কে সে মোর কেই বা জানে

কান্তা তাজরিন

মঙ্গলবার , ৮ মে, ২০১৮ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
115

লেনর্ড কোহেন, বহুদিন ধরে ভর করে আছেন মনেমগজে। তার প্রথম গান সুজান, গেয়েছিলেন জুডি কলিন্স। কে এই সুজান? গানে বলা হয়েছে আধপাগলা এক মেয়ে যে প্রকৃতি আর হৃদয়কে দিয়ে নিরুচ্চারে বলিয়ে নিতে পারে, আমি তার আজন্মের প্রেমিক।

লেনর্ডকে কে, কবে তার জন্ম কবে প্রয়াণ এসব জানা বোঝার জন্য অন্তর্জালময় নানা কথা ছড়ানো আছে। তার চলে যাওয়াটা মানিনি। কেউ এত বেশি করে অস্তিত্বের অংশ হয়ে গেলে তাকে অতীত করে দেব কি করে!

তথ্য আকারে বহুবার বলা কথার চেয়ে কেন তিনি ভর করলেন বা তিনি কি করে ভরিয়ে রাখলেন, সেটা নিয়ে বলি।

অনেককাল ধরেই ভেবেছিলাম সুজান মেয়েটা তার বউ। তারা খুব সাদামাটা জীবন যাপন করে নদীঘেঁষা এক পাহাড়ে। নানারকম ফুলের সাথে পরিচয় করায় মেয়েটা আর তাঁতে কাপড় বোনে। দূরের কোনো জলাধার থেকে জল বয়ে আনে ঘরে, ছানাপোনা আর বরকে নিয়ে একজন ক্ষ্যাপা সুখী মেয়ে। কোনো একসময় সুজানকে নিয়ে লেনর্ডই বলেছেন এসব, কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। তবে এই গানের সুজান আর সঙ্গীনি সুজান এক নন! সে যাই হোক, লেনর্ড দুই সন্তানের (এডাম আর লোরকা) জনক। তাদের মার সাথে বিয়ের গাঁটছড়া কখনো বাঁধা হয়নি। আর এই মৃদুভাবে সমাজ এড়িয়ে নিজেদের জন্যই যে একসাথে অথবা আলাদা থাকা যায় এই উদাহরণটা দিয়ে তিনি যে স্বতন্ত্র, তা বোঝালেন।

এদিকে, প্রথাগত ধর্মীয় শব্দ দিয়ে গান বেঁধেছেন, হালেলুয়া আর হিনেনি শব্দ দুটো খ্রিস্টানইহুদি প্রার্থনা সঙ্গীত থেকে নেয়া। এইসব গানেও তিনি চলেছেন তার নিজের বানানো পথে। তিনি তার গান বাঁধার নাম দিয়েছেন ‘স্যাকরেড ম্যাকানিক্স।

জন্মেছেন ইহুদি পরিবারে আর যে সময়টাতে তিনি কৈশোর পার করছিলেন তখন বামপন্থী রাডিকেল আন্দোলনের মুখ্যজনেরা ছিলেন ইহুদিঘরানার। গিটার শিখেছেন বাবার এক বন্ধুর কাছে, সেকালে স্রেফ কমিউনিস্ট আর সোশ্যালিস্টরাই গিটার বাজাতো। তখনই তিনি হয়তো তার চিন্তার গভীরতা আর ব্যাপ্তি পেয়েছেন উত্তরাধিকার সূত্রে।

এই মানুষটা ফিসফিস করে কত কত রাত ভোর করে দিয়েছেন একই গান বারবার শুনিয়ে, দিনের পর দিন একই গানঅ্যান্থ্যাম

Ring the bells,that still can ring

Forget your perfect offering

There is a crack, a crack in everything

that is how the light gets in

 

আমি বিশ্বাস করেছি। অনেক অনেক হতাশার পর, ভাঙনের পর ঠিকই আলোর দেখা মেলে। ঐ ভাঙন দিয়েই আলো আসে। আসেই।

