কবিগুরু

রেজাউল করিম

বুধবার , ৯ মে, ২০১৮ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
30

রবীন্দ্রনাথ মিশে আছেন বাঙালির হৃদয়ে। সকলের মাঝে তিনি দেদীপ্যমান। সব বয়সীদের জন্য তাঁর সৃষ্টি মনে দোলা দেয়। ছোটদের জন্য তাঁর রচনা অতুলনীয়। কবি ছোটদের অনেক স্নেহ করতেন, আদর করতেন, অনেক ভালোবাসতেন। ছোটদের সঙ্গে একটু সময় পেলেই কবি খেলায় মেতে উঠতেন। কবি তখন হয়ে যেতেন ছোট্ট খোকা। আর তখনই কবি খেলার ছলে আপন মনে লিখে যেতেন ছড়া, কবিতা, গান, নাটকসহ অনেক কিছু।

কবি ছোটদেরকে কখনও অবহেলার চোখে দেখেননি। তিনি ছোটদেরকেও বঞ্চিত করেননি তার সাহিত্য ভাণ্ডার থেকে। কবি ছোটদের চাওয়াপাওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাদের আশাআকাঙক্ষা, দুঃখকষ্ট এবং হাসিআনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে কবি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল এবং দায়িত্ববান একজন অভিভাবক। কবি ছোটদের নিয়ে লিখেছেন-‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁেক বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে/ পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি/ দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি/ চিকচিক করে বালি, কোথা নাই কাদা/ এক ধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা/ কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক/ রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক/ তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/

গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে/ আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভরো ভরো/ মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর/ দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া/ বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া’।

কবি পাখি নিয়ে লিখেছেন-‘কিচিমিচি করে সেথা/ শালিকের ঝাঁক/ রাতে উঠে থেকে থেকে/ শেয়ালের হাঁক’।

প্রকৃতির কবি, প্রেমের কবি, ভালোবাসতেন বৃষ্টিও। পাখির কিচির মিচির গান গাওয়া, নদীর কলকল ছলছল ছুটে চলার ধ্বনি কবির মনকে আনন্দ দিয়েছে। নদীর কথা, বৃষ্টির কথা, পাখির কথা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তার ছড়াকবিতায়। আষাঢ় মাসের মেঘ দেখে কবি বলেছেন-‘নীল নব গনে আষাঢ় গগনে/ তিল ঠাঁই আর নাহিরে/ ও গো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।’

বৃষ্টির পর আকাশে রোদ উঠেছে। রংধনুর সাত রঙের লুকোচুরি খেলা। বেজে উঠেছে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা। বাঁধ ভাঙা ছেলেমেয়েদের বাড়ির পানে ছুটে চলা। রংধনুর সাত রঙের সঙ্গে এ সময় ছেলেমেয়েরা আনন্দে মেতে উঠে। এই আনন্দের মুহূর্তে আরও একটু বেশি আনন্দ দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন-‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে/ বাদল গেছে টুটি/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই/ আজ আমাদের ছুটি।’

মা পালকিতে করে যাচ্ছিলেন। আর খোকা যাচ্ছিল মায়ের পাশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে। মা তখন ভীষণ ভয় পাচ্ছিলেন। ডাকাতের ভয়ে মা ভেঙে পড়েছেন। ‘তুমি ভয়ে পালকিতে এক কোণে/ ঠাকুরদেবতা স্মরণ করছ মনে/ আমি যেন তোমায় বলছি ডেকে/ আমি আছি, ভয় কেন মা করো।’ কবি মা’কে এভাবেই সাহস দিয়ে যাচ্ছিলেন। কবির ইচ্ছে হলেই মা’কে নিয়ে দেশবিদেশে ঘুরে বেড়াতেন। কখনও রাজপুত্র হয়ে আবার কখনও বীরপুরুষ হয়ে। মা খোকাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। আর তাইতো কখনও না করতে পারেননি। খোকার যে কোনো ইচ্ছাই মা হাসি মুখে মেনে নিতেন। খোকা এখানেও তার ইচ্ছার কথাটি বলতে ভুল করেনি।

