এক রোদেলা সকালের গল্প

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ১৫ মে, ২০১৮ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
17

মনে হল এই লোকটিকে বিষয় ধরে নিয়েই তো ইংলিশদের বদলাতে থাকা জীবনযাপনের ছবি তুলতে শুরু করা যায়। কারণ একসময় কাউবয় হ্যাট, লম্বা কানার স্ট্র হ্যাটএর যে চল ছিল তা এখন এরকম ফ্ল্যাট কাপের কাছে হারাতে বসেছে। আর এই ধরনের ক্যাপ তখনকার হালফ্যাশনও। তো আমি ফ্রেম ঠিক করছিলাম, আর ঠিক তখনই কোত্থেকে এক কিশোর এসে সটান ওই লোকটার পেছনে শুয়ে পড়ল। শুয়ে হাতের কাছের একটি ঘাসের ডগা ছিড়ে নিয়ে চিবাতে লাগল, দৃষ্টি আকাশের দিকে। ভাবলাম ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে এও খারাপ না!

আপাতদৃষ্টিতে, কোনও একটি আলোকচিত্র প্রথম দেখায় আমাদের দৃষ্টিতে একটি বা কয়েকটি ভিন্নভিন্ন মাত্রা নিয়ে হাজির হতে পারে। কিন্তু পরেরবার, সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে, বদলায়ও প্রায় সময়। আবার খুব সাধারণ আটপৌঢ়ে কোনও একটি ফ্রেমে ধরা থাকতে পারে চলমান সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিলও। এটি ‘এ সানি সানডে’ বা ‘এক রোদেলা রোববার’ নামক আলোকচিত্রের বেলায়ও খাটে। কিন্তু সেই প্রসঙ্গে আমরা এখনই কিছু জানবো না। জানবো এই ছোট্ট রচনাটি পড়তে পড়তে।

১৯৭৪এর এক রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিকেল, ইংল্যান্ডের জনবহুল শহর ইয়র্কশায়ারের হোয়াইটিবি পোতাশ্রয়ের কাছাকাছি এক পাহাড়ে জড়ো হয়েছে রাজ্যের মানুষ। পাহাড়টি এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে, যেখান থেকে শহরের বেশ খানিকটা দেখা যায়, পোতাশ্রয়ের কিছুটা অংশ নজরে আসে। মানুষজন রোববারের সাপ্তাহিক ছুটিতে সপরিবারে এখানে বেড়াতে আসেন। আলোকচিত্রী ইয়ান ব্যারি ভাবলেন ইংলিশ মানুষদের জীবনযাপনের একটি আলোকচিত্র তুলে রাখা যাক। এটি এমন এক সময়ের কথা যখন ইংল্যান্ডে ঐতিহ্যিক আর সাংষ্কৃতিক বদলের হাওয়া বইছে। ইয়ান ব্যারি তখন কাজ করছেন ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)ণ্ডর বিখ্যাত আলোকচিত্রী, সাংবাদিক ফ্রান্সিস মিডৌ সুটক্লিফের সঙ্গে। যৌথভাবে তারা বিবিসি’র ‘দ্য ইংলিশ’ নামের একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। সেই কাজের ফাঁকেই তিনি এই আলোকচিত্রটি তোলেন। যা আজ ইতিহাসের অংশ। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি বার এই আলোকচিত্রটি দেখা হয়েছে। এই রচনার বাকী অংশটা ইয়ান ব্যারির জবানিতেই শুনবো, কিছুটা সাক্ষাৎকারের ঢঙে।

এ সানি সানডে’ আলোকচিত্রে ঠিক কি বা কি কি ঘটছে?

ছবিটা হোয়াইটিবির এক রৌদ্রস্নাত রোববারের সকাল। সাউথ আফ্রিকা থেকে ফিরে আমি তখন একটা প্রকল্পের সঙ্গে কাজ করছি।

বিবিসি চাইছিলো বিখ্যাত আলোকচিত্রী সুটক্লিফের উপর কিছু কাজ করতে। কাজটি মূলত এরকম, ইংল্যান্ডের সমকালীন আলোকচিত্রী হিসেবে, এবং সুটক্লিফের নিজ শহরের (ইয়র্কশায়ার) বিষয়আশয় তিনি কীভাবে অবলোকন করছেন তার একটি দলিল তৈরি করা। তো সেখানে আমিও যুক্ত হলাম আলোকচিত্রী হিসেবে। ছবিটায় যদি ভালো করে লক্ষ করেন দেখবেন দূরে একটি ক্যামেরা ট্রাইপডে বসানো আছে, যা কীনা আমাকেও তার বিষয় হিসেবে তুলে রাখছে।

