চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে মৃত্যুচিন্তা

ইকবাল হায়দার

শুক্রবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ
107

দুটি প্রধান উপাদান মূক ও নিথর পাহাড়, প্রচণ্ড উত্তাল সমুদ্র চট্টগ্রামকে দিয়েছে বিশেষ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য। সবুজ লতা পাতায় জড়ানো, নম্র রমণীর মত সোহাগী এক জনপদ, মানুষ প্রকৃতি আর জীবন, রূপবতী, অপার সৌন্দর্য্যে বিকশিত অসীম কলায় কলাবতী, নির্জন পাহাড়ী শোভায় উজ্জ্বল বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি, সুফি দরবেশের আস্তানা এই চট্টগ্রাম। মাঝি, সাম্পান, জোয়ার ভাটা, ঢেউ, স্রোতের, এক অপরূপ মোহময়ী আকর্ষণ। উদার, মহৎ, সাহসী, সরল, আন্তরিক, কূটকৌশলবিহীন কল্পনাপ্রবণ ও ঐকান্তিক এখানকার মানুষ।
১৯৪০ সালে কলকাতার হাবিবুল্লাহ বাহার সৈয়দ আলী আহসানের কাছে চট্টগ্রামের উচ্চ্বসিত প্রশংসা করলেন এভাবে যে, “পাহাড় উপত্যকা এবং সমুদ্র নিয়ে যে অঞ্চল শোভমান তার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের তুলনা চলে না। সে এক কথায় অতুলনীয়”।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী কর্ণফুলী, শহর চট্টগ্রাম, তার চেয়ে সুন্দর তার আঞ্চলিক ভাষা আর গান। লোকসঙ্গীত যেমন লোক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তেমনি এই সঙ্গীত সেভাবে সুপ্রাচীনকাল থেকে এই দেশের গ্রামাঞ্চলের আকাশ বাতাসকে মুখরিত করে রেখেছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান তেমনি বাংলার লোকসঙ্গীতকে করেছে অপার সমৃদ্ধ। দেশের বাইরেও এ গান প্রভূত জনপ্রিয়। আমাদের লোকসঙ্গীত বহু বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ এবং এই বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রত্যেকটি নানা সাংস্কৃতিক উৎসের বিচিত্র রসধারায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিপুষ্ট। এর মাধ্যমে আমাদের লোকজন ধারা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, আকর্ষ আদর্শ, ধর্ম কর্ম, রীতি নীতি, ছায়াছবি প্রভৃতি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
চট্টগ্রামের সৌন্দর্য আরো বিপুলভাবে ধরা পড়ে তার আঞ্চলিক গানে। যেমন:
