উন্নয়নের গতিধারায় যুক্ত হোক ধর্ষণমুক্ত স্বদেশ

শনিবার , ৭ এপ্রিল, ২০১৮ at ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
17

গত মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল দৈনিক সমকালের শেষের পাতায় ‘ধর্ষণের প্রতিবাদে একা’ শিরোনামে বুকে প্ল্যাকার্ডসহ এক নারীর ছবি (এবং সংবাদ ভাষ্যে তার বিস্তারিত বিবরণ পেযেছি আমরা।)। একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে কর্মরত এই নারী তাঁর শিশু কন্যাটিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে সকাল দশটা থেকে বেলা এগারোটা পর্যন্ত উত্তরার রাজলক্ষ্মীআজমপুর ফুট ওভারব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বুকে ঝোলানো প্ল্যাকার্ডটিতে লেখা ছিল ‘একজন পুরুষই পারে আগামীকালের একটি সম্ভাব্য ধর্ষণ বন্ধ করতে। (ধর্ষণ শব্দটির জন্য লাল কালি ব্যবহার করেছেন তিনি।) নিচে অপেক্ষাকৃত ছোট অক্ষরে ‘ধর্ষণ বন্ধ করুন’ এবং তারও নিচে হ্যাশট্যাগ দিয়ে ইংরেজিতে লেখা ছিল। ’ঈঋৗণটফ ুটভ. র্ওময ৗটযণ.’ আফসানা কিশোয়ার লোচনের ছবিটির দিকে অপলক তাকিয়ে থেকেছি এবং কৃতজ্ঞ বোধ করেছি ‘দৈনিক সমকালে’র প্রতি; একা নারীর একক কর্মসূচিটি আর একক রইল না। প্রতিবেদনের উপান্ত্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে চলতি বছরের (২০১৮) প্রথম মাসে সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮৭ জন নারী এবং যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৭ জন নারী। আমরা জানি ধর্ষণের শিকার নারীর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কিছু বেশি হতেও পারে তবে যৌন হয়রানির শিকার নারীর সংখ্যা এর বহু বহু বহু গুণ বেশি।

আমরা জানি আমাদের রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে ঘরের বাইরে প্রতিটি জায়গা এখন ভীড়াক্রান্ত থাকে। বিশেষ করে এক বা একাধিক নারীর উপস্থিতি যে কোনও জায়গায় ভীড় জমিয়ে দেয় এবং ভীড়াক্রান্ত স্থানে নারীর ভারাক্রান্ত হবার যথেষ্ট কারণ ঘটে। মধ্যবয়সী, স্বাস্থ্যে ও শক্তিতে দিব্যি সটান চলাফেরা করেন এবং রুমাল ছাটের যথেষ্ট ঢিলেঢালা বোরখা জাতীয় পোশাকের ঘেরে সুরক্ষিত থাকা আমার প্রতিবেশীর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার গল্পটি শোনাই। রেয়াজুদ্দিন বাজারের বাইরের দিকটায় খানিকটা উবু হয়ে লেবু দরদাম করছিলেন তিনি। একবার, দু’বার ইতস্তত করে তিনবারের মাথায় ত্বরিৎ গতিতে তাঁর পশ্চাদ্দেশে সন্তরণরত যে হাতটি তিনি ধরে ফেলেন সে হাতের মালিক শশ্রূমন্ডিত আপাদমস্তক ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত পুরুষ নিজের হাতটি সজোরে কেড়ে নিয়ে উল্টো ধমক দিয়ে উঠেছেন এমনভাবে যেন মহিলা কোনও অসদুদ্দেশে তাঁর হাত ধরেছেন। তিনি হতভম্ব। তাঁকে আরও বিস্মিত করে হাসির হররা উঠলো চারপাশ থেকে। আমাদের বহু বহুদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জানি বাবামাভাইয়ের হাত থেকে অনেকটা কেড়ে নিয়ে ঘিরে ফেলা ভীড় অবোধ কিশোরীকে কিভাবে নাজেহাল করে, কতটা অসহায় করে। অক্টোপাস বিভীষিকায় অন্তহীন হাতের ছোবলে তাকে রাস্তার উপর বসে যেতে দেখেছি, অতঃপর পায়ের সুখ মিটিয়ে ভীড়কে হাওয়া হয়ে যেতে দেখেছি। আমাদের নববর্ষের উৎসবে বা ৭ মার্চের (২০১৮) আনন্দোৎসবে আমরা কি দেখেছি?

