কাল আজ কাল

কামরুল হাসান বাদল

বৃহস্পতিবার , ১৭ মে, ২০১৮ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
16

পরশ্রীকাতরতা, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড

১। বাঙালির পরশ্রীকাতরতা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়, অনেক গল্প প্রচলিত আছে। আমার ধারণা পাঠকদের শোনা আছে সেসব। আমার এই কলামেও সম্ভবত পূর্বে তার দুয়েকখানা উল্লেখ করেছি। আজ কয়েকদিন থেকে সে গল্পগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো। উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না তাই আবারও লিখছি।

এক যুবক বিয়ে করবে তা শুনে তার পরশ্রীকাতর প্রতিবেশী বলে বেড়ায়, বিয়ে করলে কী হবে ওরতো সন্তান হবে না। যুবকটি একদিন সন্তানের পিতা হলো, প্রতিবেশী বলল, হলে কী হবে লেখাপড়া শেখাতে পারবে না। সন্তানটি লেখাপড়া শুরু করলো, প্রতিবেশী বলল, পড়লে কী হবে, পাশতো করবে না। পাশ করার পর বলল, পাশ করলে কী হবে চাকরিতো পাবে না। চাকরিও পেয়ে গেল একদিন সন্তানটি। সে পরশ্রীকাতর প্রতিবেশীটি বলল, চাকরি পেলে কী হবে বেতনতো পাবে না।

নরক পরিদর্শনে গেছেন কিছু বিশিষ্টজন। নরকের কর্মকর্তাকর্মচারীরা তাঁদের নিয়ে নরকের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। তাঁরা দেখছেন একেকটি বিশাল নরককুন্ড। সেখানে বিশাল বিশাল ডেকচিতে পাপীদের জ্বলন্ত উনুনে সিদ্ধ করা হচ্ছে। তাঁরা একেকটি ডেকচির পাশে যান আর দেখেন প্রহরীরা ডেকচির চতুর্দিকে পাহারা দিচ্ছে। সেখান থেকে কেউ পালাতে চাইলে তাকে ধরে আবার ডেকচিতে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এভাবে তারা একেকটি ডেকচির কাছে যাচ্ছেন আর নরকের কর্মকর্তারা পরিচয় দিতে গিয়ে বলে দিচ্ছেন এটা এইদেশের ওটা ওইদেশের। দেখতে দেখতে পর্যবেক্ষকরা একটি ডেকচির পাশে গিয়ে দেখলেন সেখানে কোনো প্রহরী নেই। তারা খুব অবাক হলেন। জিজ্ঞাসা করলেন এটাতে কেনো প্রহরী নেই, এটা কোন দেশের? কর্মকর্তারা জানালেন, স্যার এটা বাংলাদেশের। শুনে তারা বিস্ময়ের সুরে বললেন, বাহ কী সভ্য বাঙালিরা। এবং শান্ত ও সুশৃঙ্খল। কর্মকর্তারা বললো, তা নয় স্যার। বাংলাদেশের ডেকচি আমাদের পাহারা দিতে হয় না তার কারণ স্যার ওরা নিজেরাই নিজেদের পাহারা দেয়। কেউ একজন পালাতে চাইলে অন্য বাঙালিরাই তাকে আটকে রাখে, ধরে রাখে এবং নরকে পুরে রাখে।

এক বিদেশী জানতে চাইলেন এক বাংলাদেশীর কাছে। ভাই তোমাদের জাতীয় খেলা কাবাডি কেন? বাংলাদেশী নাগরিকটি বললেন, এই খেলায় আমাদের জাতীয় চরিত্র প্রকাশ পায় তাই। যেমন এই খেলায় একপক্ষ অপরপক্ষের খেলোয়াড়কে আটকে রাখে যেন তার কোর্টে যেতে না পারে তেমনি আমরা বাঙালিরা সব সময় চেষ্টা করি অন্য কেউ যেন কোনোভাবে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারে। আমাদের জাতীয় চরিত্রের যথার্থ প্রকাশ বলে এটি আমাদের জাতীয় খেলা।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকে কেন্দ্র করে বিগত কয়েকদিন ধরে ফেসবুক, সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে তর্কবিতর্ক, সমালোচনা আর কটাক্ষ শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে এই গল্পগুলো সর্বদাই মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে শুধু। বাংলাদেশের প্রথম বাজেট যা ঘোষণা করা হয় ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ঘোষিত যে বাজেট ছিল ৭শ ৮৬ কোটি টাকার। স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্রটিকে ব্যঙ্গ করে বলা হয়েছিল ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। বলা হয়েছিল স্বাধীনতার পর দুই কোটি মানুষ না খেয়ে মরবে সে দেশ অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ করে মহাকাশে উপগ্রহ পাঠাচ্ছে তা কম গৌরবের বিষয় নয়।