ছোট ছোট ঢেউ তুলি, বাহার মারি সাম্পান যার, অ ভাই আরা চাঁটগাইয়া নওজোয়ান, চাঁটগাইয়া নওজোয়ান আরা, রচনা- মলয় ঘোষ দস্তিদার। গুরাবউ বউরে সন্ধাকালে চেরাগ দিত গেল, চল অপুত বিলুত যাই, রচনা ও কণ্ঠ- শ্যামসুন্দর বৈঞ্চব, অরে বইন কাইলকা সোনা, ঘুমে ন ধরের শীতর লাই, মলকাবানুর দেশেরে- সংগ্রহ, অ পরাণর তালতো ভাই, যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম, বইনর বেনারশি শাড়ি গায়, বড়ই ফুলুর থামি আরেকখান গুলবাহার, ন যাইয়ুম বদ্দা যাইতাম না আই লার মিয়ের বাড়ি; কথা ও সূর- এম এন আক্তার , ওরে সাম্পান ওয়ালা তুই আমারে করলি দেওয়ানা – সংগ্রহ, পালে কি রং লাগাইলো মাঝি; কথা ও সূর- এয়াকুব আলী, অদ্দা গুড়াইয়ার বাপ, মানার বর গাছর বড়ই, কুতুবদিয়া আঁর বাড়ি পয়রি না যাইয়; কথা ও সূর- মুহসিন চৌধূরী, এবং অন্যভাবে খোদা, আত্না, নফস, আসল নকল, ভালো মন্দ, সহজ সরল কঠিন, আপন পর, এই মায়ার সংসারের রহস্য বোঝা, গুরু ভজা, মূর্শিদ চেনা, আকার নিরাকার বোঝা, সাধু মুনি দরবেশ, জগতের জ্যোতি চেনার সাথে কিছুটা কৌতুক বা সমাজ বিদ্রুপাত্তক গান বিদ্যমান।
সবুজে শ্যামলে, ফুলে ও ফসলে, রূপে অপরূপে, বাংলা যেমন তেমনি চট্টগ্রামকে নিয়ে যারা সঙ্গীত রচনা করছেন তাদের মূল বিষয় ছিল চট্টগ্রামের প্রকৃতি, নদী, কর্ণফুলী, হালদা, শংক, সাগর, বন্দর, সবুজ পাহাড়, মাঠ, সাম্পান মাঝি, রাখাল, নদী পাড়ের মানুষের জীবন, জেলে, চাষী, কৃষক, মজুর, ধান শস্য, জোয়ার ভাটা, বৃষ্টি জমি, মানুষের সুখ, দুঃখ, সংগ্রাম, বিয়ে, প্রেম, বিচ্ছেদ, পীর আউলিয়া, তাদের কেরামতি, দরগাহ, মাজার ইত্যাদি।
এর মধ্যে আমরা বিষয়ভিত্তিক পাই গাজীর গান, হালদা ফাড়া গান, হওলা, আইল্লাসার গান, পাইন্নারসার গান, পালা গান, মাইজভাণ্ডারী গান, উল্টা বাউলের গান, শীব গৌরির গান, কানুফকিরের গান, ফুলপাঠ গান, বিয়ের গান, বিচ্ছেদ ইত্যাদি। যারা এ সকল কালজয়ী গান লিখে গেছেন তাদের মধ্যে বাহরুল উলুম মাওলানা আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী, মাওলানা বজলুল করীম মন্দাকিনি, আসকর আলী পন্ডিত, মো: নাসির, মলয় ঘোষ দস্তিদার, দ্বিজেন ঘোষ, এম এন আকতার, রমেশ চন্দ্র শীল, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী, কবিয়াল এয়াকুব আলী, মহসীন চৌধূরী, লক্ষীপদ আচার্য, আবদুল গফুর হালি উল্লেখযোগ্য।
শাস্ত্র মতে সঙ্গীত কলার দুই জগত ঃ
১. আধ্যাত্মিক
২. জীবন ভিত্তিক।
চট্টগ্রামের সঙ্গীত সাধকরা এই দুই জগতকে ছন্দ, সুর ও বাণীর মধ্য দিয়ে আবিষ্কার করে গেছেন। এই আবিষ্কার করাটা সহজ কর্ম নয়। অনেক দিনের কষ্টের সাধনা দরকার। তাও আবার কোন গুরু সান্নিধ্য না পেলে এই জগতের দ্বার উন্মুক্ত করা বড়ই কঠিন। পাহাড়, নদী, সমুদ্র বেষ্টিত চট্টগ্রামের প্রেমে পড়া আউলিয়াদের মতো, সেই সব সঙ্গীত গুরুরাও রহস্যময় হয়ে রইলেন। গায়েনরা বা বায়েনরা সেই রকম এক দুর্জেয় রাজ্যের অধিকারী।
