এই ধর্ষণের দেশ আমার দেশ নয়

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ৭ এপ্রিল, ২০১৮ at ৭:৪৭ পূর্বাহ্ণ
84

সবচেয়ে বড় কথা লজ্জা নয়, মুখ খুলুন প্রতিরোধ করুন। শিশুরা প্রথম শিকার হয় নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে। মায়েরা সচেতন থাকুন, সতর্ক থাকুন।

৪ এপ্রিল দৈনিক আজাদীর হেডলাইন ধর্ষণ কেন বাড়ছে? ৩ মাসে ধর্ষিত ৩৬৩ জন নারী ও শিশু। চমকে উঠেছেন মোটেও না। এসব আমাদের গা সওয়া বিষয় এখন! ধর্ষকামী মানুষের দৈনন্দিন রুটিন ওয়ার্ক। পত্রপত্রিকা সোস্যাল নেটওয়ার্কিং এর কল্যাণে শুধু চোখ বুলালে শত শত ধর্ষণের খবর। কি বলব? কি লিখব? নারী ঘর থেকে বের হচ্ছে, নারী কাজ করছে, জিডিপি বাড়ছে। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হচ্ছে। নারীর আত্মসচেতনতা বাড়ছে। নারী আত্মমর্যাদাশীল হচ্ছে। পাশাপাশি সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র আমাদের সামনে আসছে। কেন বাড়ছে এই অমানবিক আচরণ? কেন মানুষ পশুর মত আচরণ করছে, সচেতনতার কোন ফাঁকে নিষ্পাপ শিশুগুলো ঘৃণ্য পশুর চেয়েও খারাপ পুরুষের লালসার শিকার হচ্ছে? যে দেব শিশু উঠোন পেরুতে শিখেনি ভালো করে কথা বলতে শিখেনি সে শিশুর যোনি ছিঁড়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরাচ্ছে নর্দমার কীটেরা। হবিগঞ্জের ১৪ বছরের মেয়ে শিশুটির কি অপরাধ ছিল? ১১ বছরের বাচ্চা মেয়েটা গর্ভবতী হলো মায়ের বন্ধুর কাছে ধর্ষিত হতে হতে? সৎ বাবার ধর্ষণের শিকার হয়ে পালিয়ে বাঁচলো এক মেয়ে। সামাজিক অবস্থানের কারণে মা জেনেও কিছু করেনি। মেয়েকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি? কতটা অসহায়? এমন স্বামীকেও ছাড়তে পারেনি কোন সমাজের জন্য? কোন আত্মসম্মানের জন্য, ইয়াসমিন তনু রুপা বিউটি এই মেয়েগুলোকে শুধু ধর্ষণ নয়, নিষ্ঠুরতার সাথে মেরেও ফেলেছে। সর্বত্রই ধর্ষণের উৎসব চলছে। স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা। আজ আর একটা নিউজ দেখলাম লাইব্রেরিতে আটকে রেখে এক শিক্ষিকাকে ছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণ। এ না হলে নেতা হবে কেমনে? এসব যোগ্যতা তো থাকতেই হবে। এর আগে আর এক ছাত্রলীগ নেতা সেঞ্চুরি করে উৎসবের আয়োজন করেছিল। এখন কি ধর্ষণ জাতীয়করণের দিকে যাচ্ছে? সেদিন নাকি কোনো এক টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়িকা পূর্ণিমা আর মিশা সওদাগর ধর্ষণ নিয়ে খুব সরস কথাবার্তা ও ঠাট্টা মশকরা করেছে। ভাগ্য ভাল টিভি দেখার অভ্যাস নেই। তাছাড়া এসব অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ এবং রুচি কোনোটাই আমার নেই। মুখ বইয়ে ভেসে বেড়ানো এসব নিউজ ফিডগুলো মাঝে মাঝে চোখে পড়ে। বাংলা সিনেমা এবং হিন্দি সিনেমায় এসব অরুচিকর জিনিস যে আগে দেখিনি তা নয়। এক ধরনের দর্শককে এই বিকৃতি দিয়ে আকর্ষণের চেষ্টা করা হয় ব্যবসা সফলের জন্য। হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে কোনো রকমের অসভ্যতা বর্বরতা ছিল না কিন্তু তাঁর ছবিগুলো অসম্ভব রকমের জনপ্রিয় ছিল সে প্রমাণও আমরা দেখেছি। জনপ্রিয়তার সাথে সাথে তাদের কিছু দায়িত্বও বেড়ে যায়। তারা যদি জনপ্রিয় হয়ে থাকেন এই ধর্ষণ যুগে এই অসম্ভব খারাপ সময়ে কোন টিভি চ্যানেলে এই বিষয়টি আনতে পারে না। এটা নিশ্চয়ই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি। নারী নাকি তার পোশাকের জন্য লাঞ্ছিত হয় ধর্ষিত হয় যারা এসব কথা বলেন তারা বলবেন কি শিশুরা কেন ভোগের বস্তুতে পরিণত হচ্ছে? আগে কেউ দেশ ছেড়ে কোন উন্নত দেশেও যেতে দেখলে বলতাম, না যেওনা এ আমাদের দেশ। যেও না। এখন বলি, যাও চলে যাও এ আমার দেশ নয়। এ কোন্‌ স্বদেশ?

শুধু নিম্ন শ্রেণিতে এসব ঘটছে সর্বত্রই। শ্রেণি নির্বিশেষে। ভোগবাদী সমাজে নারী মুক্তির োগানের আড়ালে চিরকালেই নারী ভোগের পণ্য। নারীর অবস্থান কখন ভাল ছিল? সৃষ্টির আদিতে নারী পুরুষ একে অপরের সম্পূরক ও সহযোগী হিসেবে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে নারী শৃঙ্খলিত হলো নারীর উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলো সম্পদের মতই। সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্রায়ই ধর্ষণের ঘটনার নানা পরিসংখ্যান দিয়ে থাকে। তবে এই পরিসংখ্যানই চূড়ান্ত এমন দাবি করা যাবে না। এর বাইরে অনেক ঘটনা আমাদের অজানা থেকে যায়। ধর্ষিতা এবং প্রতিপক্ষের সামাজিক, অর্থনৈতিকরাজনৈতিক অবস্থানের তারতম্যের কারণে এসব ঘটনাগুলো চাপা থেকে যায়। এমনকি মামলা পর্যন্তও গড়ায় না।

নারীপুরুষ নির্বিশেষে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে আমাদের নারী ও শিশুর জীবন নিরাপদ হবে না। সবচেয়ে বড় কথা লজ্জা নয়, মুখ খুলুন প্রতিরোধ করুন। শিশুরা প্রথম শিকার হয় নিকট আত্মীয়ের কাছ থেকে। মায়েরা সচেতন থাকুন, সতর্ক থাকুন।

দুঃস্বপ্নের মতো এই সময় থেকে মুক্তি চাই। প্রতিদিন শিশু হত্যা, নারীহত্যা, ধর্ষণ এসব আর দেখতে চাই না। সরকার দ্রুত কোন ব্যবস্থা নিক যেন এ সমাজ এ দেশ এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়।

x