শুরুতে এই স্যাটেলাইটের নামকরণ নিয়ে বেশ ট্রল করা হলো ফেসবুকে। নানা প্রকার আপত্তিকর মন্তব্যও দেখা গেলো সেখানে। বিএনপি এবং তাদের মিত্র দলগুলো শুরু থেকেই বিভিন্ন কটাক্ষমূলক বক্তব্য প্রদান করতে থাকলো। শেষমেশ উৎক্ষেপণের সময় একদিন পিছিয়ে যাওয়ায় তা নিয়েও আলোচনার ঝড় বয়ে গেল দেশে। সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর বিএনপির সেক্রেটারি জেনারেল ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করলেন এই স্যাটেলাইটের মালিকানা দু ব্যক্তির হাতে। এ বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি উঠলে তিনি তা অগ্রাহ্য করে মন্তব্য করলেন আগে দেখতে হবে এটা কাজ করে কি না। বিএনপি তার মিত্রদল এবং দেশের বামপন্থি কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন দাঁড়াল এর অর্থনৈতিক লাভালাভ নিয়ে। এদেশের কিছু মানুষ দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর চাঁদে যাওয়াকে বিশ্বাস করে কিন্তু তারা নিজ দেশের সফল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঘটনা বিশ্বাস করে না। এই অন্ধকারের মানুষগুলো নিয়ে আমার তেমন কিছুই বলার নেই। কারণ তারা চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের পদার্পণকে বিশ্বাস করে না। এরা বিজ্ঞানের সমস্ত সুফল ভোগ করে বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করে না। আমার প্রশ্ন তাদের নিয়ে যারা নিজেদের প্রগতিশীল, আধুনিক বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। যারা সরকারের একেকটি পশ্চাদমুখী পদক্ষেপে মানবজাতির সর্বনাশ দেখেন। যাঁরা মৌলবাদীদের সাথে সরকারের আঁতাত হয়েছে বলে প্রতিমুহূর্তে শেখ হাসিনার মুণ্ডুপাত করেন তারা কী করে বিএনপিজামাত মৌলবাদীদের সুরে কথা বললেন। এরা এখন সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এতটা মারমুখী যে, তা দেখে জামায়াত শিবির হিজবুত তাহরীর পর্যন্ত লজ্জায় পড়ে যায়। একটি বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ প্রতিষ্ঠায় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মতো ঘটনা যে একটু হলেও ভূমিকা পালন করতে পারে তা আমাদের প্রগতিশীল এই বন্ধুরা আওয়ামী বিরোধিতা করতে গিয়ে ভুলে গিয়েছিলেন। এই তথাকথিত শিক্ষিতরা বঙ্গবন্ধুর নামে স্যাটেলাইটের নামকরণ নিয়ে যখন ব্যঙ্গ করছিলেন তখন আমেরিকার যে স্পেস সেন্টার থেকে এর উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে তার নাম ‘কেনেডি স্পেস সেন্টার।’ এই তথাকথিত শিক্ষিতরা জানেন না আমেরিকার রাজধানীর নাম তাদের এক মহান নেতার নামে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম তাদের বীর সন্তান ও জাতীয় ব্যক্তিত্বের নামে করা হয়ে থাকে। কেনেডির নামে বিমানবন্দরটি আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর।

মূলত এ ধরনের বিরোধিতা ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা ছাড়া অন্যকিছু নয়।