আমরা তার কিছু নিদর্শন দেখতে পাই মরমী কবি লালন সাঁইজীর গানে। তিনি গেয়ে উঠেন
“অন্তিম কালেও কি হয় না জানি
কি মায়া ঘোরে কাটাইলাম হা রে দিন মনি”
সিলেটের আর এক মরমী কবি সাধক রাঁধারমন বলেন,
“ভাইবোন বন্ধু পরিবার কে বা যায় সঙ্গে কার,
মরিলে মমতা নাই ত্বরায় করে ঘরের বার”
আবার অন্যখানে তিনি গেয়ে উঠেন “ওমন কুপথে না যাইও ঘরে
বসে হরিনাম নিরবধি লইয়ো
জলের মাঝে বানাইছো ঘর
ভাই নাই বান্ধব নাই কে লইব খবর।”
সিলেটের মরমী কবি দেওয়ান হাসান রাজা বলেন,
“ একদিন তোর হইবোরে মরণ রে হাসান রাজা
জন্মের দূত আসিয়া তোমার হাতে দিবো দড়ি
টানিয়া টানিয়া নিবে জমের বাড়ি সেই কোথায় যাবো সুন্দর স্ত্রী,
কোথায় যাবো রাম পাশা, কোথায় লক্ষণ শ্রী অন্যজায়গায় তিনি গেয়ে উঠেন,
“এ যে দেহ, ভবের বাজার কেবল এক জ্বালা
স্ত্রী পুত্র কেহ নয় তোর যাইবি একলা।”
আবার তিনি গেয়ে উঠেন, “কিসের বাড়ি কিসের ঘর রে কিসের জমিদারি
সঙ্গে সঙ্গিরা নাই তোর কেবল একলা
ঐ যে তোমার ধনজন সুন্দর সুন্দর স্ত্রী
কেহনি যাইবে সঙ্গে যমে নিতে ধরি।”
মরমী কবি বাউল লালন ফকির বলেন,
সিলেটের আরেক মরমী কবি বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম গেয়েছেন,
“মাটির পিঞ্জিরায় সোনার ময়নারে
তোমারে পুষিলাম কত আদরে।
আবদুল করিম বলে ময়না তোমারে বলি
তুমি গেলে হবে সাধের পিঞ্জিরা খালি”
শিল্পী আবদুল আলীম গেয়েছেন
“মনপাখি জান নাকি কোথায় সে ঠিকানা কোনখানে রয় মনমনুরা
আছে কে তোর জানা”
আবার তিনি অন্যখানে গেয়েছেন
মনপাখি তুই আর কতকাল থাকবি খাঁচাতে
ও তুই উড়াল দিয়া যারে পাখি বেলা থাকিতে”।
“মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান” – গেয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর তারও আগে ইংরেজ কবি জন ডান লিখিছিলেন, মৃত্যু যেন সেই দূত যে কড়া নেড়ে যায়, আজ অথবা কাল প্রত্যেক জীবিতদের দুয়ারে। মৃত্যু তথা প্রকৃতির বিভিন্ন উপকরণের নশ্বরত্ন যুগে যুগে কবিদের লেখনীর বিষয়বস্তু হয়েছে।
যন্ত্রযুগের নিষ্পেষণে, যান্ত্রিক পীড়নে, মরণাস্ত্রের তান্ডব, জীবন ও জগতের কাছ থেকে প্রণয় ও প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবক্ষয়, হতাশা, শূন্যতা, অচরিতার্থতা, যেমন টি এস ইলিয়টের কবিতায় কাব্যে প্রভূত প্রভাব ফেলে জীবনকে অনুজ্জ্বল সজীবতাহীন করে দেয় তেমনি জীবানানন্দ দাশের কবিতা মৃত্যুর গভীরতার দ্যোতনা সৃষ্টিকারী এক বোধের জন্ম দেয়।
