ন আর ঘটেনি। ২য় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত এ পুরস্কার স্থগিত ছিল। ১৯৪৯ এ পুরস্কারটি বিলম্বিত হয়েছিল। ১৯৫০এ পুরস্কৃত হন উইলিয়াম ফকনার এবং বাট্রান্ড রাসেল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে প্রতিবছর ৬টি ক্যাটাগরিতে প্রদেয় পুরস্কারের ৫টির ঘোষক নরওয়েজিয়ান একাডেমি। সাহিত্য পুরস্কারটি ঘোষণা করে সুইডিশ অ্যাকাডেমি। এবারের বিপত্তিটা ঘটলো সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে। সুইডেনের সবচেয়ে সম্মানিত এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য নির্বাচন করা হয় গোপনে। পরে সুইডেনের রাজা এঁদের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে থাকেন। সদস্যরা আজীবন নিজেদের পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা বিল কসবি ও ফরাসি পোলিশ পরিচালক রোমান পোলানস্কি যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগে ইউএস অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার্স আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। এপ্রিল ২০১৮য় অভিনেতা বিল কসবি যৌন অপরাধের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন এবং অস্কারজয়ী ফরাসি পোলিশ পরিচালক রোমান পোলানস্কি ১৯৭৭ সালে মার্কিন কিশোরী সামান্থা গাইমারকে ধর্ষণের অভিযোগটি স্বীকার করে নিলেন সম্প্রতি। যুক্তরাষ্ট্রে ৪২ দিন জেল খাটার পরে তখন তিনি দেশান্তরী হয়েছিলেন। অস্কারের সঙ্গে সম্প্রতি এ দুজনের সকল সম্পর্ক ও লেনদেন সম্পূর্ণ চুকে গেল। এ মাসের (মে,২০১৮) প্রথম দিনে অ্যাকাডেমির পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা এই দুজনের বিরুদ্ধে ভোট দেন। দুদিন পরে এঁদের বহিস্কৃত করার ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে বলা হয় সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী এই দুজনকে বহিস্কার করেছেন। এঁদের বিবৃতিতে মূল্যবান একটি কথা আসে। বলা হয় মানবিক মর্যাদার যে মূল্যবোধ তা যেন সদস্যরা মেনে চলেন এমন নৈতিক আদর্শকে উৎসাহিত করতে বোর্ড এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিল কসবি অভিযুক্ত হয়েছেন এপ্রিলের শেষপ্রান্তে এসে। তাঁর স্ত্রী বলেছেন, ন্যায়বিচার হয়নি। পোলানস্কির আইনজীবী এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের কথা জানিয়েছেন। অ্যাকাডেমির ৯১ বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মোট ৪ জনের সদস্যপদ খারিজ হলো। অভিনেতা কারমাইন কারদি বহিস্কৃত হন ২০০৪এ।এক বন্ধুকে অস্কারের গোপন ভিডিও দেখানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। আর গত বছর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে বহিস্কৃত হন মার্কিন প্রযোজক হার্ভি ওয়াইনস্টিন। হ্যাশ ট্যাগ মি টুর আন্দোলনের এই নাটের গুরুর নামটি এখন নেতিবাচক দিক থেকে কিংবদন্তীই বটে।

পাকিস্তানের প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী আলী জাফরকে চিহ্নিত করা হচ্ছে পাকিস্তানের হার্ভি নামে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৩৭ বছরের এই খ্যাতিমান গায়ক ওই নামে পাকিস্তানের হার্ভি অভিযোগ ও নিন্দার স্রোতে ভাসছেন। মিশ শাফি নামের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীর (দুসন্তানের জননী) অভিযোগের পর সেখানকার ‘কোক স্টুডিও’ থেকে জনপ্রিয় গায়িকা এবং অভিনেত্রী মেরিনা মুমতেহসান টুইট করে জানিয়েছেন ‘হয়রানির শিকার নারীরা যেমন হ্যাশ ‘মি টু’ বলে সাহস করে এগিয়ে আসছেন তেমনি করে আই অ্যাম সরি’ বলে ওদেরও এগিয়ে আসা উচিত। অতঃপর এই গায়ক হার্ভির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন সাংবাদিক মাহাম জাভেদ, রূপসজ্জাকর লীনা গণি এবং গায়কের ভক্ত হুসনা রাজা প্রমুখ। আমরা আলোর অপেক্ষায় রইলাম।

