ওয়ান প্লাস ওয়ান ডাজ ইট মেইক ওয়ান

ব্রাত্যজন

মঙ্গলবার , ৮ মে, ২০১৮ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ
140

আমি জানি যে আমি কিছুই জানি না সক্রেটিসের এই প্যারাডক্সিকাল মন্তব্যের মতোনই উপরের ওই ১ + = ১। প্যারাডক্স মানে তো বিভ্রান্তি, যার উত্তর এই মুহূর্তে দেয়া যাইতেছে না, মানে কোনটা যে সঠিক উত্তর সেইটা ভাবতে গিয়া মগজে একটা প্যাজগী লাইগা যাইতাছে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন বউ কইলো, কালকে ডি সি হিলে আমার প্রোগ্রাম আছে, তুমি যাইবা না? আমি উত্তর দিছি, ধুর, এত ভিড়ের মইধ্যে ওইখানে আইজ কাইল কেউ যায় না। বইলাই বুঝলাম একটা প্যাজগী মার্কা কথা কইয়া ফেলছি, কইলাম ‘ওইখানে কেউ যায় নাম্ব, আবার ‘ওইখানে ভিড়ম্ব। এইটাই প্যারাডক্স।

ডেনিস ভিলেন্যুভ (Denis Villeneuve) রে প্রথম চিনছি তাঁর সিনেমা এরাইভাল দেইখা। যা হয় আর কি, কোনো সিনেমা ভাল লাইগা গেলে ওই পরিচালকের আরও সিনেমা দেখতে ইচ্ছা করে, সেইভাবেই নেট ঘাইটা একসময় দেইখা ফেলছিলাম এনিমি আর মেইলস্টর্ম, আরেকটা ভাল সিনেমা আছে তাঁর পলিটেকনিক, ওইটা পাই নাই। মজার ব্যাপার হইল সিকারিও যে তাঁর সিনেমা এইটা আমি তখনও জানতাম না, অথচ সেইটা দেখছি সবার আগে।

যাই হোক এইগুলা খুচরা আলাপ, বলতে আসছিলাম ইন্সেন্ডিস (Incendies) সিনেমাটার কথা। অনেকবার শুনবার পরও দেখি দেখমু এমন কইরা সিনেমাটা আর দেখা হয় নাই। এই যে আগে দেখি নাই, সেইটা দেখবার পর এখন নিজের কাছেই ক্রাইমের মতোন লাগতাছে। আচ্ছা, এখন সিনেমাটার ভিতরে যাই, প্রথম শটটা এমন একটা মরুভূমি দেখা যাইতেছে একটা জানালা দিয়া, ফেইড আপ শট, খুব মুভমেন্টে ক্যামেরা পিছনের দিকে যাইতে শুরু করে আর রুমের ভিতরে দেখা যায় বেশ কিছু অস্ত্রধারী মানুষজন, তারা বাচ্চাগো চুল কামাইয়া ফেলতাছে। এই বাচ্চাগুলারেই যোদ্ধা বানানো হইব। ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা গান বাজতাছে রকব্যান্ড ৗটঢধমদণটঢ এর চমল টভঢ ষদম্রণ টরবহ? গানটা, এর মধ্যে দেখা গেল ওই বাচ্চাগুলার মধ্যে একজন ক্যামেরার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকায়া আছে, সে কিন্তু আর কোনো সিনে নাই, ওই একটাই সিন, নিষ্পলক তাকায়া থাকা। খুবই আশ্চর্যরকমের এই তাকায়ে থাকা এবং ওই লুকটাই দর্শকরে সিনেমার মধ্যে ঢুকায়ে ফেলবে। সেই ছোট্ট ছেলেটারে পরবর্তীতে আর না দেখাইলেও এই ছেলে কে, সে কি করে এইটা ছবির বাকি চরিত্রগুলার উপর ভীষণ প্রভাব বিস্তার করে।

