এসএসসির ফলাফল : আমাদের এগিয়ে যেতে হবে অনেক দূর

বুধবার , ৯ মে, ২০১৮ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ
147

এবারের এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে নানা উৎকণ্ঠা ছিল পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে। পরীক্ষার শুরু থেকেই ছিল প্রশ্ন ফাঁসের মতো ঘটনা। ফলে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যেমন ছিল উদ্বেগ, তেমনি ছিল অনিশ্চয়তা। সুষ্ঠু ও সুস্থির মনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ হয়ে পড়েছিল অকল্পনীয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চলবে কিনা, নাকি বাতিল হবে, বাতিল হলে এর পরে কী হবেতা নিয়ে ঘুরতে থাকে নানা প্রশ্ন। এছাড়া খাতা মূল্যায়ন কেমন হবে, ফলাফল কেমন হবে তা নিয়েও ছিল নানা রটনা। সব গুজব ও গুঞ্জনকে ছাপিয়ে অবশেষে গত ৬ই মে ফলাফল প্রকাশিত হলো। এতে দেখা গেল চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে ৭ বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে খারাপ ফল। পাসের হার ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। এটা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমার পেছনে প্রশ্ন ফাঁসকেও কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বলছেন, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের উপর নির্ভর করে পরীক্ষা দিতে গিয়ে অন্য সেটের প্রশ্ন পাওয়া, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন খোঁজায় সময় নষ্ট এবং প্রশ্ন পাওয়ার ভরসায় লেখাপড়ায় মনোযোগ না দেওয়ায় অনেকের ফল খারাপ হয়েছে।

ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ২০১২ সাল থেকে গত ৭ বছরে এবারই এসএসসিতে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে। এবার পাস করেছে ৭৫.৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী। যা গতবারের (২০১৭ সালের) তুলনায় ৮.৪৯ শতাংশ কম। ২০১৭ সালে পাসের হার ছিল ৮৩.৯৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে পাস করে ৯০.৪৫ শতাংশ। ২০১৫, ২০১৪, ২০১৩ ও ২০১২ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৮২.৭৭, ৯১.৪০, ৮৮.০৪ ও ৭৯.০১ শতাংশ। গত দুই বছরের তুলনায় কমেছে জিপিএ প্রাপ্তির সংখ্যাও। গত ৭ই মে আজাদীতে প্রকাশিত ‘নতুন পদ্ধতির ভয় ও প্রশ্ন ফাঁসের আতঙ্কের প্রভাব ফলাফলে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত বছরে এমন দুর্বল ফলের কারণ হিসেবে এবারের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের আতঙ্কের প্রভাবের পাশাপাশি গত বছর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘিরে ভয় না কাটাকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য গণিতে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করাটাও এবার দুর্বল ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টরা। তবে তথ্য বলছেনতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণেই গণিতে পাসের হার কমছে। এবারের প্রকাশিত ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের পাসের হার সবচেয়ে কম চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে। যা সামগ্রিক ফলাফল ছন্দপতনে ভূমিকা রেখেছে। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ীএবার সবচেয়ে কম ৮৮.১১ শতাংশ পাসের হার গণিতে। ইংরেজিতে গড় পাসের হার ৯২.২৪ শতাংশ। অথচ ২০১৬ সালে গণিতে গড় পাসের হার ছিল ৯৬.৮১ শতাংশ। আর ইংরেজিতে ৯৭.৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। কিন্তু নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকরের পর ২০১৭ সালে এক ধাক্কায় গণিতে গড় পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৯১.৭৭ শতাংশে। আর ইংরেজিতে ৯৪.৬১ শতাংশ। গণিত ও ইংরেজির বাইরে বাকি সব বিষয়ে গড় পাসের হার ছিল ৯৭ শতাংশের উর্ধ্বে। কয়েকটি বিষয়ে এ হার ৯৯ শতাংশেরও বেশি। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। গণিত ও ইংরেজির বাইরে এবারও অন্যান্য সব বিষয়ের গড় পাসের হার ৯৬ শতাংশের উর্ধ্বে।

আসলে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। পাবলিক পরীক্ষায় এমন প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়েছে। এসব বিষয়ে যাচাইবাছাই করতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে মাঠে নেমেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। গ্রেফতার করা হয়েছিল বেশ কয়েকজনকে। শুরুর দিকে কিছু কিছু মহল থেকে পরীক্ষা বাতিলে সুপারিশ আসলেও পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরীক্ষা বাতিল হবে না। আসলে সরকার চাইলে এটি বন্ধ করতে পারে, তার প্রমাণ তো এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু এসএসসিতে সব পরীক্ষায়ই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে।

তাই এ বিষয়ে আরো কঠোর হতে হবে। এবারের ফলাফল যা হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে অনেকদূর। এক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরকে আরো তৎপর হতে হবে। কারণ সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া সফলতা আসবে না।

x