চাঁদকে নিয়ে কতো গল্পকবিতাছড়া লেখা হয়েছে তার হিসেব নেই। চাঁদ শিশুদের যেমন প্রিয়, তেমনি বড়দেরও। চাঁদকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রচুর লিখেছেন। ‘দিনের আলো নিভে এল/ সূর্যি ডোবে ডোবে/ আকাশ ঘিরে মেঘ ছুটেছে/ চাঁদের লোভে লোভে।’ আবার রচনা করেছেন-‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে।’

কবিগুরুর ছড়ায় ছড়িয়ে রয়েছে মজা, মিশে রয়েছে অদ্ভুত সব কাহিনি। তিনি কখনো হেঁটেছেন বাস্তব জগতে, আবার কখনো বিচরণ করেছেন কল্পনার জগতে। শিশুদের মনকে বুঝতেন বলেই তাদের উপযোগী রচনায় তিনি ছিলেন দক্ষ। তাঁর ‘শিশু’, ‘শিশু ভোলানাথ’, ‘খাপছাড়া’, ‘ছড়ার ছবি’, ‘ছড়া’ ইত্যাদি বই ছোটদের আনন্দে ভাসিয়ে দিয়েছেন। ছোটদের জন্য তিনি কখনো ছোট হয়েছেন, আবার কখনো নিজে ছোটদের উদ্দেশে বড় হয়ে লিখেছেন। ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/ সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে।’ তখন মনে হয়, কোনো চিরপরিচিত গ্রামের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। তালগাছটা একটা মানুষ হয়ে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো আবার তিনি হয়ে গেছেন মাঝি। ‘আমার যেতে ইচ্ছে করে/ নদীটির ওই পাড়ে/ যেথায় ধারে ধারে/ বাঁশের খুঁটায় ডিঙি নৌকা/ বাঁধা সারে সারে।’

ছোটদের জন্য রচনা করেছেন নাটকও। কবির ‘ডাকঘর’ নাটকটি সবার কাছে প্রিয়। অমলের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার প্রত্যাশা সব শিশুর অন্তরের ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। দইওয়ালার ডাক শুনে মনে হয় আমাদের ঠিক পাশ দিয়ে যেন দইয়ের ডুগি নিয়ে ছুটে চলেছে কোনো লাল মাটির দেশের দইওয়ালা। কিন্তু বর্তমানের নাগরিকশিশু ‘দইওয়ালা’ চিনে না বললেই চলে। তারা কল্পনার জগতে ‘দইওয়ালা’ খুঁজে পায় এই নাটকে। কবির ‘ছুটি’ গল্পের ফটিকের কথা যে একবার পড়ে সে আর তাকে ভুলতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ সালের ৭ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর অভিজাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গ থেকে ব্যবসায়ের সূত্রে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেষ্টায় এ বংশের জমিদারি এবং ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে লালিত এবং আত্মপ্রতিষ্ঠিত দ্বারকানাথ ব্যবসাবাণিজ্যের পাশাপাশি জনহিতকর কাজেও সাফল্য অর্জন করেন। জমিদার বংশের হয়েও রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। ১৯১৩ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন।

কবির প্রতিটি সৃষ্টিকর্মে রয়েছে গভীর মমত্ববোধ, ভালোবাসা। সবার জন্য সাহিত্য রচনার জন্য তিনি সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি ছোটদের ভালোবাসতেন বলেই ছোটরা তাঁকে ভালোবাসতে পেরেছে। ছোটদের উপযোগী সাহিত্য তিনিই প্রথম সমৃদ্ধ করে তুলতে সচেষ্ট হন। উপহার দিয়েছেন অসাধারণ সব বই। তিনি শুধু বিশ্বকবি নন, শিশুদের কবিও।

x