অস্কার নমিনেশন পাওয়া এই সিনেমাটা নিছক একটা থ্রিলার হইলেও কেবলই একটা থ্রিলার ব্র্যাকেটে এইটারে ফালায়ে রাখা ঠিক হইব না বইলা আমার মনে হয়। এইটা তার চাইতেও একটু বেশি কিছু। এই সিনেমার মাধ্যমে এই সত্যটা আরও একবার প্রবলভাবে উপস্থাপিত হইছে যে, কেবলমাত্র ধর্মের কারণে কাউরে ঘৃণা করা কতটা ফালতু ব্যাপার হইতে পারে। এই সিনেমার আসল ম্যাসেজ হইল, জন্মতো কারও হাতে নাই, যে কোনোভাবে মানুষের জন্ম হইতে পারে, আর জন্মের কারণে মানুষ যে ধর্ম পায় সেইটাই বিশ্বের ট্রেন্ড, তো এই ট্রেন্ডের কারণে কাউরে ঘৃণা করা তো নির্বোধের মতোন কাজ।

ছবির সারসংক্ষেপ মোটামুটি এই রকম, যমজ ভাইবোন জেন মারওয়ান আর সিমন মারওয়ানের লাইগা মৃত্যুর আগে তাগো মা নোয়াল মারওয়ান অদ্ভুদ এক উইল রাইখা গেছিল। মেয়েটার মানে জেনরে একটা চিঠি পৌঁছায়া দিতে হবে তাদের বাবার কাছে আর ছেলেরে বলা হইল তাদের আরেক ভাই আছে, সেই ভাইরে একটা চিঠি পৌছায়া দিতে হবে। এই কাজ শেষ হবার আগে তারা তাগো মায়ের অন্তেষ্টিক্রিয়ার কোনো কাজ করতে পারব না। ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে সিম্পল মনে হইলেও, তেমন না, কাজটা বরং ভয়াবহ মাত্রার জটিল। প্রথমত, তাগো বাবা সম্বন্ধে মা কোনদিনই কিছু কয় নাই, এখন ওই লোক বাইচা আছে না মইরা গেছে সেইটাও তারা জানে না। দ্বিতীয়ত, ভাইয়ের কথা তো আজই প্রথম শুনলো, সুতরাং যে দুইটা মানুষ সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না, সেই মানুষগুলারে এত বড় পৃথিবীতে খুঁইজা বাইর করা তো বিরাট মুসিবতের ব্যাপার।

তো, তাগো লগে তো আর আমগো অনন্ত জলিল সাহেবের পরিচয় আছিল না, অগত্যা এই অসম্ভবরে সম্ভব করনের লাইগা জেন মারওয়ান তাগো মায়ের জন্মস্থানে ছুইটা গেছে, পরবর্তীতে তার ভাইও তার লগে যোগ দিছে। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হইতে থাকে এক বিপ্লবী নারীর জীবন সংগ্রামের কাহিনী। এইটুকুই বলি আজ, বাকিটা কইলে সিনেমা স্পয়েল করবার অভিযোগ শুনতে হইতে পারে, মানে আমার মতন এখনো যারা দেখেন নাই আর কি, তারা গোস্যা করতে পারেন।

এই সিনেমায় পরিচালকের বিশেষত্ব হইল উনি মানুষের চিরাচরিত ভাবনার জগতরে একটা নাড়া দিতে পারছেন, মানে সব মানুষ তো ঘাতক না, কিন্তু দেখা যাইতেছে সবাই ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতাছে, আবার এই যে সে একটা খুন করলো, সেইটারে জাস্টিফাই করতে ঈশ্বর এবং ধর্মরে আর্মার হিসাবে ইউজ করতাছে। যখন প্রচুর খুন খারাবি ঘইটা গেছে দেখা গেল তখন তারা আর ঈশ্বররেও চায় না, তারা তখন ব্যস্ত তাগো ব্যক্তিগত কিংবা আঞ্চলিক দ্বৈরথ নিয়া। একটা ভয়ংকর দৃশ্য হইল, ছোট ছোট বাচ্চা ছেলেগুলারে তাগো বয়সীই আরেকটা ছেলে টপাটপগুলো কইরা মাইরা ফেলতেছে, যাদের কারোরই জীবন সম্পর্কে তখনও প্রকৃত কোন ধারণা গইড়া উঠে নাই।

