কাব্যগ্রন্থ : ‘হৃদ্যা আমিও জেগে আছি’

আরিফ চৌধুরী

শুক্রবার , ৪ মে, ২০১৮ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ
24

মানুষের অভিজ্ঞতার রূপময় প্রকাশ যদি হয় কবিতা । তার অভিজ্ঞতার উপলব্দিতে অনুপ্রাণিত হয়ে কবি তার উন্মুখ যত শব্দমালা অন্ত:নিহিত শক্তিতে প্রকাশ করে কবিতাকে করে তোলেন রূপময়। কবিতা সৃষ্টির উৎস হতে কবিতায় মনন ও শব্দ বৈচিত্র্যতার মৌলিকতা কে নিজের প্রত্যয়ে নতুন স্বরে ও মহীমায় সৌন্দর্য্যময় করে তোলেন পাঠকদের ভাল লাগার মধ্য দিয়ে। নিজের অভিব্যক্তিময় মানস ও মননের ভাবনার উপজ্যিব্য করে কবি তার নিজের কবিতায় শব্দ,ছন্দেও বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে কবিতাকে পরিণত আপন চিন্তা ও চেতনায়। ভাষার ব্যবহার, সৃষ্টিতে কবি তার নিজস্ব কৌশলে কবিতাকে প্রকাশ করেন সৃষ্টির আধুনিকতার অপরিমেয় ভীন্নতায়। কবিতা হয়ে উঠে সবকিছুর উর্ধে ও তার পরিচয় হয় পাঠকদের কাছে নতুন করে গ্রহণ করার চেতনায়।

কবি শাহীন মাহমুদ ও তেমনি করে কবিতাকে ধারণ করেছেন ভাষা ও ছন্দের কারুকাজে উওর আধূনিকতার বলয়ে। নিজস্ব ধ্যান ও মননের চর্চায় তার সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ‘ হৃদ্যা আমিও জেগে আছি’ তে। শব্দ, ভাষাবোধ নির্মাণ শুধু নয় কবিতাকে বৈচিত্র্যময়তার চাদরে অন্তরঙ্গ আত্বপরিচয়ের বিচারে কবি ভিন্নতার পরিচয় দিয়েছেন কাব্য’র শরীর নির্মাণে। কবিতায় শব্দের ঐশ্যর্যমন্ডিত ব্যবহার , ছন্দের প্রয়োগের সকল কৃত্রিমতাকে পরিহার করে কবি কবিতাকে স্বতন্ত্র নতুনত্বের স্বরে রুপ দিতে কবিতায় নতুন কৌশলের ব্যবহারে সচেতন ছিলেন। কবিতায় উচ্চারণ করেছেন প্রাণিত শব্দাবলীর সৃষ্টিতে এক নতুন রুপময়তা। কবিতার সৌন্দর্য্যময় ও নৈ:শব্দ নির্ভর প্রকৃতির চেতনাকে উচ্চকণ্ঠে ধারণ করে কবি স্বতন্ত্র ধারায় কবিতাকে শুদ্ধতার ডানায় নতুন পথের দিকে পথ খুঁজেছেন্‌ । মানবতার বিবেকী সময়ে, মানুষ মানুষের প্রতি যে নির্দয় আচরণ করে, কঠিন সময়ের দিকে মানুষকে ঠেলে দিয়ে জীবনের আশ্রয়হীন অনিশ্চিত জীবনের দহন সময়ে পৌঁছে দেয়, , রাজনীতির লোলুপ খেলায় মাতে, হত্যায় মাতে এক শ্রেণির রাষ্ট্র। তেমনি মানবতা বিরোধী কঠিন সময়ের সংকটকে কবিতায় উচ্চারণ করেছেন

নড়ে “উঠো বিশ্ব বিবেক, উঠো মানবতা

মানব জাতির ইতিহাস থেকে মুছে দাও

এ বর্বর জাতিকে

কেড়ে নাও শান্তির নোবেল

ঘৃণা জানাও এ নৃশংস ঘাতককে”।

( মংডু রোডেপৃষ্টা২৯)