প্রসঙ্গত আমাদের এই শহরের এক অতি সংবেদনশীল গুণী গীতিকারসুরকারগায়কের কথা বলি। ৭ই মার্চের আনন্দ মিছিলে লাঞ্ছিত ক্ষুব্ধ, যন্ত্রণার্ত মেয়েটির পক্ষে তিনি তাঁর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। পরে মন্তব্যের ঘরে দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষার্থে অবস্থানরত দু’টি মেয়ের লেখা পড়ে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেছেন। ওরা লিখেছে, বাবা, স্বদেশে আমরাও কি এমন ঘটনার শিকার হইনি?

নারী নির্যাতন হয়েছে, হচ্ছে, হবে আরও বহুদিন। যতদিন নির্যাতক ধর্ষকেরা মানুষ না হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে কথাও হয়েছে। হচ্ছে, হবে প্রচুর যতদিন নারী মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত না হচ্ছে। ‘কথা’ বলতে এক্ষেত্রে নারীর বিরুদ্ধে, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সব ধরনের বাদপ্রতিবাদ, আলাপআলোচনা, সংগঠিতঅসংগঠিত তাবৎ আন্দোলন এমনকি আইনি পদক্ষেপকেও ধরে নিচ্ছি। নির্যাতনের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দুনিয়ায় বলতে গেলে একটা প্রবল বিস্ফোরণই ঘটে গেছে। বিশ্বজুড়ে এর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, এবং আরও হবে, সন্দেহ নেই। সেই সঙ্গে এও সত্যি যে পৃথিবীর স্বার্থে, প্রজন্মের স্বার্থে স্বয়ং পুরুষ এমন সব আন্দোলনে কেবল নারীর পাশাপাশিই থাকবেন না। বরঞ্চ প্রবল আন্দোলনরথের সারথীও থাকবেন তাঁরাই। শুধু আশা নয়, এ আমাদের বিশ্বাস।

গত ৩০ মার্চ (২০১৮) দৈনিক প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ চাই’ শিরোনামের একটি আয়োজন হয়ে গেল। বেসরকারি সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্‌স্‌ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ (আইআইডি) সংস্থাটির ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ আয়োজন মূলত তাঁদেরই। সংস্থার নির্বাহী প্রধান সাঈদ আহমেদ জানিয়েছেন গত ৫ বছর ধরে তাঁরা নারী নির্যাতনের বিষয়ে মাঠপর্যায় থেকে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নারীদের কথা শুনেছেন। সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। আলোচনায় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. শাইখ ইমতিয়াজ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সামিয়া হক প্রমুখ। দীর্ঘদিন ধরে নারী নির্যাতন বিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তদের হতাশার কথা আমরা শুনেছি। একই সাথে অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন দিকনির্দেশনাও তাঁরা দিয়েছেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আলী আসগর স্বপন বলেন, ২০০০ সালে প্রণীত নারী ও শিশু দমন আইনের বিধিমালা এখনও তৈরি হয়নি। ফলে আইনটি আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একেকজন একেকভাবে ব্যবহার করেছেন। অথচ এঁদের গাফেলতির জন্য শাস্তির বিধান আছে, হাইকোর্টের রায় আছে কিন্তু আজ পর্যন্ত কারও শাস্তি পাওয়ার নজির নেই। আমরা অতঃপর নির্যাতিত নারী ও শিশুর জন্য বিচারের আশা কিভাবে করবো, কার কাছে যাবো?

শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদে একটি মানববন্ধনের গল্প দিয়ে শেষ করবো। তার আগে বলি, শিশু ধর্ষণ ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এতটাই ভয়ঙ্কর যে মায়ের ক্যাঙারু থলে ভিন্ন শিশুটি যেন আর কোথাও, আর কারও কাছে নিরাপদ নয়। কিন্তু ঘুমন্ত মায়ের পাশ থেকে তুলে নিয়ে মাত্র ৩ মাস বয়সী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে হায়দ্রাবাদে। দিল্লীতে ৮ মাস বয়সী শিশু কন্যাকে রক্তাক্ত করেছে তার আপন চাচাতো ভাই। দিল্লী কমিশন ফর উইমেন সংস্থার প্রধান স্বাতী মালিওয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটিকে দেখে টুইটারে লেখেন, ভয়ঙ্কর। ওর ক্ষত দেখে গা শিউরে উঠেছে। আর ওর কান্না? বর্ণনাতীত। ভারতে পরিসংখ্যানবিদেরা ১১ মাসের এক শিশু কন্যাকে দুঘণ্টা ধরে নির্যাতনের খবর দিয়েছেন। আমাদের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারগুলো থেকে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতনের তথ্য আসছে।