‘রূপসী বাংলা’ পর্বে কবি তার কবিতাবলীতে পৌনঃপনিকভাবে অনিবার্য, অবশ্যম্ভাবী, মৃত্যু সম্পর্কীয় ভাবনার বিমূর্ত রূপ দিয়েছে। “যেদিন সরিয়া যাব”, “ঘুমায়ে পড়িব আমি”, “যখন মৃত্যুর ঘুমে”, যদি আমি মরে যাই”, “ যে শালিক মরে যায়”, কোথাও চলিয়া যাব”, “ আজ তারা কই সব”, “কোনো দিন দেখিব না”- প্রভৃতি কবিতার শিরোনাম শুদ্ধ কবির মৃত্যু চেতনার স্পষ্ট পরিচায়ক। এই মৃত্যু তার জন্য যুগপৎ বেদনা ও শান্তির বারতাবাহী। এ জগতের সবকিছুর নশ্বরত্বে তিনি যেমন ব্যথিত তেমনি অপরদিকে তিনি এই শ্যামল স্নিগ্ধ মাটির ক্রোড়ে ঘুমায়ে থাকবেন।
তাই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী অমর শিল্পী শেফালী ঘোষ, কল্যাণী ঘোষ, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, কল্পনা লালা, বুলবুল আক্তার, টুনু কাওয়াল, আবু কাওয়াল, মোহাম্মদ নাসির, এম.এন আকতার ইত্যাদির কণ্ঠে গীত হয়ে যে গানের সুর ভেঙ্গে দেয় ঘুম, থেমে যায় পাখির কুজন, বহমান নদী, বাতাস, নিশি জ্যোৎস্নার নি:শব্দতা, নিশ্চুপ হয় জনহীন পথ, যে গানের মোহময় মায়াময় ধ্বনি শুনে হতভাগ কারো চোখ জলময় হয়ে ওঠে, কণ্ঠ ফুটে বেরিয়ে আসে বেদনাহত হায়! হায়! মর্মরধ্বনি। সেই সুরে কি বিরহ ! কি কান্না ! কি বেদনা ! সে আর কিছু নয় মৃত্যু পরবর্তী জীবনের বেদনামায় আর্তি ও সুরের করুণ কান্না। এই শরীর থেকে যখন প্রাণ বেরিয়ে যায় সে কি আর ফিরে আসে ? মৃত্যুপরীর নিথর, অনড়, নির্জীব দেহের ’স্থান হয় অন্ধকার মাটির ঘরে। কি নির্মম সে ঘর যার না থাকে দরজা, না থাকে জানালা, না আলো, না বাতাস, না সঙ্গী, না শ্বাস, একাকী নিঃসঙ্গ কবরে দিনে দিনে গলে পচে একাকার হয় মাটির সাথে মাটির দেহ!
দেহ মন, কায়া প্রাণ, সহবাস, একের সঙ্গে অপরের আলাপচারিতা, বসবাস এর বিচ্যুতি, বিভেদ, না ফেরার দেশে যাওয়া এই যে মহা বিপর্যয় তা একমাত্র মৃত্যুই ঘটায়। তার যে বেদনা, তার যে বিলাপ, বিশ্বচরাচরের এই যে চলে যাওয়ার চিরাচরিত নিয়ম, আপনকে পর, দেহ থেকে প্রাণের বিয়োগ, প্রাণ শাশ্বত, দেহ নশ্বর এর যে মর্মবেদনা তা উপলব্ধি করে আমাদের চট্টগ্রামের মহান লেখক, কবি, গায়েনরা বিষয়টি গান এবং সুরে তুলে এনেছেন তা কবি জন ডান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, টি এস এলিয়ট, জীবনানন্দ দাশ, লালন সাঁইজী, দেওয়ান হাসান রাজা, শাহ আব্দুল করিম এমনকি আরো মহৎ ব্যক্তি চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আমাদের শ্রুত, অভিজ্ঞতায় প্রাপ্ত, জানা তথ্যে আশ্চর্য অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি চট্টগ্রামের কিছু আঞ্চলিক গানে মৃত্যু চিন্তার অনিন্দ্য সুন্দর বর্ণনা, বাক্যে, সুরে, কথার, প্রাণময়ী ব্যঞ্জনায় বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে, যেমন :
