গাজা রক্তাক্ত, নিহত ৫২

জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধন, ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভে ইসরায়েলি সেনার গুলি, আহত ২২০০

মঙ্গলবার , ১৫ মে, ২০১৮ at ৫:২৫ পূর্বাহ্ণ
77

ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে আবার রক্তাক্ত হল গাজা উপত্যকা। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে গতকাল গাজা সীমান্তে হাজার হাজার মানুষের বিক্ষোভে ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালালে অন্তত ৫২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়। আহত হয়েছে আরও ২,২০০ জন। নিহতদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর এবং হুইলচেয়ারে চলাফেরা করা এক ব্যক্তিও রয়েছেন। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর একদিনে এত সংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত হননি। ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আহতদের মধ্যে ৭৪ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আহতদের মধ্যে ২৩ জন নারী এবং আটজন সাংবাদিক রয়েছেন। ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ আন্দোলনের অংশ হিসাবে গাজার শাসনক্ষমতায় থাকা হামাসের নেতৃত্বে গত ৩০ মার্চ থেকে ফিলিস্তিনিরা গাজা সীমান্তে বিক্ষোভ শুরু করে। নিজ ভূমিতে ফেরত যাওয়ার অধিকারের দাবিতে গত ছয় সপ্তাহ ধরা চলা সেই বিক্ষোভেও এর আগে ৮৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্ব উদ্বেগ প্রকাশ করলেও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকেই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

জেরুজালেমে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খোলার পদক্ষেপে ফিলিস্তিনিরা ক্ষুব্ধ। তারা একে পুরো নগরীর ওপর ইসরায়েলের শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট সমর্থন হিসাবেই দেখছে। যে জেরুজালেমের পূর্বাঞ্চলকে ফিলিস্তিনিরা তাদের ভবিষ্যত রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের সময় জেরুজালেম দখল করে ইসরায়েল। ১৯৯৩ সালের ইসরায়েলফিলিস্তিন শান্তিচুক্তি অনুযায়ী, জেরুজালেমে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মেনে নিয়েছে, জেরুজালেম শহরের মর্যাদা, মালিকানা নির্ধারিত হবে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির অংশ হিসাবে। জাতিসংঘের প্রস্তাবেও তা লিখিত আকারে রয়েছে। ফলে এখন পর্যন্ত সব বিদেশি দূতাবাস তেল আবিবে, যদিও জেরুজালেমে অনেকে দেশের কনস্যুলেট রয়েছে। কিন্তু অন্যদের উপেক্ষা করে এতদিনের সেই নীতি গতকাল ভাঙলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একাই তিনি তার দেশের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর করলেন। স্বভাবতই ইসরায়েল এতে সন্তুষ্ট, কিন্তু ফিলিস্তিনিরা সহ পুরো আরব বিশ্বের নেতারাই সাবধান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াাকেই নস্যাৎ করবে।

প্রসঙ্গত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর ডিসেম্বরে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ থাকার কয়েক দশক ধরে অনুসৃত মার্কিন নীতি থেকে সরে আসে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প সে সময় ঘোষণা করেছিলেন আমেরিকার দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নিয়ে আসা হবে। পাঁচ মাসের মাথায় গতকাল সোমবার সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। মার্কিন প্রতিনিধি এবং ইসরায়েলি নেতাদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দূতাবাস উদ্বোধন করা হয়েছে। উদ্বোধনী ঘোষণায় ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড ফ্রেইডম্যান বলেন, ‘আজ আমরা ইসরায়েলের জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খুলছি।’ ওদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বক্তব্য রেখেছেন একটি ভিডিও লিংকের মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল একটি সার্বভৌম জাতি। তাদের নিজেদের রাজধানী নির্ধারণের অধিকার আছে। কিন্তু বহুদিন ধরে আমরা এই সুষ্পষ্ট বিষয়টিকে স্বীকৃতি দিতে পারিনি।’

দূতাবাস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জারেড কুশনার। তারা দুজনই হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা। কুশনারইভাঙ্কা দম্পতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্টিফেন মিউচিন ও উপপরাষ্ট্রমন্ত্রী জন সুলিভানও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

খবরে বলা হয়েছে, জেরুজালেমে বর্তমানে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের ভেতরই ছোট আকারে দূতাবাসের কাজ শুরু হচ্ছে। পরে ইসরায়েলের তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস পুরোপুরি উঠে গেলে তখন বড় একটি জায়গা খুঁজে নিয়ে সেখানে দূতাবাস ভবন করা হবে। ইসরায়েল রাষ্ট্রের ৭০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের দিনটিতেই মার্কিন দূতাবাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হল।

গতকাল এ দূতাবাস উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভের জন্য জমায়েত হন হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। ওই বিক্ষোভেই নির্বিচার হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক আলী বলেন, আজকের দিনটি অনেক বড়। কেননা দখলদারি ঠেকাতে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই ইসরায়েল ও বিশ্বকে বলব, আমরা চিরতরে নিঃশেষ হয়ে যাব, তবুও দখলদারি মেনে নেব না।

সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর নির্বিচার গুলি, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও সহিংস পদক্ষেপ অনতিবিলম্বে বন্ধে তেলআবিবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার জেইদ রাদ আল হুসেইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে দেয়া এক বার্তায় ফিলিস্তিন সীমান্তে এ সহিংসতা বন্ধে অনতিবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে তেলআবিবের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জেইদ রাদ আল হুসেইন। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানান জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা। খবর বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।

x