২। ড. কামাল হোসেনরা যখন সক্রিয় হয়ে ওঠেন রাজনীতিতে তখন বুঝতে হবে দেশে কোনো অমঙ্গল ঘটতে যাচ্ছে। এই জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিরা দেশের জন্য মঙ্গলজনক কিছুই করতে পারেন না কিন্তু জলঘোলা করে দিতে পারেন বেশ ভালোভাবেই। বাগানের সব গাছ সমান ফল দেয় না। কিছু কিছু গাছ সামান্য সময়ের জন্য ফলবতী হয়ে পরে বন্ধ্যায় রূপ নেয়। এসব গাছে তখন আর ফল ধরে না। আমাদের প্রাত্যহিক কাজে সবসময় সবকিছু কাজে লাগে না। অকেজো কিছু ছড়ানো ছিটানো থাকে সংসারে। ড. কামাল এবং তার সাথে লেগে থাকা মান্নামনসুরবদরুদ্দোজাকাদের এখন রাজনৈতিক বর্জ্যে পরিণত হয়েছেন। তারা এখন প্রায় প্রতিদিন পরস্পরের সাথে মিলিত হচ্ছেন কিন্তু দুঃখজনক হলো ফলপ্রসূ কিছুই পয়দা হচ্ছে না। কয়েকদিন আগে ডক্টর সাহেব বলেছেন, আর বসে থাকার সময় নেই। আমরা তখন থেকে ধরে নিয়েছি তিনি এখন নড়াচড়া করবেন। তাঁর এই নড়াচড়া দেশের জন্য একটা অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো অশুভ শক্তির উত্থানের অপেক্ষায় আছেন তিনি। তাঁর সাথে যাঁরা জুটেছেন তাঁরা একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও জয়লাভ করবেন না। জয়লাভ করলেও একটি ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনাও তাঁরা করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে জনমনে ঘোরতর সন্দেহ আছে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে তাঁরা এখন সরব হয়েছেন। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য আর রিজভিফখরুলের বক্তব্য একই।

আমাদের প্রশ্ন হলো, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে হবে কাদের জন্য? যাঁরা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্বীকার করে না, ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তাঁদের জন্য? যাঁরা জাতির জনককে হত্যা করেছে যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল তাদের জন্য? যাঁরা এদেশে গণহত্যা সংঘটনে সহায়তা করেছিল তাঁদের জন্য? যাঁরা বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় তাদের জন্য? যারা গণতন্ত্রের বদলে হত্যাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের জন্য? রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসকে যারা অস্বীকার করে দেশের সংবিধানকে (যে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা হিসেবে ডক্টর সাহেবও আছেন) যারা কাটাকাটি করে কলঙ্কিত করেছে এর মানবিক দিকগুলোকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে তাদের জন্য? যারা নিজেরাই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে তাদের ক্ষমতায় আনার পথ প্রশস্ত করতে হবে? জঙ্গিবাদী, তাদের সমর্থক আর মানবতাবাদীদের জন্য একই ধরনের খেলার মাঠ? কিছু মানুষ আর কিছু পাগলা জানোয়ারের জন্য এই সমান খেলার মাঠ? কিরিচধারী আর কিরিচের কোপ খাওয়া ব্যক্তি দুজনের জন্য সমান সুবিধা, সমান মাঠ? এই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবির পেছনে ডক্টর সাহেবদের আসল উদ্দেশ্য কী তা দেশের সচেতন মানুষমাত্রই বোঝে। আসিফমান্নামনসুরদের বাগাড়ম্বর টেলিভিশনেই শোভা পাবে সমাজে খুব একটা প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি না। ড. কামাল হোসেনরা যদি সত্যি সত্যি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে চান তাহলে তা বিএনপিজামায়াতকে পুনরায় ক্ষমতায় আনার ফন্দিফিকির থেকে বাইরে এসে মানুষের জন্য করুন। সবধর্মের সব বর্ণের সব ভাষাভাষীর সমান অধিকার ও সুযোগ প্রাপ্তির জন্য করুন। নির্বাচনের আগেপরে এদেশের সংখ্যালঘুদের জীবনে যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয় তা দূর করতে করুন। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার এবং তাদের প্রাপ্য সুবিধার কথা বলুন। সংবিধান যে সকল নাগরিকদের সমান অধিকার দিয়েছে তা প্রতিষ্ঠার জন্য করুন। অন্ধকারের শক্তিকে, অপশক্তিকে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধশক্তিকে, মানবতার শত্রুদের ক্ষমতায় আনার জন্য টালবাহানা বাদ দিন। আপনি এদেশের সাধারণ মানুষদের পরীক্ষিত নেতা নন। দেশের কোনো সংকটকালে আপনাকে কখনো কাছে পায়নি দেশের মানুষ। আপনার সাথে যারা আছেন তাদের কোনো জনভিত্তি নেই। অন্যদিকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা অভিজ্ঞতা এবং গ্রহণযোগ্যতার কাছাকাছি বাংলাদেশের এখন কোনো নেতাও নেই। শেখ হাসিনা আরও ২০ বছর দেশ শাসন করলেও দেশ পেছাবে না বরং ততদিনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বেশ অগ্রগণ্য দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। যা আপনাদের পছন্দের পশ্চাদপদ, অনাধুনিক, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গি সমর্থক বিএনপি ও তার সমমনা দলগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়।

qhbadal@gmail.com

x