শিশু ধর্ষক কারা? মনোরোগ বিজ্ঞানীরা বলেন, বেড়ে ওঠার সময়টাতে সঠিক শিক্ষার অভাবে যৌন হয়রানিকে যারা আদৌ কোনও অপরাধ বলে ভাবে না তারাই ধর্ষক। আর সে সব শিকার যাদের প্রলুব্ধ করা সহজ, যাদের উপর জোর খাটানো সহজ, যারা ধমকে ভয় পায়, ঘটনার যথার্থ বিবরণ দিতে অক্ষম তারাই ওদের লক্ষ্যবস্তু। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলেন, মুঠোফোন ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় কৈশোরে যা দেখার নয়, যা দেখা উচিত নয় তাই দেখছে কিশোরতরুণেরা এবং কৌতুহল মেটাচ্ছে শিশুর উপর। ২০০১ সালে দেশের উত্তরাঞ্চলে আমাদের এক কিশোরী নির্বাচনোত্তরকালে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। পরবর্তীকালে বিশ্ববিদ্যালয় অব্দি শিক্ষার সকল স্তরে তাকে নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়। ২০১৬ সালে এক আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে তাকে বলতে শুনেছি, নিজের নামে ফেসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে গিয়ে তাকে দেখতে হলো তার নিজের নামে চালুকৃত একটি প্রোফাইল যেটি পর্নোগ্রাফি প্রকাশের পেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এইই হচ্ছে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

খুনের পরের অপরাধ ধরা হয় ধর্ষণকে। কিন্তু শিশু ধর্ষণ কি খুনের চেয়ে বেশি নয়? সে খুনটি সারা হবার পরে শিশুর আর্তনাদ থামাতে প্রয়োজন মাত্র দু’টি আঙ্গুলের চাপ। শিশুপ্রাণের তড়পানি বন্ধ করতে সময়ও বিশেষ লাগে না। প্রথমটির চেয়ে শেষের যন্ত্রণাটি আদৌ হয়তো কোনও যন্ত্রণাই নয়। আসলে ধর্ষণযন্ত্রণা মাপার কোনও যন্ত্র তো তৈরি হয়নি এখনও, বা হয় না।

সবশেষে, সেই মানববন্ধনের গল্প। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শিশু ধর্ষণের প্রতিবাদ ও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গত সোমবার (২ এপ্রিল, ২০১৮) রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে। আয়োজক সংগঠন ‘শিশুদের জন্য ফাউন্ডেশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা মুঈদ হাসান বলেন, শিশুদের জন্য নিরাপত্তা ও ধর্ষকের শাস্তি নিশ্চিত করতে তাঁরা ১০ দফা দাবি তুলে ধরেছেন। দাবিগুলো হচ্ছে, শিশু ধর্ষণের বিচার, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা, ধর্ষকের পরিচয় মিডিয়ায় প্রকাশ, তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, শিশুর পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দান, ধর্ষিতার পরিবারের সুরক্ষা ও আইনি সহায়তা, জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা, ধর্ষণের ঘটনা বা প্রচেষ্টা ধামাচাপা দানকারীকে আইনের আওতায় আনা, শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন বন্ধে জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন করা, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিচারহীনতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না, হবার নয় এ আমরা বহুদিন ধরে শুনছি। শিশু ধর্ষণে পায়ুপথ ও যৌনপথ এক হয়ে যাওয়া শিশুটির ধর্ষণকালীন ও চিকিৎসাকালীন যন্ত্রণার কথা ভেবে, তার সারাজীবনের মানসিক ও দৈহিক যন্ত্রণার কথা ভেবে অতঃপর ভাবতে হবে এটি আমার শিশু, আপনার শিশু এবং আমাদের সকলের শিশু। আসুন, একে বাঁচাই।

x