উৎসব, আড্ডা আর প্রাণের মেলায় ‘স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে পঁচিশ পেরিয়ে চবি ফাইন্যান্স

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ৩১ মার্চ, ২০১৮ at ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ
133

এই মুখরিত জীবনের চলার বাঁকে/অজানা হাজার কত কাজের ভিড়ে/ছোট্টবেলার শত রঙ করা মুখ/সুর তোলে আজও এই মনকে ঘিরে’ জনপ্রিয় ব্যান্ড দল সোলসের এই গানের মতোই চবি ফাইন্যান্স বিভাগের ‘গ্র্যান্ড গালা গেট টুগেদার’ অনুষ্ঠান বিভাগের শিক্ষক, প্রাক্তন এলামনাই আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের মনে রং আর প্রাণে উৎসবের দোলা লাগিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফুরিয়ে গেল দু’দিন ব্যাপী প্রাক্তন এলামনাই পুনর্মিলনী ও ২৫ বছর রজতজয়ন্তী উৎসব। চবি ফাইন্যান্স পরিবারের কাছে ১৫ ও ১৬ মার্চ শুধু দু’টি দিন ছিল না, তা ছিল সকলের অপার্থিব ভালোবাসার ক্ষন! যা আসার আগেই ফুরিয়ে যাওয়ার কষ্ট বাড়ে! ‘স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে পঁচিশ পেরিয়ে ফাইন্যান্স’ োগানকে উপজীব্য করে তাঁরা মেতেছিল বন্ধু খুঁজে ফেরা, স্মৃতি রোমন্থন, গানগল্প, খুনসুঁটি আর প্রাণবন্ত আড্ডায়।

১৫ মার্চ, ২০১৮

চবি ফাইন্যান্স বিভাগের উৎসব আয়োজনের প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন মিলনায়তনে ফাইন্যান্স বিভাগের উৎসব আয়োজন কমিটির উদ্যোগে প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয় ‘টেকসই প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষ্যেই অর্থায়ন’ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। ফাইন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান মহোদয়ের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী এবং সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মাননীয় গভর্নর, অর্থ সচিব, চবি’র ভিসি ও প্রোভিসি, বাণিজ্য অনুষদের ডীনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষার্থীগণ। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অংশে বিজনেস সেশনে ১১ জন বিদেশি গবেষকসহ দেশের মোট ৯৫ জন গবেষকের বাছাই করা ৬১টি গবেষণা পত্র উপস্থাপন করা হয়। এ সময় কীনোট বক্তা হিসেবে ভারতের স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ ড. উদিত কুমার রায়সহ তিনজন দেশিবিদেশি স্বনামধন্য অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ নিরস বিষয়কেও প্রাঞ্জল উপস্থাপনার মাধ্যমে সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন।

১৬ মার্চ ২০১৮

চলো যাই ক্যাম্পাসের প্রিয় ফাইন্যান্স প্রাঙ্গণে

চৈত্রের সেদিনের মেঘলা বিষণ্ন সকালটি অন্য অনেকের কাছেই সাদামাটা আর নির্জীব মনে হলেও ফাইন্যান্সের প্রাক্তন এলামনাই আর বর্তমানদের চোখে ছিল পূর্ণ বসন্তে ভরা, সকলের মনে ছিল নানা রঙ আর ভাবনায় ছিল উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রাণের মেলায় পুরনো ভালোবাসা আর অনেকদিনের দেখতে না পাওয়া প্রিয় বন্ধু/স্বজনের মুখ দেখতে পারার উগ্র বাসনা! যে কারণে আগের রাতে উৎসবের উত্তেজনায় অনেকেরই বিনিদ্র রাত্রিযাপন! সকাল হতেই বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখি অনেক বাস থাকা সত্ত্বেও বেশির ভাগেরই গন্তব্য ছিল স্মৃতিবহুল বটতলি ও ষোলশহর রেলস্টেশন। সেখান থেকে ভালোবাসার শাটল ট্রেনে চড়ে ক্যাম্পাস যেতে যেতে পুরনো দিনগুলোকে আবার যেন নতুন করে ফিরে পাওয়া!

প্রধানমন্ত্রী ও গুলমেহের স্বর্ণপদক প্রাপ্ত ফাইন্যান্স ৬ষ্ঠ ব্যাচের শিক্ষার্থী ব্যাংকার আব্দুল বাসির বলেন, বিভাগে এসে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর আন্তরিকতা দেখে মনেই হচ্ছে না আমরা এখন প্রাক্তন! আর উৎসবকে উপজীব্য করে বিভাগের প্রতিটি কোনায় বর্তমান শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কাজ দেখে এক কথায় আমরা মুগ্ধ ও বিস্মিত! আমাদের সব ভালোবাসা সেই সব ছোট ভাইবোন আর প্রিয় শিক্ষকদের জন্য।

