খাগড়াছড়ির ৮০ শতাংশ বাগানে আম্রপালির চাষ

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

বুধবার , ১৬ মে, ২০১৮ at ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ
31

আম্রপালি পাহাড়ের আমের সবচেয়ে সুমিষ্ট জাত। কয়েকদিন পরই পাহাড়ের বাজারে উঠবে আম্রপালি। দীর্ঘ পরিচর্যার পর কৃষকেরা ফল মাড়াইয়ের অপেক্ষায়। তবে গত মৌসুমের তুলনায় এবছর ফলন কম হওয়ার আশংকা করা হচ্ছে। বৈরি আবহাওয়ার কারণে কমতে পারে ফলন। তবে কম ফলনের কারণে বাড়তি দাম পাওয়ার আশাবাদী কৃষকরা। পার্বত্য এলাকায় দিন দিন বাড়ছে আম্রপালির চাষাবাদ। অতীতে পাহাড়ে এক সময় দেশী অনুন্নত মানের আমের চাষাবাদ হত। বাগান বা বাণিজ্যিকভাবে এর চাষাবাদ হত না । ব্যক্তি উদ্যোগে বসতবাড়ি বা জুমে আমের চাষাবাদ হত। অবাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত আম কেবল নিজেদের চাহিদা মেটাত । কিন্তু গত দুই দশকের আম চাষের চিত্র পাল্টে গেছে। আম্রপালি, রাংগুয়াই কিংবা মল্লিকা বাণিজ্যিক চাষাবাদ চলছে। গত শতাব্দী’র শেষ দিকে বা ১৯৯৬ সালে পাহাড়ে আম চাষের বিপ্লব ঘটতে শুরু করে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পার্বত্য এলাকায় আম চাষের বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পায়। বিশেষত পাহাড়ের ঢালে বা তলুনামূলক নিচু পাহাড়ের আমের চাষাবাদ শুরু করে। আম্রপালি বা মল্লিকা আমের কলম চারা থেকে দুই বছরে ফল দিতে শুুরু করে। তিন বা চার বছর পরে পরিপূর্ণ ফলন দিতে শুরু হয়।

২০০০ সালে পাহাড়ে শুরু হয় রাংগোয়াই আমের চাষ। মিয়ানমারের সীমান্ত পেরিয়ে বান্দরবানে শুরু হয় রাংগোয়াই জাতের চাষাবাদ। অধিকতর বড় ও রোগবালাই কম আক্রান্ত দ্রুত এ্‌ও জনপ্রিয়তা বাড়ে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রাথমিকভাবে এর চাষাবাদ হয়। পরবর্তী সম্ভাবনার কারণে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে এর চাষাবাদ বেড়েছে।

আম্রপালিকে আমের রাণী বলে অভিহিত করা হয়। এটি মূলত হাইব্রিড জাত। স্বাদ ও মানের দিক থেকে আম্রপালি অন্যন্য। খাগড়াছড়ির প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে আম্রপালির চাষাবাদ হয়।

আমের ভুবনে আম্রপালির শ্রেষ্ঠত্ব আজো অটুট। আম্রপালি অতি সুমিষ্ট এবং রসালো । আম্রপালিতে আঁশের পরিমাণও কম। আমের আঁটিও মাঝারি ধরনের। আম্রপালির গাছ খুব বড় না হলেও থোকায় থোকায় আম ধরে। ফলে ছোট গাছে অধিক ফলন পাওয়া যায়। কলম চারা রোপণের পর থেকে টানা দশ থেকে বার বছর পরিপূর্ণ ফলন পাওয়া যায়। যত্ন ও পরিচর্যা পেলে প্রায় ১৬ বছর পর্যন্ত টানা ফল দেয় আম্রপালি। তবে আম্রপালি আমের সর্বোচ্চ ওজন ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। তবে নতুন গাছের আম অনেক সময় ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম অব্দি হয় । আম্রপালি পাকার পর খোসা হলুদ হয় না। আমের ভিতওে শাসের রঙ কমলা ।

কৃষি সম্প্রসালন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্বল্প ঢালযুক্ত পাহাড়ে আম্রপালির বাগান ভালো হয়। অতি খাড়া ও উঁচু পাহাড়ে আম্রপালি কিছুটা অসুবিধাজনক এবং এতে ফলনও কম হয়। খাড়া পাহাড়ে সেচ দিতেও অসুবিধা হয়। তবে অনেকে খাড়া পাহাড়ে সিঁড়ি ধাপ বা কন্টুর পদ্ধতিতে আম বাগান করে। অতি ঘন পদ্ধতি আম্রপালি গাছ লাগানের যায়। চার বা পাঁচ বছর ফল মাড়াইয়ের পর প্রতি তিনটি গাছের মাঝখানের গাছ কেটে নেওয়া হয়।এতে দুইটি গাছের ফলন বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি গাছের মাঝে কমপক্ষে ১০ ফুটের দুরত্ব থাকে।

প্রতি বছরে দুই বার আমের বাগানের যত্ন নিতে হয়। বর্ষার আগে ও পরে আমের বাগানে সার দিতে হয়। মুকুল আসার দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সেচ দেওয়া বন্ধ থাকে।

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় পূর্ব খেদাছড়ায় জ্যোৎস্নাবাড়ি ফ্রুটস ভ্যালির বাগান সহকারী মো.শসমের মিঞা বলেন,‘ মৌসুমে শুরুতে প্রচুর মুকুল এসেছে। কিন্তু বৈরি আবহাওয়ার কারণে মুকুল ঠেকেনি। কিন্তু বর্তমানে বাগানে প্রচুর ফলন আছে। শিলা বৃষ্টি না হলে ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃষ্টি ছাড়াও ছত্রাকসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। জুনের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ ফলন পাওয়া যাবে। প্রতিকেজি আম্রপালি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হয়। প্রতিটি গাছ থেকে ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্র মতে গত মৌসুমে (২০১৭) সালে খাগড়াছড়িতে ১৪ হাজার ৬শ ৪০ মেট্রিক টন আম্রপালি উৎপাদিত হয়। ২০১৬ সালে খাগড়াছড়িতে ২৭ হাজার ৩শ ৫০ মেট্রিক টন আম্রপালি উৎপাদিত হয় ।

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো.রিয়াজুর রহমান বলেন, ‘যেসব কৃষক আম বাগানের যত্ন ও পরিচর্যা করেছেন তাদের ফলন বেশি। এবারও ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শিলা বৃষ্টি ও ছত্রাকের আক্রমণে আমের ফলন কিছুটা নষ্ট হতে পারে।

x