কবিতায় কবি চলার ছন্দের মতোন ধারণ করেন নান্দনিকতার রহস্যময়তায় , অভিব্যাক্ততে নিজের স্বপ্ন কল্পনায় কবি কবিতার নির্মাণে অনুভুূতির গভীরতায় খুঁজে নিতে চান নতুন সৃষ্টির পথ। নিজের জমানো কষ্টগুলোকে কবি প্রকাশ করেন, অনুভব করেন শব্দের উৎস থেকে নিরন্তর নতুন বৈচিত্র্যতার উৎস সন্ধানে।

তাইতো বলেন– “বুকের জমানো পাথর পাবে না খুঁজে নুরির দেখা

দু’চোখ পেতেছি স্বপ্ন দেখবো বলে হয়ে উন্মুখ

কাঁপছি কষ্টে অচেনা সেই চির চেনা মুখ।

ভুলের দহনে পুড়ি তাই

পোড়াই শুধু পাতার চুরুট।

(পাতার চুরুটপৃষ্টা১৭ )

একুশ আমাদের চেতনা বিকাশের আত্মপরিচয়ের উৎস। একুশকে ঘিরে যে পূর্ণতা ও মানবিক চেতনাবোধ ধারণ করে যে গথ চলা সে পথে একুশ আমাদের অহংকার। নতুন শব্দমালায় একুশ কে উপজ্যিব্য করে উচ্চারিত হয়েছে কবিতার শব্দরুপ, অভিব্যক্তির প্রকাশে কবিদের কবিতায় চেতনার অ রে একুশের বিস্ময়বোধ ও ভাষার অন্ত; নিহিত অভিব্যক্তি কবিদের কবিতায় প্রকাশ পায় নিজস্ব নতুন চেতনার সৃষ্টিতে । এ চেতনােেক আপন অস্তিত্বে ধারণ করে পরম শ্রদ্ধায় একুশের ভাষার শিল্পরুপের বিস্তার ঘটে । কবিরা একুশের চেতনাকে গহীনে ধারণ করে নিজের সৌন্দর্য্য কে ধারণ করেন কবিতায়

একুশ এলে শুধু মনে পড়ে আমার দু:খিনি বর্ণমালা

মায়ের পুরনো কাপড়ের আঁচলের সোঁদা গন্ধ তুমি

ঈলাশ শিমুল দেখে ভিজে যায় চোখ

বেড়ে যায় শোক বুকে জ্বলে আগুন

ফিরে ফিরে আসে আমার একুশ, আমার সেই দু:খের আগুন’।

(একুশের কথামালাপৃষ্টা৩৬)

ইতিহাসের নিহিত বাস্তবতা ও প্রতিবাদের উচ্চারণে শব্দমালা কবির লেখায় অনিবার্য হয়ে উঠে প্রতিবাদের প্র্‌ছন্ন প্রকাশশৈলি কবির কবিতায় মানবিক বোধর প্রতিফলন ঘটায়। কবিরা সময়ের সারথি, সময়কে ধারণ করে নিজের শেকড় সন্ধ্যানে কবি সবসময় অন্বেষায় ছুটে বেড়ান। স্বপ্ন ও কল্পনায় ভাবনার প্রকাশে কবির সৃষ্টিশীলতার রুপ ফুটে উঠে। কবি উচ্চারণ করেন সময়ের ঝাঝালো শব্দাবলী। জীবন, যৌবনের সময়ের প্রাণবন্ত সময়কে নিজে চৈতন্য প্রবাহে প্রকাশ করে কবি নির্মল পরিতৃপ্ত ও লালন করেন নিজের মধ্যে। কবিদের মৃত্যু নেই , তারা জীবনব্যাপী ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকেন । আফ্রিকার কণ্ঠস্বর বেনজামিন মলোয়েস এর মতো কবিরা ফাঁসির কাষ্টে জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। জাতিস্বত্বার জন্য সেই কবিদের মৃত্যু কবিকে প্রভাবিত করে, ব্যাথিত করে , কবি তা ভিন্নতায় প্রকাশ করেন কবিতার উচ্চারণে।