শহরটা নিরিখের জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয়না। ফলে দিনটা যদি হয় রোববার, আর ভাগ্যক্রমে তা যদি হয় রৌদ্রকরোজ্জ্বল তাহলে তো কথাই নাই! লোকজন বাক্সপ্যাটরা, খাবারদাবার নিয়ে সোজা এখানে চলে আসে পিকনিক করতে। আমরা যখন সেখানে পৌঁছলাম, আমাদের সবার চোখই প্রায় ছানাবড়া। সহযোগী ক্যামেরাম্যান আর অন্যান্য যারা তাদের কিছুটা হতবুদ্ধি দেখাচ্ছিল। আমি দীর্ঘদিন টিভি’র সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমি জানতাম, একজন ক্যামেরাম্যান শ্যুটিং স্পটে পৌঁছে যখন তার কাঁধের ক্যামেরাটি কোথাও স্থাপন না করে ইতিউতি হাঁটতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে যে কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। যাই হোক আমাদের দলের আরেক আলোকচিত্রী কিছুটা সহৃদয়বান ছিলেন, তিনি কিছুক্ষণের মধ্যে গোটা দলকে বুঝিয়ে ফেলতে সক্ষম হলেন। তিনি নিজেই আগবাড়িয়ে খটাখট ছবি তুলতে শুরু করলেন। আমি কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। নিজের মনেই ছক গোছাতে লাগলাম সম্ভাব্য কাজের। হঠাৎই চোখে পড়লো ফ্ল্যাট ক্যাপ পড়া লোকটার দিকে। মনে হল এই লোকটিকে বিষয় ধরে নিয়েই তো ইংলিশদের বদলাতে থাকা জীবনযাপনের ছবি তুলতে শুরু করা যায়। কারণ একসময় কাউবয় হ্যাট, লম্বা কানার স্ট্র হ্যাটএর যে চল ছিলো তা এখন এরকম ফ্ল্যাট কাপের কাছে হারাতে বসেছে। আর এই ধরনের ক্যাপ তখনকার হালফ্যাশনও। তো আমি ফ্রেম ঠিক করছিলাম, আর ঠিক তখনই কোত্থেকে এক কিশোর এসে সটান ওই লোকটার পেছনে শুয়ে পড়ল। শুয়ে হাতের কাছের একটি ঘাসের ডগা ছিড়ে নিয়ে চিবাতে লাগল, দৃষ্টি আকাশের দিকে। ভাবলাম ছবির বিষয়বস্তু হিসেবে এও খারাপ না!

ফ্রেমের বাইরে তখন কী ঘটছে?

ফ্রেমের বাইরে আরও অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে।

ঠিক এই আলোকচিত্রটি যদি আপনি না তুলতেন, এর বদলে অন্য কোনোও পরিকল্পনা কি ছিলো?

দ্য ইংলিশ’এর জন্য ছবি তোলার কাজই করতাম। কাছাকাছি সময়ে ‘দ্য অবজারভার’ পত্রিকায়ও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে অনেকটা এমতন বিষয়ের ছবি তোলা নিয়ে। আবার তার ক’দিন আগেই হোয়াইটচ্যাপেল গ্যালারি কর্তৃপক্ষ আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে হোয়াই চ্যাপেলের বেশকিছু ছবি তোলার জন্য। ফলে খুবই ব্যস্ত সময় কাটছিলো তখন।

এমন কোনোও বিষয় কি বলবেন যেটা সাধারণ্যে কখনও জানা হয়নি।

সেসময়, হোয়াইটচ্যাপেল গ্যালারি ব্যবহৃত হতো কেবলমাত্র পেইন্টিং, স্কাল্পচার বা অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের প্রদর্শনশালা হিসেবে। সাধারণ লোকজন তেমন একটা আসতোনা এখানে। গ্যালারিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনীর চল শুরুই হয়নি তখন। কর্তৃপক্ষ ভাবলো, যদি সাধারণ মানুষকে গ্যালারিমুখী করতে হয় তাহলে তারা বিষয়বস্তু হিসেবে আছে এমনকিছুর প্রদর্শনী করতে পারলে ব্যাপারটা জমজমাট হবে। এবং তারা তাই করলো। মানুষজন এলো, দেখলো, কেউ কেউ খুশিতে উদ্বেল হয়ে বলল, ‘আরে! ওইতো মার্থা খালাদেখে যাও!’

তথ্যসূত্র: : www.magnumphotos.com/theory and practice/ behind the image an English sunny Sunday

x