এবার ব্রাশফায়ার, নিহত ৫

নানিয়ারচরে শক্তিমানের শেষকৃত্যে যাওয়ার পথে গাড়িতে হামলা, আহত ৯

রাঙামাটি প্রতিনিধি

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৩:৪১ পূর্বাহ্ণ
623

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) নেতা শক্তিমান চাকমার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে রাঙামাটির নানিয়ারচরে দুর্বৃত্তের ব্রাশফায়ারে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক (সংস্কার) প্রধানসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন ৯জন। গতকাল শুক্রবার বেলা ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। শক্তিমান চাকমাকে হত্যার একদিনের মাথায় এ ঘটনা ঘটল।

নিহতরা হলেন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক (সংস্কার) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা (৫২), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সমর্থিত যুব ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতা সুজন চাকমা (৩০), একই সংগঠনের খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা শাখার সভাপতি কনক চাকমা (৩৮), সেতু লাল চাকমা (৩৬) এবং মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মো. সজিব হোসেন (২৮)। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি থেকে নানিয়ারচর আসার পথে খাগড়াছড়িরাঙামাটি সড়কের নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি ফরেস্ট টিলা এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে বলে নিশ্চিত করেছে জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)। জনসংহতি সমিতি এমএন লারমা গ্রুপের রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক বিভুরঞ্জন চাকমা গুলিবর্ষণের জন্য প্রতিপক্ষ ইউপিডিএফকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে বেতছড়ি ফরেস্ট টিলা এলাকায় ইউপিডিএফের সন্ত্রাসীরা গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ করে। এদিকে খাগড়াছড়ি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. নয়নময় ত্রিপুরা বলেন, আহতদের মধ্যে ৪ জনকে চট্টগ্রামে প্রেরণ করা হয়েছে।

গণতান্ত্রিক সংস্কারের (ইউপিডিএফ বর্মা গ্রুপ) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন দলটির মিডিয়া উইংয়ের দায়িত্বে থাকা লিটন চাকমা। ইউপিডিএফ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তপনজ্যোতি।

নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল লতিফ বলেন, খবর পেয়ে হতাহতদের উদ্ধারে তাৎক্ষণিক পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গেছে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত তপন জ্যোতি চাকমা, কনক চাকমা ও সুজন চাকমা নামে ৩ জনের লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে সেতু লাল চাকমা নামে ১ জন ও গাড়ির চালক মো. সজিব মারা যান।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ইউপিডিএফ সংস্কারের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মা তার লোকদের নিয়ে গাড়িতে করে জেএসএস সংস্কারের সহসভাপতি ও নানিয়ারচর উপজেলার চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে প্রতিপ নানিয়ারচর উপজেলার বেতছড়ি এলাকায় অ্যাম্বুশ করে ব্রাশফায়ার করে তাদেরকে হত্যা করে। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ (সংস্কার) মূল ইউপিডিএফ প্রসিত গ্রুপকে দায়ী করেছে।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানে তার কয়েকজন সমর্থক ও সহকর্মী একটি মাইক্রোবাসে করে খাগড়াছড়ি থেকে নানিয়ারচর যাচ্ছিলেন। পথে ওই এলাকায় পৌঁছলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল অস্ত্রধারী মাইক্রোবাসটি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। প্রথমে চালক মো. সজিবের গায়ে গুলি লাগে। এতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি উল্টে যায়। এরপর এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করে অস্ত্রধারীরা। গুলিতে ঘটনাস্থলে ৩ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি জেনারেল হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী। সেখানে চালকসহ ২ জন মারা যান।

ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে ৫ জনকে হত্যার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউপিডিএফের মুখ্য সংগঠক মাইকেল চাকমা বলেন, তারা যে অভিযোগটা করেছে, এটার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে। এটা খুবই অপরিপক্ব অভিযোগ। আমরা মনে করি, প্রতিপক্ষ হিসেবে তারা যে অভিযোগটা করল, এখানে ঘটনার সাথে মূলত যারা জড়িত তারা রক্ষা পেয়ে যাবে।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ঘটনাস্থল পুলিশ ঘিরে রেখেছে। পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান অব্যাহত রেখেছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, অ্যাডভোকেট শক্তিমান চাকমা ২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) নামে গঠিত নতুন দলে যোগ দেন। তিনি ছিলেন ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। বৃহস্পতিবার বাসা থেকে মোটরসাইকেলে করে উপজেলা পরিষদে নিজের কার্যালয়ে যাওয়ার সময় গুলি করে হত্যা করা হয় শক্তিমানকে। সে সময় তার সঙ্গে থাকা জেএসএস (এমএন লারমা) নানিয়ারচর উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রূপম চাকমাও গুলিবিদ্ধ হন।

গত মার্চে খাগড়াছড়ির ইউপিডিএফ নেত্রী মন্টি চাকমা ও দয়াসোনা চাকমাকে অপহরণের ঘটনায় যে মামলা হয়েছিল, সেখানে শক্তিমান চাকমা ও তপনজ্যোতি চাকমাসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের শুরুতে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা হত্যা মামলার এজাহারেও আসামি হিসেবে ওই দুজনের নাম ছিল।

বাসস জানায়, এই ঘটনায় আহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হচ্ছে দিগন্ত চাকমা, অর্চিন চাকমা, অর্জুন চাকমা, জেলজি কুমার চাকমা, মিহির চাকমা, জীবন্ত চাকমা, কান্তি রঞ্জন চাকমা ও প্রীতি কুমার।

x