আসলে কবিরা মরে না

কবির মায়া চোখে গোবরে পোকা হয়ে উঠে সুদর্শনা

নারীরা হয়ে উঠে অমরাবতী

তাদের মথিত চুম্বন দেখবে বলে

কবি মরেও বেঁচে থাকে অনন্তকাল’।

(কবির জন্য এলিজিপৃষ্টা২৬)

কবি শাহীন মাহমুদ নব্বই দশকের উন্মাতাল সেই সময়ের কবি। সেই দেশ চেতনা, অশুভ শক্তির থাবার মধ্যে দেশের পরিস্থিতিতে অসস্ত্র ও বারুদের গন্ধমাখো সময়ে কবিতাকে ধারণ করেছেন। দু:সময়ের জীবনবোধ ও ঘনিষ্ঠ বাস্তবতাকে চোখে দেখা সময়ে লিখেছেন পংক্তিমালায় নিজের বেদনাবোধ ও সময় চেতনার কবিতা। শাহীন মাহমুদ বহুমাত্রিক লেখক হলেও তিনি কবিতায় নিজেকে প্রকাশ করার অন্ত:জগতের টান অনুভব করেন বলেই নিত্য কবিতার নন্দিত ভূবনে তার পথচলা। জীবনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবন ঘনিষ্ঠতায় নিজের আকঙক্ষাকে উজ্জীবিত করে প্রকাশ করেছেন সময়ের সাহসী বাস্তবতাকে। কবিতায় শব্দ , রাজনৈতিক চেতনা, আধুনিকতাবোধ, উওর চেতনাকে মননে ধারণ করে ,স্বদেশ চেতনা, ও নাগরিক সমাজের অবক্ষয়ী সময়ের চিত্র একেঁছেন । কবিতায় নতুনত্বর পরীক্ষানিরীক্ষায়। মাটি ও মানুষ ,নৈ:সঙ্গ চেতনা তার কবিতায় স্রোতবাহী ধারায় নদীর মতো ছুটে চলেছে। তিনি কবিতায় শব্দের বৈচিত্র্যতা, উপমা, চিত্রকল্পে নতুন ও ভীন্নতর জীবন ভাবনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ হৃদ্যা আমিও জেগে আছি’স্বতন্ত্র কাব্য শৈলীতে কবি ভীন্নতর জীবনবোধের উচ্চারণ করেছেন নিজস্ব চিন্তা ও চেতনায়। ফুটিয়ে তুলেছেন অন্তর্গত আধুনিকতার পটভূমিতে নতুন দৃষ্টিপাতে।

সে দৃষ্টির সীমানায় কবি এগিয়ে গেছেন তার নিজস্ব কণ্ঠস্বরে। কারণ কবি স্বপ্ন দেখার পক্ষে, অন্ধকারাচ্ছন্ন এ সমাজকে বদলানোর পক্ষে । তার কবিতার শব্দমালা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ও জীবন ও মানবিক বোধে সাহসী। তিনি সাহসী উচ্চারণে বলে উঠেন

বুকে আজও রক্তচোষা মালিকের লুটে নেয়া কষ্ট

ঐ পুঁজিবাদ আজো রক্ত চায়। ঐ জাগ্রত সাম্রাজ্য এখনো

পানির দামে কিনতে চায় মানবতা, অলৌকিক শ্রম ঘন্টা।

( হেনরির হাতুড়িপৃষ্ঠা২৫)

কবিতার এ কাব্য গ্রন্থটির ৪০টি কবিতায় কবিকে চিনে নিতে পাঠকের কষ্টসাধ্য হবে না। তিনি তার নতুন এ গ্রন্থটিতে আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে একটু সচেতন ছিলেন কবিতার নির্মাণে। একুশের বইমেলায় বলাকা প্রকাশন, ঢাকা থেকে প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য রাখা হয়েছে একশত টাকা। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

x