যাই হোক, সিনেমাটা দেখবার পর মাথার মধ্যে প্রশ্নের ভজঘট লাইগা গ্যাছে। এর মধ্যে একটা প্রশ্ন হইল এই রকম, আচ্ছা তাগো মায়ের কি দরকার আছিল চিঠি লেইখা পোলামাইয়ারে এইসব জানানোর? উনি সুস্থ অবস্থায় কইয়া দিলেইতো পারতেন। তাঁর এই চিঠি লেখা এবং এই খুঁইজা বাইর করবার প্ল্যান ব্যর্থওতো হইতে পারতো, মানে যদি তারা খুইজা না পাইতো, তাইলে কি হইতো, ব্যাপারটা একটু রিস্কি হইয়া গেল না? আমার কাছে এইটারে আসলে পরবর্তীতে ম্যাকগাফিন (ুটডঐলততধভ) মনে হইছে। ম্যাকগাফিন কি সেইটা আজকাল সবাই জানে। আসলে এই চিঠি লেখাটারে আমার ওই ম্যাকগাফিনই মনে হইছে, মানে সেই চিঠিগুলা সিনেমাটার একটা প্যাসেজ তৈরি কইরা দিছে। যেমন, স্পাই থ্রিলারে দেখা যায় একটা নেকলেস বা এক টুকরা কাগজের উপর ভর কইরা গল্প গড়ায়, সেইরকম।

আচ্ছা, এই বয়ান শুরু করছিলাম প্যারাডক্স দিয়া, সিমন সিনেমার প্রায় শেষ দিকে আইসা ঘটনা প্রসঙ্গে বোনরে জিজ্ঞাসা করছিল, আইচ্ছা ১+১ কি কখনো ১ হইতে পারে? এই সূত্র ধইরাই একটা গল্প বলি, এক উকিল তাঁর ছাত্ররে ওকালতি শিখাইছেন, তাগো মধ্যে শর্ত আছিল এই রকম, যেদিন লেখাপড়া সাইড়া প্রথম কেইস সেই ছাত্র জিতব তখন স্যাররে তাঁর প্রাপ্য বেতন দিয়া দিব। কিন্তু, ছাত্র আছিল বিখাউজ। সে স্যাররে টাকা দিতে হইব এই চিন্তা থিকা কোন কেইস হাতে নেয় না। স্বভাবতই শিক্ষক মশাইও টাকা পাইতাছে না। অবস্থা দেইখা শিক্ষক পাওনা চাইয়া একটা মামলা ঠুইকা দিল ছাত্রের নামে। তাঁর যুক্তি হইল, আমি যদি হারি, তাইলে কেস জিতে ছাত্র, আর ছাত্র জিতলে তো স্যার তাঁর পাওনা পাবেন, আর যদি হারেন তাইলে পূর্বের শর্ত অনুযায়ী ছাত্র তাঁরে পাওনা মিটায়া দিতে বাধ্য। এখন ছাত্রও কোমর বাইন্ধা কেইস লড়তাছে, তার যুক্তি হইল কেস হাইরা গেলে তো শর্ত অনুযায়ী টাকা দিতে হইব না, আর যদি জিত্যা যায় তাইলে কোর্টের রুল অনুযায়ী টাকা দেওনের প্রশ্নই আসে না। এখন কি হইব কন তো! বিশাল জট, সমাধান ভাবতে থাকেন। আজকের মতোন বিদায়।

x