কিশোরদের মানস গঠনমূলক কাজে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে

মঙ্গলবার , ৮ মে, ২০১৮ at ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
36

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা দেশে একটি সমস্যা এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সেটি হলো কিশোর অপরাধ। কিশোরদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নানা অপরাধে লিপ্ত। চুরি, হত্যা, আত্মহত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই, পকেটমার, মাদক সেবন, ইভটিজিংসহ এমন সব ভয়াবহ কাজ ও অঘটন ওরা ঘটিয়ে চলছে এবং এমন লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, যা এক কথায় অকল্পনীয়। বিষয়টি সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধবিজ্ঞানী, আইনবীদ, রাজনীতিবীদ ও সুশীল সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। তাঁরা বলছেন, একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সভ্যতার এ চরম উৎকর্ষের যুগে আমাদের ভবিষ্যতের আশাভরসার স্থল কিশোরসমাজের এ ব্যাপক বিপর্যয় সত্যিই বড় দুঃখ ও দুর্ভাগ্যজনক।

গত ৬ মে দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ক্রমেই অচেনা হয়ে উঠছে আমাদের সন্তানেরা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, ‘অনাবিল আবেগ ও কল্পনায় ঠাসা কিশোর বয়স। সব যুক্তি, বাস্তবতা আবেগের কাছে হেরে যায়। প্রেমময় আবেগ যেমন উথলে ওঠে, তেমনি ক্রোধ, হিংসার মতো আবেগগুলোর প্রকাশভঙ্গি হয় অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত। একদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাথে মাদকের সহজলভ্যতায় তারা হয়ে পড়ছে একরোখা, বেপরোয়া। চির চেনা নাড়ী ছেঁড়া ধন সন্তান হয়ে পড়ছে অচেনা। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। কখনো নিজেই নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর দিকে, কখনো আবার প্রতিপক্ষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়ে বা তাকে জন্মের মত শায়েস্তা করতে গিয়ে নানা পন্থা বেছে নিচ্ছে, তৈরি করছে কিশোর গ্যাং। তাদের এ ঔদ্ধত্যকে পুঁজি করছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিছু বড় ভাই। অভিভাবকবৃন্দ চিন্তিত, কেন আমার সন্তান ক্রমশ অচেনা হয়ে উঠছে, বাড়ছে দূরত্ব। সমাজ বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাগণ সকলেই এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন যে যার মতো করে। তবে একটা বিষয়ে তারা একমত পোষণ করে বলেছেন এটি সামাজিক অবক্ষয়েরই চিত্র।’ প্রতিবেদনটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাই দায়ী। আমাদের সমাজ ও পরিবার এখন একটি অস্থির সময় পার করছে। হঠাৎ কিশোর অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে এটি অন্যতম কারণ। কর্মসংস্থানের অভাব ও নানা আর্থিক সংকটের কারণে পরিবারের উপার্জনশীল ব্যক্তি বা অভিভাবকদের ওপর অস্বাভাবিক চাপ, সর্বোপরি বিশ্বায়নের ধাক্কায় পরিবারের বন্ধন, মূল্যবোধ সব কিছু যেন ভেঙে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় পরিবারে সন্তানদের আগের মতো গাইড করা হচ্ছে না। ব্রোকেন ফ্যামিলির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে দিন দিন। এসব ফ্যামিলিতে বেড়ে ওঠা সন্তানরা পাচ্ছে না বাবামা দুজনেরই পরিচর্যা। এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সন্তানদের সামাজিকীকরণে। অসৎ সঙ্গ অনেক সময় অপরাধের পথে টেনে আনে। আবার অনেক সময় জীবিকা অর্জনের জন্য নিম্নবিত্ত পরিবারের শিশুকিশোররা জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধে। এক্ষেত্রে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় না হওয়ায় কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের আচরণ পরিবর্তনের ব্যাপারে খেয়াল রাখছেন না। আবার অনেক ক্ষেত্রে কিশোররা তাদের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক পরিবেশ পাচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে কিশোর অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়। কারণ কিশোররা অনেক সময় আর্থিক লাভ নয়, বরং সামান্য বিষয় নিয়ে রেষারেষির জের ধরে খুনোখুনিতে জড়ায়। অপরাধে সম্পৃক্ত কিশোরদের সুপথে আনতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিবারের ভূমিকা জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশসংস্কৃতি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে অনেক সময় কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ন প্রক্রিয়ায় শিশুকিশোরদের সুস্থ বিনোদনের বন্দোবস্ত করা যাচ্ছে না। একে একে হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ। ছেলেমেয়েরা এখন টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোনেই বেশি মগ্ন থাকে। তাদের সঠিক মানসিক বিকাশের পথ ক্রমেই রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ জন্য বলা হচ্ছে, শহরে খেলাধুলার স্বাভাবিক পরিবেশ না থাকা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থাও কিশোর অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে সেটা দেখা আমাদের সবার দায়িত্ব। অপরাধমূলক কাজে নয়, কিশোরদের আমরা পড়ালেখা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত দেখতে চাই। কিশোরদের মানসগঠনমূলক কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য এলাকা ভিত্তিক বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও বাড়াতে হবে।

x