১. ডালেতে লরি চরি বইয় চাতকি ময়নারে কথা ও সুর – আশকর আলী পন্ডিত (১৮৫৫-১৮৯২)।
লেখকের বিনয় হচ্ছে প্রাণ রূপ ময়না পাখি যেন এই দেহ ছেড়ে না যায়। এই দেহের ছয়টি ডাল, আট কুটুরি, নয় দরজা, তিন তলা ঘর যেখানে ইচ্ছা সে থাক। প্রাণ গেলে এই দেহের কোনো দাম থাকবে না। পাখির যেভাবে সুখ সেভাবে যেন থাকে, মিনতি এই দেহ ছেড়ে যেন না যায়।
২. কি জ্বালা দি গেলি মোরে কথা ও সুর – আশকর আলী পন্ডিত।
এটি হচ্ছে মৃত দেহের কান্না, বিচ্ছেদ জ্বালা। অন্ধকার ঘরে একাকী অনন্ত ঘুমে এ যেন বিদেশ বিভূঁইয়ে একাকীত্ব। এ যন্ত্রণা সহ্য হবার নয়। যে ছিল নয়নের কাজলের মতো অসম্ভব সুন্দর যার সাথে ছিলো দিবস নিশি মেলামেশা এখন সে প্রাণ দেহ ছেড়ে চলে গেলে সে দেহ যে উদাসী হবে।
৩. সূর্য উড়ে ওভাই লাল মারি কথা ও সুর – অচিন্ত কুমার চক্রবর্তী (১৯২৬-১৯৯৪)
পৃথিবীর সবকিছু তার নিয়ম মত চলছে, লাল আভা ছড়িয়ে সূর্য উঠে, অস্ত যাচ্ছে সন্ধ্যায়, বাতাস, নদী বহমান ঠিক আগের মতো, রাতের পর দিন আসছে, ফুল ফুটছে, পাখি ডাকছে, দিন – মাস – বছর গিয়ে যুগ ফিরে আসছে। প্রকৃতি তার নিয়মে আবর্তিত হচ্ছে কিন্তু সেই রসিক বন্ধু, প্রাণ পাখি, এই দেহকে চিরতরে স্তব্ধ করে প্রকৃতির চিরাচরিত নিয়মে চলে যায়। এ বেদনা, এ বিরহ সহ্য করার নয়।
৪. যাইবার কালে মাতাইয়া না গেলারে ও নিমাইয়া বন্ধুরে কথা ও সুর – মোঃ নাসির (১৯০২-১৯৭৯)।
এ যে দেহ মনের বসবাস, দুজনের মাখামাখি খাওয়া দাওয়া, নিদ্রা জাগরণ, সেখানে মরণ এসে দেহ মনকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, ঘটায় চরম বিপর্যয়। এমন রঙ্গের বন্ধু যাওয়ার কালে একটু জানায় না। একাকী এ দেহকে রেখে অচীন দেশে পাড়ি দেয়, এমন মায়াহীন বন্ধু আমার।
৫. আঁধার ঘরত রাইত কাড়াইয়ম কারে লই কথা ও সুর – রমেশ চন্দ্র শীল (১৮৭৭-১৯৬৭)।
তাই রমেশ শীল মৃত্যুর নির্মমতা চিন্তা করে, কবরের একাকীত্বের অভাবনীয় দুঃসহ যন্ত্রণা উপলব্ধি করে, এ যন্ত্রণায় ভাগী হওয়ার কেউ নেই। এক সময় দেহ খেলে প্রাণ খেত, একসাথে চলন বলন, শয়ন নিদ্রা, কিন্তু সে আঁধার ঘরে প্রাণহীন দেহ কাকে নিয়ে বসবাস করব তারই সুরে সুরে কান্না ও আকুতি।
৬. মন পাখিরে বুঝাইলে সে বুঝে না কথা ও সুর – মো: নাসির (১৯০২-১৯৭৯)।