তারপর কোনো একরাতে লেট নাইট মুভিতে শুনলাম তার ‘অ্যাম ইওর ম্যান। বলে কী লোকটা তার গানে!! এমন সাবলীল নগ্ন সুন্দর প্রেম আর কাম এক করা গান ঐ প্রথম আর এখনো অদ্বিতীয়। বলতে দ্বিধা নেই, শিউরে উঠেছিলাম এবং এখনো উঠি। এমন একজন প্রেমিক কল্পনাতেই মেলে, সে সেখানেই থাকুক। আমি কখনো কখনো নারনিয়ায় ভ্রমণ করতে যাওয়ার মত ঐ গোপন বাক্সটায় ঢুঁ দেব।

হলো তো, নিজের একটা গোপন কথা ফাঁস! সেটা খুব বেশি কিছু কি! তারচেয়েও খুব বেশি কোহেন আরো একটা গানে শ্বাসরোধ করে রেখেছেন। ২০১৪ ূণশণর ুধভঢ গানটা রেকর্ড হয়। গানটার রিদম আপনাতেই শ্রোতাকে নাচিয়ে দেবে, নিদেনপক্ষে টেবিলে টোকা দিয়ে তালে তাল মেলাতে বাধ্য করবে। সেইসাথে কেমন একটা মন উদাস করা আরবী সুরের কয়েকটা ফোঁটা। আর কি বলছেন তিনি একা দাঁড়িয়ে দৃঢ়তায়

The war was lost

The treaty signed

I was not caught

Through many tried

I live among you

বলছেন… ‘আমি পেছনে ফেলে এসেছি আমার জীবন। কতগুলো গোর খুঁড়েছি, তোমরা খুঁজেও পাবে না। সত্য মিথ্যে মিলিয়ে গল্প হবে, আমার একটা নাম ছিলথাক, বাদ দাও।

তার নাড়িনক্ষত্রের সন্ধানদাতারা বলছে তিনি বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়ে নাম পাল্টেছেন। কেউ কেউ সবকিছুতে সবকিছু মিলিয়ে ঘন্ট বানিয়ে পরিবেশন করছেন যে এই মঙ্ক হওয়ার কারণেই এই গান! সত্যিই এত গাড়ল হয়েও নামকরা কাগজের জাঁদরেল লেখক হওয়া যায়! থাক, বাদ দেইূঋগঋৗ ুঅূঊ!

গানের সুরের সাথে কথাকে গুলিয়ে না ফেলে মন দিয়ে যারা শুনতে চাইবে এই গান তাদের জন্য। সৈনিকদের অসহায় পরিণতিকে ভাগ্যের খেলা বলছে, বলছে নামের খুব গভীর মানে আছে, যা প্রেমের চেয়ে গভীর আর পরিণতির চেয়ে গভীরতর। শান্তির নিয়মে পুরুষ পদাতিক আর নারী সেনাপতি। কেমন এক ধাঁধা, এতবার শুনেছি তবু কোথায় যেন বেঁকে যায় গানটা।

যেটুকু সহজে বুঝেছি সেটা তুলে দেই আরও খানিকটা

I could not Kill

The way you kill

I tried I failed

YOU turned me in

At least you tried

you side with them

whom you dispose

This swarm of flies

This was once your mouth

this bowl of lies

You serve them well

I’m not surprised

You of their kin

you of their kind

never mind

কোহেন আমাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। কখনো গাঢ় অন্ধকারে একচিলতে আলো দেখান, আবার কখনো প্রখর দাবদাহে দেখান একফালি মেঘ। আমি কোহেনের জন্য গুণগুণাই কবি গুরুর কাছ থেকে ধার করে

কে সে মোর কেই বা জানে

কিছু তার দেখি আভা

কিছু পাই অনুমানে

কিছু তার বুঝি না বা।

x