ছদাহা, কেঁওচিয়া ও মাহালিয়া বিলের বাঙ্গি

আকারে বড়, দেখতে সুন্দর ও স্বাদে অতুলনীয়

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া

সোমবার , ৯ এপ্রিল, ২০১৮ at ১:৫০ অপরাহ্ণ
19

অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টি সমৃদ্ধ মৌসুমি ফল বাঙ্গির চাষ বাড়ছে সাতকানিয়ায়। অল্প সময় ও খরচে ভাল লাভ হওয়ায় বাঙ্গি চাষের দিকে ঝুঁকছেন এলাকার কৃষকরা। অন্যান্য মৌসুমি সবজির সাথে ‘সাথী ফসল’ হিসেবে সহজে বাঙ্গির চাষ করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকদের মাঝে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমন ধান কাটার পর জমি যখন পতিত পড়ে থাকে এবং কৃষকদের হাতে কোন কাজ থাকে না ঠিক তখনই বাঙ্গির চাষ করা হচ্ছে। ফলে কৃষকরা অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি মৌসুমী কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। বাজারে পুরোদমে বাঙ্গি আসতে আরো কিছুদিন সময় লাগবে। যেসব কৃষক অধিক লাভের আশায় আগাম চাষ করেছে তারা বাঙ্গি ছিঁড়া শুরু করেছে। স্থানীয় বাজার গুলোতে এখন পাকা বাঙ্গি আসতে শুরু করেছে। আগাম হওয়ায় বাজারে বাঙ্গির চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। তবে দাম একটু চড়া। দাম বেশি হলেও বাঙ্গির সুমিষ্টি ঘ্রাণ কাছে টানছে ক্রেতাদের। বাজারে ভাল মূল্য পাওয়া বাঙ্গি চাষীরাও মহাখুশি। চাষী ও পাইকারী ক্রেতারা জানিয়েছেন, সাতকানিয়ার ছদাহা, কেঁওচিয়া ও বাজালিয়া এলাকায় উৎপাদিত বাঙ্গি আকারে বড়, দেখতে সুন্দর ও স্বাদে অনন্য হওয়ায় পুরো চট্টগ্রামের মানুষের কাছে এখানকার বাঙ্গির আলাদা কদর রয়েছে।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর সূত্রমতে, সাতকানিয়ায় প্রায় ২ শ’ কানির অধিক জমিতে বাঙ্গি চাষ হয়। বিশেষ করে ছদাহা, কেঁওচিয়া, এঁওচিয়া, বাজালিয়া, মাদার্শা ও চরতির কৃষকরা দিন দিন বাঙ্গি চাষের দিকে ঝুঁকছেন। এখানকার কৃষকদের মাঝে বাঙ্গি চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ছদাহা ইউনিয়নের উত্তর ছদাহা, কেঁওচিয়া ও বাজালিয়ার মাহালিয়া বিলজুড়ে বাঙ্গি চাষ করা হয়েছে। কিছু জমিতে শুধুমাত্র বাঙ্গি চাষ করা হয়েছে। আবার কিছু জমিতে অন্যান্য মৌসুমি ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবে বাঙ্গি চাষ করেছে। রাতে বাঙ্গি পাহারা দেয়ার জন্য খেতের মাঝ খানে তৈরি করা হয়েছে ছোট টংঘর। খেতে মাটির ওপর ছড়িয়ে রয়েছে বাঙ্গির সবুজ লতাপাতা। এসব লতাপাতার ফাঁকে ফাঁকে শোভা পাচ্ছে ছোট বড় অসংখ্য বাঙ্গি। পুরো খেত জুড়ে হলুদ রঙের পাকা, সবুজ রঙের কাঁচাকচি বাঙ্গি আর ফুলে দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য ধারণ করেছে। ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বাতাসে মিলবে পাকা বাঙ্গির সুঘ্রাণ। নারীপুরুষ ও শিশুরা খেতের পরিচর্যায় সারাদিন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। কেউ অত্যন্ত যত্ন সহকারে পাকা বাঙ্গি ছিঁড়ে শুকনো লতাপাতা অথবা পুরনো কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে খাঁচায় নিচ্ছেন। অন্য কেউ কলসিতে করে এনে খেতে পানি ঢালছেন, আবার কেউ কেউ ক্ষেতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। পরে বাঙ্গিভর্তি খাঁচা ভ্যানে তুলে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন।

ছদাহা, কেঁওচিয়া ও মাহালিয়ার বিলে উৎপাদিত বাঙ্গি বিক্রিকে কেন্দ্র করে উপজেলার দস্তিদার হাটে এখন প্রতিদিন সকালে পাইকারী বাজার বসে। সকাল সাড়ে ৭ টা থেকে শুরু হয়ে এক টানা ১১ টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা খেত থেকে ছিঁড়ে বাঙ্গির ভার কাঁধে নিয়ে এবং ভ্যান যোগে পাইকারী বাজারে আসছেন। আর পাইকারী ক্রেতারা সেখান থেকে ভার এবং ভ্যান হিসেবে বাঙ্গি কিনে স্তূপ করে রাখছেন। পরে বিভিন্ন গাড়ি যোগে অন্যান্য বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। দেখতে সুন্দর ও সাইজে বড় বাঙ্গির প্রতি ভাড় ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা, মাঝারি এবং ছোট সাইজের বাঙ্গির প্রতি ভার ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পুরোদমে বাঙ্গি ছিঁড়া শুরু হলে দাম আরো কমে যাবে বলে জানিয়েছেন ক্রেতাবিক্রেতারা।