পুরনো এলামনাই প্রত্যেকেই যখন অসাধারণ করে সাজানো বিভাগ আর পুরো কর্মযজ্ঞে নিজেকে সঁপে দেওয়া আর দিনরাত পরিশ্রম করা শিক্ষক আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ দিচ্ছিলেন, তখন শিক্ষক ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ সকলের মুখেই ছিলো একই সুর, ‘প্রিয় ভালোবাসার স্বজনদের ধন্যবাদ দিতে হয় না, ভালোবাসার টানে এর চেয়ে ও আমরা বড় কিছু করতে পারি!’ তাঁরা যে আসলেই ভালোবাসার টানে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে তার নমুনা ২৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাজেদা সিনথিয়া, উৎসবের সাজে বিভাগকে সাজাতে গিয়ে চেয়ারে দাঁড়িয়ে কাজ করতে গিয়ে অসাবধানতায় পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেয়েও কাজ করে গেছে অবলীলায়! আরেক শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুমি তা মনে করিয়ে দিতেই সিনথিয়ার তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা! ‘ভালোবাসা কারে কয়’ তা দেখিয়েছেন এমন সিনথিয়াসহ নাহিদ আফরোজ, দিপাঞ্জলি ঘোষ দিপা, তাসনিম, আবেদুল আহসান তোহা, মনজুর হোসেইন, কায়সার চৌধুরী, সিদরাতুল মুমিসহ নাম উল্লেখ না হওয়া এমন আরও অনেকেই, যদিও বলা যায়, আসলে বর্তমান শিক্ষার্থী সকলেই। আর প্রিয় শিক্ষকদের কথা নাইবা বলা হলো, তাঁদের সকলের জন্য এলামনাই আর বর্তমান শিক্ষার্থীদের বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা।

বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আড্ডা, অভিনয় ও গানে আনন্দ বহুগুণ

সকালের প্রথম ট্রেন ক্যাম্পাসে নোঙ্গর ফেলতেই ক্যাম্পাস পেল অন্য এক রূপ। ক্যাম্পাসের কাটা পাহাড়ের সড়ক এলামনাইদের বর্ণিল পদচারণায় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল! জিরো পয়েন্ট থেকে বিচিত্র রঙ আর ঢং এ, বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বর্ণিল টি শার্ট, ব্যান্ড পার্টির বাজনার তালে আর বাহারি বিভিন্ন উপকরণে বের হওয়া র‌্যালি নজর কেড়েছে পুরো ক্যাম্পাসের। র‌্যালিতে বিভাগের শিক্ষক আর প্রাক্তন এলামনাইদের আবেগ আর উচ্ছ্বাস দেখে বুঝার উপায় ছিল না, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের অনেকেই কত রাশভারী আর শুধু বিভাগ নয় সেদিন যেন সকলেই ছিল বয়সে পঁচিশ!

র‌্যালি শেষ হতেই পুরনো বন্ধু আর হারানো স্মৃতিকে নতুন করে পাওয়ার আনন্দে সকলের মুখেই ছিল রাজ্য জয়ের হাসি আর মনে খুশির ঝিলিক। এর মাঝে মাননীয় ভিসি মহোদয়ের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে। এরপর কেউ ঢুঁ মেরেছেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের আয়োজনে পিঠা পুলি আর মেহেদি আঁকার স্টলে, কেউবা ফ্রি ব্লাড গ্রুপ জেনে নিচ্ছিলেন আবার কেউবা ছিলেন প্রিয় মানুষদের সাথে আড্ডা আর সুন্দর করে সাজানো বিভাগে ছবি তোলায় ব্যস্ত! দুপুরে নামাজ আর খাবার বিরতির পর বর্তমান শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় জমজমাট গান, সাহিত্য আর ইতিহাসের বিভিন্ন জনপ্রিয় চরিত্র ফুটিয়ে তাঁদের সাবলীল অভিনয় মুগ্ধ করেছে সবাইকেই। অনুষ্ঠানের শেষ প্রান্তে জনপ্রিয় ব্যান্ড দল সোলস এর পরিবেশনা ছিল এক কথায় অসাধারণ আর নস্টালজিক।

শহীদ মিনারের পাশে অনুষ্ঠিত ফাইন্যান্সের পুরো এই আয়োজন, সকাল আর বিকালের নাস্তা, দুপুরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান, দিনব্যাপি গান, আড্ডা অভিনয়সহ পুরো আয়োজনটি ছিল অনেক গোছানো আর প্রাণবন্ত। এভাবেই ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসে বিদায়ের ক্ষণ, দিনের আলো ফুরাতেই শিক্ষক, এলামনাই ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ সকলেই বিচ্ছেদের আগমনী সুরে বিষন্ন হয়ে উঠে, ধীরে ধীরে অবসান ঘটে প্রাণের মেলার। কিন্তু, সকলেই নিশ্চিত, দিনব্যাপি উৎসব হয়তো ফুরালো, কিন্তু প্রাণে যে মিলনের বান এসেছে তাতো সহজে ফুরোবার নয়! সকলের বিশ্বাস, প্রাণের এই উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে যাবে সবার মাঝে! আবার দেখা হবে, এই কামনায় অশ্রু সজল চোখে সমাপ্তি ঘটে অসাধারণ এক উৎসব উদযাপন।

পরিশেষে, অসাধারণ এক এলামনাই পুনর্মিলনী ও রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য এর সাথে সম্পৃক্ত সকলকেই আমাদের ভালোবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতা।

x