কর্ণফুলী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি

শনিবার , ১২ মে, ২০১৮ at ৪:৪৫ পূর্বাহ্ণ
56

কর্ণফুলীকে দখল ও দূষণমুক্ত করতে দিনব্যাপী আয়োজিত সাম্পান খেলা ও চাঁটগাইয়া সংস্কৃতি মেলায় কর্ণফুলী রক্ষায় হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এতে বক্তারা বলেন, কর্ণফুলী বাঁচলে, বাংলাদেশ বাঁচবে এই োগান এখন বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলন। নদী ব্যবহারকারী বন্দরকে এই আন্দোলনের দাবি বাস্তবায়নে সক্রিয় হতে হবে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও কর্ণফুলী কেন দখলমুক্ত হচ্ছে না এর প্রতিউত্তর জেলা প্রশাসককে দিতে হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা না হলে আমরা লাগাতার আন্দোলন করবো। উল্লেখ্য, ৯০ দিনের মধ্যে নদীর উভয় পারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। ইতোমধ্যে অনেক সময় পার হলেও ওই রায় বাস্তবায়ন হয় নি এখনো। তবে এ উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে বলে এসেছে স্থানীয় প্রশাসন।

কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ধারক ও প্রাণভোমরা হিসেবে খ্যাত। এ নদী প্রকৃতির অপার দান। দেশের অর্থনীতিতে এই নদীর অবদান অপরিসীম। উদার হস্তে এই নদী দিয়ে যাচ্ছে দেশ ও জাতিকে। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় এই নদী এখন ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়ছে। নদীটির প্রাণস্পন্দন এখন অনেকটা ম্রিয়মাণ। ক্রমাগত দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে কর্ণফুলী আজ তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরে গড়ে উঠেছে ২ হাজারেরও বেশি অবৈধ স্থাপনা। নদীর আশপাশের শিল্পকারখানার বর্জ্য, সিটি করপোরেশনের পয়োবর্জ্য ও গৃহস্থালি বর্জ্যের একাংশের ময়লাআবর্জনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ

ভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযোগ থাকা ১৭টির বেশি খালছড়া দিয়ে জাহাজের তেলবর্জ্যও সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। বিষিয়ে উঠেছে নদীর পানি। ময়লাআবর্জনা ও বর্জ্যের দূষণে খালছড়াগুলোও বলতে গেলে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নদীর আশপাশের বেশিরভাগ শিল্পকারখানায় ‘তরল বর্জ্য শোধনাগার’ বা ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপন করা হয়নি। ফলে এসব কারখানার দূষিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে এসে পড়ছে। দিনের পর দিন দূষণ বাড়তে থাকায় নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কাঙিক্ষত মাত্রার চেয়ে কমে গেছে। অব্যাহত দূষণের কারণে কর্ণফুলী নদীতে মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। দূষণের কারণে নদীর পরিবেশপ্রতিবেশ ব্যবস্থা বিনষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে লবণাক্ততার মাত্রা। দূষণ বাড়তে থাকায় নদী ও নদীর আশপাশের সার্বিক জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার দখল ও দূষণে জমছে পলি, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদী। নদীতে চর পড়ে নদীর গভীরতা যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নদীর প্রশস্ততাও কমে নদীটি ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। কর্ণফুলী নদী ও এর আশপাশের খালগুলোর নাব্য সংকট দূর করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম নগরীতে আবার ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেবে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার পালিত এ প্রসঙ্গে বলেন, কর্ণফুলী দখল ও দূষণে মানুষের চেয়ে নদী ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়ভার বেশি। বন্দর মোহনা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তপক্ষের। কিন্তু তারা কখনও সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি। কর্ণফুলীতে নোঙ্গরকারী শত শত জাহাজের পোড়া তেল প্রতিনিয়ত কর্ণফুলীতে ফেলছে। বন্দর নীরব। চট্টগ্রাম মহানরগীর ৭০ লক্ষ মানুষ সৃষ্ট বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলী পড়ছে। এক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ওয়াসা নীরব দর্শক। নদীর উভয় তীরের শতাধিক শিল্প কারখানা, বাজার, ঘাটের মাধ্যমে নদী দূষণ হচ্ছে। কিন্তু দেখার কেউ নাই। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। কর্ণফুলী রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন আরো জোরদার করার বিকল্প নেই। খরস্রোত না হলে অনেক আগেই কর্ণফুলী বুড়িগঙ্গা হয়ে যেত। কর্ণফুলী জোয়ার ভাটা রাসায়নিক ও মানুষ্য সৃষ্ট বর্জ্য সাগরে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সাগরের দূষণ দিন দিন বেড়ে চলেছে।

এ জন্য কর্ণফুলী সঠিক শাসন করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশের অর্থনীতিতে কর্ণফুলী নদীর গুরুত্ব বিবেচনা করে এই নদী রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

x