এখানে লেখক গায়ক সুরে সুরে প্রাণ পাখিকে দেহ ছেড়ে না যাওয়ার জন্য আকুতি করছে। সে নানা রঙ্গে নানা ভঙ্গিতে ব্যক্ত করে তাকে ছেড়ে না যাওয়ার মিনতি করছে। ও মন যা ইচ্ছে রঙ্গ কর কিন্তু এই দেহকে ছেড়ে যেওনা।
৭. দেহ ছাড়ি প্রাণ গেলেরে আর কোন দিন ফিরে আইসত নয়, কথা ও সুর – আব্দুল গফুর হালী
(৬ আগস্ট ১৯২৮ – ২১শে মে ২০১৬)
গফুর হালী তাই বলছে, এই দেহ ছেড়ে প্রাণ গেলে তার ফিরে আসার আর কোনো নিয়ম নাই। সুতরাং প্রাণ থাকতে, সময় থাকতে যত পুন্য কাজ, যত ভালো কাজ, যত মানব কল্যাণ, মানুষের মন জয় করা, আল্লাহকে চেনা, সালাত কায়েম করা সহ সৎভাবে জীবন যাপন কর। কারণ প্রাণ গেলে এ দেহের কোনো মূল্য নেই।
৮. “ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া” বা না বলে না কয়ে নীরবে চলে গেল – ঐ।
এখানেও বলছেন, কখন যে মৃত্যুর যমদূত এসে এ প্রাণকে হরণ করে নিয়ে যাবে তা কেউ জানে না। তবুও অবুঝ মন বলছে “ন মাতাই ন বোলাই গেলিরে বন্ধুয়া”।
৯. আশেক বন্ধু আমার নাই ঘরে – ঐ।
এখানেও একজন মৃতের আকুতি সেই প্রাণ পাখি, দেহের নিত্য সঙ্গী, মন মনুরা পাখি, সে এখন কাছে নাই, তাকে ছেড়ে অনেক আগে মৃত্যুর সঙ্গী হয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে, এখন কি উপায়। এখন কোথায় প্রেম, কোথায় ভালোবাসা, কোথায় বসবাস, কোথায় চলন বলন, দেহে প্রাণে কোলাকুলি।
১০. সুন্দর একখান ঘর এড়ের ভিতর পরাণ পাখি থাকে জীবনভর – সংগ্রহ।
দেহঘর বড়ই সুন্দর করে গড়েছেন কারিগর। সে ঘরে চলন বলন, শয়ন এবং নিত্য সাহচর্যের জন্য দিয়েছেন প্রাণ পাখি, প্রাণ বন্ধু, প্রাণ ময়না । কিন্তু সে ছেড়ে গেলে আবার প্রাণহীন দেহ পড়ে থাকবে নিথর হয়ে কত যে বেদনা, সে কি দুঃখময়, ক্লেশময়, বিষাদময়, নির্মম সে।
১১. আইচ্ছা পাগল মন রে দিন গেলেগই ঘাড়ৎ বই বই কাঁদবি – আমানুল্লাহ আমান।
ঠিক কক্সবাজারের আমানুল্লাহ আমান সুরে সুরে গেয়ে উঠে দিন গেলে, সময় গেলে, মৃত্যু হলে এই দেহ আর ফিরে পাবে না তার হারানো দিন। যম দূত, দোযখের দারোগা, মৃত্যু দূত এসে এ দেহ থেকে প্রাণ নিয়ে গেলে স্বজনরা কাঁদতে কাঁদতে বাঁশের খাটিয়ায়, চারজনে চারকোনে ধরে নিয়ে গিয়ে কবরস্থানে শুইয়ে দেবে। সেখানে থাকবে শুয়ে একাকী। ও মন রে, তাই সৎ কর্ম করে দিন থাকতে আখের গুটাও বলছে শিল্পী, লেখক, গায়ক, আমান।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত বিচ্ছেদ, মরমী, দেহ তাত্ত্বিক, আধ্যাত্বিক গানে দেহ থেকে মনের এই যে বিচ্ছেদ, বিলাপ, এই যে বিষন্ন ভাবনা, মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবন, ইসলামে কবর আযাবের নির্মমতা, পাপী নিষ্পাপের শাস্তির পৃথকতা, কোরান হাদীস, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদিতে মৃত্যু পরবর্তী পাপপুণ্যের শাস্তির ভয়াবহতা এবং সুখ ও দুঃখের বর্ণনা হয়ত বা এ সকল মহতী লেখকদের মনে হয়ত বিশদভাবে ছাপ ফেলেছে।