এপ্রিলের শেষে কয়েকটি দিন বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজধানীসহ স্পেনের কয়েকটি নগর। কাতালেনিয়ায় স্বাধীনতার দাবিতে কয়েক মাস ধরে চরম অস্থিরতার পর দেশটিতে নতুন উত্তেজনা বিরাজ করছে। হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভে তিনদিন ধরে পাম্পলোনা নগর ছিল কম্পমান। মাদ্রিদ, বার্সেলোনা ও ভ্যালেন্সিয়াও বিক্ষুব্ধ। ঘটনাটা হচ্ছে ‘ওলফ প্যাক’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য পরিচয়ের ৫জন আসামীকে আদালত যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত করে ৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। এদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের অভিযোগ ছিল। সে অভিযোগ খারিজ হয়ে গেছে। উল্লেখ্য, স্পেনে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন এক বিষয় নয়। ধর্ষণের অপরাধে এদের ২০ বছর কারাদণ্ড দাবি করেছিল সরকারি কৌঁসুলিরা। সরকার বলছে, যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা পর্যালোচনা করা হবে। ২০১৬’র জুলাইয়ে পাম্পলোনায় ষাঁড় দৌড়ের বার্ষিক উৎসবের সময় ১৮ বছরের এক তরুণী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তরুণীর পরিচয় গোপন রেখে ৫ মাস ধরে গোপনে বিচারকাজ চলে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে তরুণীর পরিবার। ওই তরুণীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করে ওই ঘটনার যথাযথ বিচারের দাবিতে স্পেনের নাগরিকেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। ‘সুয়েন্তালো’ নামের একটি হ্যাশট্যাগে যৌন নির্যাতনের শিকার অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে। এতে পাম্পলোনায় ৩০ হাজারের বেশি লোকের বিক্ষোভ ষাঁড় দৌড়ের রাস্তা দখল করে রাখে। জনতা নারীবিরোধী পুরো আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

একজন নারী বিক্ষোভকারী স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনকে বলে যে বিচার ব্যবস্থা এখনও পুরুষতান্ত্রিক। এ ব্যবস্থা নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং নারীরা অরক্ষিত। একটি কনভেন্টের একদল নান রায়ের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেন। স্পেনের ন্যাশনাল পুলিশ টুইটারে লিখেছে, আমরা সব সময় আপনাদের সঙ্গে আছি। দণ্ডপ্রাপ্তরা ২০১৬ থেকে কারাগারেই রয়েছে। নিপীড়িত নারীকে ৫০ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দিতে আসামীদের নির্দেশও দিয়েছে আদালত। তারপরেও এতসব!

ভারত জুড়ে আসিফা ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ তুঙ্গে উঠেছিল গত মাসে। (এপ্রিল, ২০১৮) ২০১২ য় নির্ভয়া ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর এটি ছিল আরেকটি বড় বিক্ষোভের ঘটনা। সরকারি নথিমতে ভারতে দৈনিক গড়ে ৫০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। কাশ্মীরে ৮ বছর বয়সী শিশু আসিফা হত্যায় দেশব্যাপী তীব্র বিক্ষোভের কারণে নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী মানেকা গান্ধী ধর্ষণবিষয়ক আইন পরিবর্তনের প্রস্তাব করেন। গত ২১ শে এপ্রিল (২০১৮) কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধানটি পাশ করা হয়। প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন বিদেশে। ৫ দিনের সফর শেষে দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এমন প্রস্তাব এযাবতকালে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে একাধিকবার। কাঠুয়ায় শিশু ধর্ষণ (আসিফা) ও হত্যা নিয়ে ভারত সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও পড়েছে। এ মুহূর্তে ১২ বছরের কম বয়সী শিশু ধর্ষণের সাজা হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। জরুরি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পুরনো আইনে পরিবর্তন এনে নতুন এই আইন পাশ করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। এর আগে ১৮র কমবয়সী কাউকে ধর্ষণের শাস্তি ছিল সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে সর্বোচ্চ আমৃত্যু কারাদণ্ডের বিধান।

অন্ধকার থেকে আলোর লক্ষ্যে আমাদের গল্প নেই, ছিল না বা তৈরি হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। কথাটা হচ্ছে যতই প্লবতাদক্ষ হই না কেন, সাঁতারে যতই পটু হই যাত্রাটা যখন জলের অতল থেকে শুরু তখন উপরে ভেসে ওঠার জন্য দমটা তো চাই। অত্যন্ত পরিশ্রমী আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর গল্প দিয়ে শেষ করবো। সম্প্রতি কমনওয়েলথ নারী ফোরামের অধিবেশনে তিনি বলেছেন, বিশ্বশান্তি ও নারীর ক্ষমতায়নের উপর ভিত্তি করে বৈষম্যহীন, দারিদ্র্য ও সংঘাতমুক্ত সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এদেশের সংসদ নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক। এ যাত্রায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল সামিট অব উইমেন তাঁকে গ্লোবাল উইমেন্সে লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড ভূষিত করেছে। আমরা নিশ্চয়ই আলোকাভিসারী।

x