লোহাগাড়া থেকে আসা পাইকারী ক্রেতা জানে আলম ও নুরুল কবির জানান, ছদাহা ও কেঁওচিয়া এলাকায় উৎপাদিত বাঙ্গি বেশ মজাদার। পুরো চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাটবাজারে এখানকার বাঙ্গির আলাদা সুনাম রয়েছে। এসব বাঙ্গির আকার ও রং দেখে ক্রেতারা সহজে চিনতে পারে। দাম একটু বেশি হলেও এখানে উৎপাদিত দেশীয় জাতের বাঙ্গি বেশি কিনে ক্রেতারা। আমরাও এখান থেকে (দস্তিদার হাট) বাঙ্গি কিনে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার সাপ্তাহিক হাটে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে পাইকারী হারে বিক্রি করে দিই। চাহিদা ও দামের উপর ভিত্তি করে অনেক সময় আমরা নিজেরাই খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করি।

সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ার বুচির পাড়ার বাঙ্গি চাষী নন্না মিয়া জানান, তিনি ১২ বছর ধরে বাঙ্গি চাষ করছেন। শুরুর দিকে মাত্র কয়েক শতক জমিতে বাঙ্গি চাষ করেছিলেন। কম সময়ে এবং খরচে ভাল লাভ হওয়ায় বছরের পর বছর বাঙ্গি চাষ বৃদ্ধি করেছেন। এবছর তিনি এক কানি জমিতে বাঙ্গি চাষ করেছেন। জমির খাজনা, সার ও কীটনাশকসহ ৩৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আগাম ফলন পাওয়ায় বাজারে বাঙ্গির দামও পেয়েছি ভাল। ইতিমধ্যে উৎপাদন খরচ উঠে গেছে। আরো ৩০৩৫ হাজার টাকার বাঙ্গি বিক্রি করা যাবে। তবে বাঙ্গি চাষে একটু বেশি পরিশ্রম করতে হয়। পাকা শুরু হলে দৈনিক ৩ বার বাঙ্গি ছিঁড়তে হয়। ঠিক সময়ে ছিঁড়তে না পারলে রোদ পড়ার সাথে সাথে পাকা বাঙ্গি সহজে ফেটে যায়। এছাড়া বেশি বৃষ্টি হলে বাঙ্গির মিষ্টি কমে যায় এবং শীলা বৃষ্টি হলে বাঙ্গি নষ্ট হয়ে যায়।

নন্না মিয়া আরো জানান, একই জমিতে বাঙ্গির ফাঁকে ফাঁকে বরবটি চাষ করেছি। বাঙ্গি খেতের পরিচর্যার সাথে সাথে বরবটি খেতের কাজও সেরে নিচ্ছি। বাঙ্গি বিক্রি শেষ হওয়ার অল্প কিছুদিন পর থেকে বরবটি ছিঁড়া শুরু করতে পারবো। তিনি জানান, আমন ধান কাটার পর এখানকার কিছু জমি খালি পড়ে থাকে। এসব জমিতে একই সময়ে বাঙ্গি ও বরবটি চাষ করে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। একই এলাকার কৃষক আবদুস ছবুর জানান, তিনি ১৫ গণ্ডা জমিতে বাঙ্গি চাষ করেছেন। ফলনও খুব ভাল হয়েছে। ইতিমধ্যে উৎপাদন খরচ উঠে গেছে। আরো কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকার বাঙ্গি বিক্রি করতে পারবো।

একই এলাকার নুর আহমদ, জাফর আহমদ, নাজিম উদ্দিন, ওসমান গনিসহ আরো ১০১২ জন কৃষক বাঙ্গি চাষ করেছে। তবে তাদের খেত থেকে বাঙ্গি ছিঁড়তে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। উত্তর ছদাহা এলাকার কৃষক নুরুল আলম জানান, তিনি দেড় কানি জমিতে বাঙ্গি চাষ করেছেন। তবে এখনো বাঙ্গি ছিঁড়া শুরু হয়নি। আরো সপ্তাহ খানেক পর বাঙ্গি ছিঁড়তে পারবো। তবে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন যে, অতি মাত্রায় বৃষ্টি হলে বাঙ্গির ক্ষতি হবে। নুরুল আলম আরো জানান, এখানে দুই ধরনের বাঙ্গি উৎপাদিত হয়। এক জাতের বাঙ্গির খোসা খুব পাতলা এবং ভেতরের অংশ নরম। খাওয়ার সময় বালি বালি মনে হবে। মিষ্টি তুলনা মূলক কম, তবে সুস্বাদু। অন্য জাতের বাঙ্গি ভেতরের অংশ শক্ত থাকে। খাওয়ার সময় বেশ মিষ্টি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বাঙ্গির চেয়ে এখানকার বাঙ্গি স্বাদে অতুলনীয়। ফলে বাজারে ছদাহা এলাকার বাঙ্গির আলাদা চাহিদা রয়েছে। সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শোয়েব মাহামুদ জানান, সাতকানিয়ার বেশ কিছু এলাকায় বাঙ্গি চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে ছদাহা, কেঁওচিয়া, এঁওচিয়া, মাদার্শা ও চরতির কিছু এলাকায় কৃষকরা বাঙ্গি চাষ করছেন। কেউ শুধুমাত্র বাঙ্গি চাষ করছেন আবার কোন কোন কৃষক অন্যান্য ফসলের সাথে সাথী ফসল হিসেবেও বাঙ্গির চাষ করছেন। উপজেলার কয়েকটি এলাকার মাটি বাঙ্গি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বাঙ্গি চাষে আগ্রহী কৃষকদেরকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। এখানে আরো অধিক হারে বাঙ্গি চাষ করা গেলে কৃষকরা লাভবান হবেন। বাঙ্গির আবাদ বাড়ানোর লক্ষে কাজ করছেন কৃষি বিভাগ।

x