গণপরিবহন কি নারীর জন্য পাতা ফাঁদ?

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ৫ মে, ২০১৮ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
44

দৈনন্দিন আমার জীবনে চাল দরকার, ডাল দরকার, নুন দরকার, কাপড় চোপড় দরকার, আমার বিছানা দরকার, আমার মাথার ওপর একটা ছাদ দরকার, এসব কি মানুষ সরকারের কাছে আশা করে? না, করে না। মানুষের দৈনন্দিন চাহিদাগুলো সে নিজেই নিজের মত করে যোগাড় করে। তাহলে সরকারের কাছে প্রত্যাশা কি মানুষের, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা। আইনি সুরক্ষা। আইনের শাসন।

এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে সস্তা হচ্ছে মানুষের জীবন। প্রতিটি দিন ধর্ষণের খবর আর খুনখারাবির খবর। কত তুচ্ছ কারণে মানুষ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। এসব খারাপ খবরগুলো মানুষের মনে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। চেতনায় বৈকল্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এত এত উন্নয়ন, এত এত রাস্তাঘাট, এত এত উড়াল সেতু কার জন্য, কিসের জন্য? প্রতিদিন রাস্তাঘাটে এতটাই নৈরাজ্য চলছে যা সভ্য কোন দেশে ঘটতে পারে কল্পনাই করা যায় না। স্কুলকলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়ে, পোশাক কর্মী বা অন্যান্য কর্মজীবী মহিলাদের বাধ্য হয়ে গণপরিবহনে উঠতে হয়। এমন কোন দিন নেই নোংরা কদর্য হাতগুলো মেয়েদের দিকে তেড়ে আসে না। পুরুষ যাত্রী তো আছেই সাথে আছে চালক এবং তার সহকারী। সেদিন রাজধানীতে সুপ্রভাত পরিবহনের বাসে চড়ে মায়ের সঙ্গে ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী যাচ্ছিল। রামপুরায় মা আগে নেমে যায় পিছনে মেয়েকে আটকে রাখার চেষ্টা করে পরিবহন কর্মী। হাতে থাকা টিফিন বক্স দিয়ে পরিবহনকর্মীকে আঘাত করে লাফিয়ে পড়ে বাস থেকে। তার আগেও দুই ছাত্রীকে টানা হেচড়া এরপর উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে হয়রানি ও হেনস্তা করা হলো। এই যে একের পর এক ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে সরকারের কি কোন দায় নেই। এ সরকার কি শুধু উন্নয়নের সরকার? ভোট না দাও, ভাত না দাও, মান ইজ্জত নিয়ে থাকতে তো দাও অন্তত। দাও স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি। রুপা হত্যার বিচারের স্বস্তিটা হারিয়ে ফেলেছি। গণপরিবহনের নৈরাজ্য মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই সংঘবদ্ধ অপরাধ চিত্র পুরোপুরি আমাদের সামনে আসে না। লজ্জায় অনেকে মুখ খোলে না। চেপে যায়। এই চেপে যেতে যেতে এখন এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। সুখের বিষয় হচ্ছে কিছু কিছু মেয়ে সাহসী হয়ে উঠছে। তারা প্রকাশ করছে এবং প্রতিরোধ করার চেষ্টাও করছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে বলা হয়, গণপরিবহনে যাতায়াত করেন এমন ৯৪ ভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হয়।

উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী গত শনিবার তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে উঠলে চালকের সহকারী ও কন্ডাক্টর তাকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বাস চালকের সহকারী ও কন্ডাক্টরকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নেমে যায়। চলতি মাসে বাংলাদেশ লেবার টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। পরিবহন শ্রমিকরা গত মার্চ মাসেও একটি বাসে দুই নারীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। শুধু যে বাসে নারীদের হয়রানি করছে তা নয়। পথে ঘাটে, মার্কেটে কর্মস্থলেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। শিশু ও নারী হত্যা যেমন চলছে ধর্ষণও চলছে সমান তালে।

উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের ভাষাটাও ছিল খুব পরিচ্ছন্ন। তারা তুরাগের ৩৫টি বাস আটক করেছিল এবং সময় বেঁধে দিয়েছিল অপরাধীদের গ্রেফতার করার জন্য। প্রশাসন আটক করেছে। তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামি শনাক্ত করেছে ভুক্তভোগী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এখন শাস্তিটাও যেন সঠিকভাবে হয়। বিচারের প্রক্রিয়া যেন মাঝপথে থেমে না যায়। এসব দুর্বৃত্তের ভার যেন কেউ না নেয়।

আন্দোলন শব্দটা বুকের ভেতর এক ধরনের ঝড় তোলে। অনেক কিছুর অপব্যবহার করতে করতে আমরা মৌলিক কিছু শব্দকেও যেন অর্থহীন করে তুলেছি। আন্দোলন শব্দটির সাথে ন্যায্যাতা ও যৌক্তিক ব্যাপারটা একীভূত থাকে। আবার সন্ত্রাস যুক্ত হলে তার অবমূল্যায়ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এবার ছাত্রছাত্রীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেছি। অর্ধেকেরও বেশি যদি কোটা থাকে তাহলে মেধাবীদের যথার্থ মূল্যায়নের সুযোগ কমে যায়। দেশের দায়িত্ব যোগ্য ও মেধাবীদের হাতেই থাকা উচিত। সে যাই হোক, কোটা প্রথা সংস্কার নাকি বাতিল সে একমাত্র সরকার প্রধানই জানেন। আমার আজকের বিষয় কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে নয়। গণপরিবহনে প্রতিদিন নারী নিপীড়নের ঘটনা এত বেশি বেড়ে গিয়েছে সেই তুলনায় আমরা একেবারেই সোচ্চার নই। কোটা সংস্কার আন্দোলনের চেয়ে এটা নিশ্চয়ই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তরুণেরা চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। ন্যায্যতার পক্ষে সুবিচারের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে তরুণেরা সব যুগে সব কালে সোচ্চার ছিল। তাদের সহপাঠিরা যেখানে সেখানে হয়রানির শিকার হবে। তাদের মা বোনের জন্য ওঁৎ পেতে থাকবে দুর্বৃত্তরা যেখানে সেখানে এটা নিশ্চয় কাম্য নয়। এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে এসব দুর্বৃত্তপনা আরো বেড়ে যাবে।

গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী যাত্রী মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। নিপীড়িতদের অনেকেই প্রতিবাদ করে না আরো হয়রানির ভয়ে। ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক শীর্ষক’ এক গবেষণায় এসব উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীরা সবচেয়ে বেশি অনাকাঙিক্ষত স্পর্শের শিকার হন টেম্পু ও হিউম্যান হলারে। এসব যানবাহনে ৯৬ শতাংশ নারী নিপীড়নের শিকার হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ৪৬ শতাংশ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষের দ্বারা। গণপরিবহনের যৌন নিপীড়নের ঘটনা নারীদের ওপর মানসিক প্রভাব ফেলে। ৮৭ শতাংশ নারী জানিয়েছে তারা ক্রুদ্ধ কিন্তু অসহায় তাই প্রতিকার করতে পারে না। ৭৪ শতাংশ নারী জানিয়েছে তাদের ইচ্ছে করে উত্ত্যক্তকারীদের আঘাত করতে তবে ভীতি ও বিব্রতবোধ করায় তা করতে পারে না। এই নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে গণপরিবহনের নিপীড়িকদের আইনের মুখোমুখি করা ছাড়াও গণপরিবহনের অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যামেরা স্থাপন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন। দেশে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর পদচারণা বেড়েছে। তাদের প্রতিদিন স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কর্মস্থলে যেতে হয়। এছাড়া সংসারের নানা প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে যেতে হয়। তাদের বেশিরভাগের গণপরিবহনই ভরসা। এই গণপরিবহনে প্রতিনিয়ত হেনস্তা ও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে নারীরা। পুরুষ যাত্রীরা তো আছেই। পাশাপাশি চালক ও সহকারীরা এই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। গাড়িতে চালক ও সহকারী নিয়োগটিও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। তাদের নিয়োগ পত্রে বিভিন্ন শর্তের কথা উল্লেখ থাকতে হবে। তাদের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিয়েই তাদের নিয়োগ দিতে হবে। আমরা আশা করব সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। এই নৈরাজ্যকর অবস্থা থেকে মানুষ মুক্তি চায়। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।

x