লোকসঙ্গীতের ভাব গানে দার্শনিকতার শ্রেষ্ঠ অভিব্যক্তি দৃষ্ট হয়। প্রকৃত পক্ষে আধ্যাত্মিক গানে খোদা ই দেখা দিয়েছে কোন গানে অলখ সাঁই, অল স্বামী রূপী, কোন কোন গানে আল্লাহরূপে, কোন গানে অচিন পাখি, মনের মানুষ রুপে, এই অবোধ বা অদৃশ্য সত্তা যখন লোকমনে দোলা দিয়ে যায় তখন আনমনে জন্ম দেয় কতগুলো আত্মভোলা ভাব বিভোর মরমী লোকের। তারা বুক ভরা বেদনা নিয়ে বলে ফেলে আপন দেহের দুর্বোধ্য রহস্য, জন্ম মৃত্যু, বিশ্ব সৃষ্টির কৌশল, এমন কতকি। ভাবেই মরমী লোকগুলোর মনে আসা যাওয়া করে অদৃশ্য সত্ত্বার অবোধ রহস্য, এভাবেই ভাব রহস্য মরমী লেখকদের বিবাগী বানায়। উপরোক্ত আলোচনা, তথ্য, বর্ণনা থেকে এটাই প্রতিয়মান হয়, দেহ ছেড়ে প্রাণ চলে যাওয়া এই জগতে যে চিরন্তন ও শ্বাসত নিয়ম, তা যে কত বেদনাবিধুর যন্ত্রণাদায়ক, পীড়াকর, যাতনাময়, নির্মম, মর্মস্পর্শী পৃথিবীর চিরাচরিত এ নিয়ম ভাঙ্গার কারো সাধ্য নেই। আমাদের গুণী, সম্মানী, অত্যন্ত মেধাবী গীতিকার, কবি, শিল্পীদের মনে, অনুধাবনে এ বিষয়ই বিধৃত হয়েছে তাদের কালজয়ী রচনায় অমর গানে, সুরে, ছন্দে।
তথ্য ও গ্রন্থপঞ্জি :
১। শাহ আব্দুল করিম গান ও জীবন – সুমন কুমার দাশ
২। মরমী কবি হাসান রাজা গান ও জীবন – সম্পাদনা, অমলেন্দু কুমার দাশ
৩। মরমী কবি রাধা রমণের গান ও জীবন- সম্পাদনা, অমলেন্দু কুমার দাশ
৪। মৌলিক, সুচরিত চৌধুরী সংখ্যা, প্রথম প্রকাশ, বৈশাখ ১৪০১, এপ্রিল ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ২৪
৫। কালধারা, চট্টগ্রাম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৪০৪, ডিসেম্বর ১৯৯৭
৬। কালধারা, নজরুল জীবনানন্দ শত বার্ষিকী সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৪০৬, ১৯৯৯ ডিসেম্বর।
৭। জীবন সাথী, রমেশ শীলের মাইজভান্ডারী গান সমগ্র, ড. সেলিম জাহাঙ্গীর সম্পাদিত গ্রন্থের অন্তর্গত, প্রকাশ সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান, প্রথম প্রকাশ ১১/১০/২০১৬ ইং
৮। বাংলা লোকসংগীতের অমর কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীম, সম্পাদনা – আব্দুল ওয়াহাব, জহির আলিম ও মো: এনামুল হক। প্রকাশক আব্দুল আলীম ফাউন্ডেশন, প্রকাশ ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা ১২১, ১৩৮।

x