ক্ষমা করো, বিউটি আক্তার

নীপা দেব

শনিবার , ৭ এপ্রিল, ২০১৮ at ৭:৩৮ পূর্বাহ্ণ
79

আর তারপর ১৬ বছরের মেয়েটিকে পাওয়া যায় শুকনা হাওরের সবুজ ঘাসে, ধানক্ষেতের পাশে। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। মাঝে মাঝে ভাবিণ্ড আর কতোদিন এসব চলবে? আর কতোদিন আমাদের দেশের শিশুকন্যা, নারী এইধরনের বিকারগ্রস্ত নরপশুদের দ্বারা আক্রান্ত হবে? মাঝেমাঝে ভাবিণ্ড পাকিস্তানি নরপশুরা তাদের উত্তরসুরি কি এই মাটিতে রেখে গিয়েছিল সেদিন? তা না হলে এই পশুদের রূপ বাংলার মানুষের মাঝে কেনো?

ঘটনা ১. বরিশালে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে তৃতীয় শ্রেণীর এক স্কুলশিক্ষার্থীকে। এই ঘটনায় আটক ব্যক্তি পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে ধর্ষণ ও খুনের কথা।

ঘটনা ২. চট্টগ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই ছাত্রীর বাবা। একই এলাকায় ধর্ষণের পর সেপটিক ট্যাংকে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হয় তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীকে। এই ঘটনায় আটক করা হয়েছে স্কুলের দফতরিকে।

ঘটনা ৩. টাঙ্গাইলে ৯ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে এই ঘটনায় শিক্ষক মৌলভীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গায় এক বন্ধু কাশেম আলী কয়েক দফা ধর্ষণ করেছে তার বন্ধুর মেয়েকে। পরে স্কুলছাত্রীটির গর্ভপাত ঘটানো হলে তার অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)

উপরের উদাহরণগুলো বেশ সাম্প্রতিক। এর আগে গত ২১ জানুয়ারি নগরীর আকবরশাহ থানার বিশ্বব্যাংক কলোনির ফাতেমা মঞ্জিল নামে একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি থেকে ফাতেমা আক্তার মিম নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ওঠেণ্ড গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় নয় বছরের এই মিমকে। ফাতেমা আক্তার মিম আকবর শাহ থানার ফাতেমাতুজ জোহরা হিফজুল কোরআন মহিলা মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে। প্রথমেই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ভবনের কেয়ারটেকার মনিরশুল ইসলাম মনুকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরা হল, বেলাল হোসেন বিজয় (১৮), রবিউল ইসলাম রুবেল (১৬), হাছিবুল ইসলাম লিটন (২৬), আকসান মিয়া (১৮), মো. সুজন (২০) এবং মনিরুল ইসলাম মনু (৪৯)। পাঁচজনই আদালতে ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন (সূত্র: দৈনিক আজাদী)

প্রায় একই সময়ে শুনেছিলাম, রাঙামাটির বিলাইছড়িতে এক শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করা হয়েছে, শুনেছিলাম ঝিনাইদহের দশম শ্রেণির আরেক ছাত্রী গণধর্ষনের শিকার হয়েছে। কতটা মর্মান্তিক আর জঘন্যতম কাজ সেসব প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। বলতে গেলেণ্ড পত্রিকা খুললেই প্রতিদিনের অসংখ্য খবরের মাঝে এরকম খবর সবসময়ই চোখে পডে। যেনো এটি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে পড়েছে। কারও কোনো রা নেই। প্রশাসনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চুপচাপ ভূমিকা রাখছে বা প্রভাবশালীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। আর আমরা নিরুপায় হয়ে পত্রপত্রিকার পাতায় দেখছিণ্ড করুণ সব কান্নার প্রতিবেদন।

তবে গত কয়েকদিন ধরে পত্রপত্রিকাসহ বিভিন্ন মিডিয়া ও সারা দেশের মানুষের বিবেক নাড়া দিয়েছে হবিগঞ্জের বিউটি আক্তার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের স্কুলছাত্রী বিউটিকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মূল আসামি বাবুল মিয়াকে গত ২৭ মার্চ পর্যন্তও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। খবরে প্রকাশণ্ড গত ১৭ মার্চ সকালে উপজেলার পুরাইকলা বাজার সংলগ্ন হাওরে বিউটি আক্তারের (১৫) লাশ পাওয়া যায়। উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সায়েদ আলীর মেয়ে বিউটিকে গত ২১ জানুয়ারি তুলে নিয়ে যায় একই গ্রামের মলাই মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়া। অপহরণের পর বিউটিকে আটকে রেখে ধর্ষণের পর কৌশলে বাড়িতে রেখে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ১ মার্চ সায়েদ আলী বাদী হয়ে বাবুল ও তার মা ইউপি সদস্য কলম চাঁনের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করেন। মামলাটি ৪ মার্চ শায়েস্তাগঞ্জ থানায় পাঠায় আদালত। পরে সায়েদ আলী ১৬ মার্চ বিউটিকে লাখাই উপজেলার গুনিপুর গ্রামে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ওই রাতেই সেখান থেকে নিখোঁজ হয় বিউটি। আর তারপর ১৬ বছরের মেয়েটিকে পাওয়া যায় শুকনা হাওরের সবুজ ঘাসে, ধানক্ষেতের পাশে। রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। মাঝে মাঝে ভাবিণ্ড আর কতোদিন এসব চলবে? আর কতোদিন আমাদের দেশের শিশুকন্যা, নারী এইধরনের বিকারগ্রস্ত নরপশুদের দ্বারা আক্রান্ত হবে? মাঝেমাঝে ভাবিণ্ড পাকিস্তানি নরপশুরা তাদের উত্তরসুরি কি এই মাটিতে রেখে গিয়েছিল সেদিন? তা না হলে এই পশুদের রূপ বাংলার মানুষের মাঝে কেনো?

কেনো মূল অভিযুক্ত বাবুলকে এখনো আটক করতে পারেনি পুলিশ। তাহলে কি বাবুল মিয়ারা জানেণ্ড দেশটা কেমন করে চলে? মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকিধমকি কীভাবে চালাতে হয়? অথচ বিউটির পরিবার শায়েস্তাগঞ্জ থানার পুলিশকে তো চরম বিপদে কাছেই পায়নি। তবুও বিউটি আক্তার ও তাঁর বাবামায়ের বোধ হয় বিশ্বাস ছিলণ্ড আমাদের সবার ওপর: আইনের ওপর, প্রশাসনের ওপর, গণমাধ্যমের ওপর, নাগরিক সমাজের ওপর। কিন্তু, আমরা সবাই সেই বিশ্বাস রাখতে পেরেছি কি? পরপারে থেকে বিউটি আক্তার কি আমাদের মা করতে পারবেন?

x