ছাত্রছাত্রীদের ওপর শারীরিক শাস্তি বন্ধে শিক্ষাপ্রশাসনের তদারকি দরকার

বৃহস্পতিবার , ১০ মে, ২০১৮ at ৩:৩৬ পূর্বাহ্ণ
55

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রছাত্রীদের ওপর শাস্তির ব্যাপারে যে একটা নীতিমালা আছে, সেটা অনেকে জানেনই না। আর জানলেও কেউ কেউ আবার নিয়মকানুন মানতে চান না। মূর্খ, প্রজ্ঞাবান, জ্ঞানী কেউই নীতিমালা মেনে চলতে চান বলে মনে হয় না। সবাই নিজের খেয়ালখুশিমতো চলতেই ভালবাসেন। সবার ভেতরে একটা স্বৈরাচারী মনোবৃত্তি কাজ করে বলে সমাজজীবনে একটা অনিয়ম দেখা দিচ্ছে। এখানে উল্লেখের দাবি রাখে যে, সরকার বাস্তবতার নিরিখে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করাসংক্রান্ত নীতিমালা২০১১’ প্রণয়ন করে। তাতে বলা হয়, শ্রেণিকক্ষে ১১ ধরনের শারীরিক শাস্তি দেওয়া যাবে না। আর মানসিক শাস্তি হিসেবে মাবাবা, বংশ ও ধর্ম সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা যাবে না। অশোভন অঙ্গভঙ্গিসহ শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, এমন আচরণও করা যাবে না।

নীতিমালায় নিষিদ্ধ করা শারীরিক শাস্তিগুলো হলো, হাতপা বা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত বা বেত্রাঘাত, শিক্ষার্থীর দিকে চক বা ডাস্টারজাতীয় বস্তু ছুঁড়ে মারা, আছাড় দেওয়া ও চিমটি কাটা, কামড় দেওয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেওয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেনসিল চাপা দিয়ে মোচড় দেওয়া, ঘাড় ধাক্কা, কান টানা বা ওঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনো কিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো এবং ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে এমন কোনো কাজ করানো, যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ।

নীতিমালায় বলা হয়, কোনো শিক্ষকশিক্ষিকা কিংবা শিক্ষা পেশায় নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি অথবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকর্মচারী পাঠদানকালে কিংবা অন্য কোনো সময় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে উল্লিখিত আচরণ করবেন না, যা শাস্তি হিসেবে গণ্য হয়। এসব অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে, তা ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী হবে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

শিক্ষকরা হচ্ছেন সমাজের মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের যেমন নৈতিকতা শেখাবেন, শিক্ষার পাঠ দেবেন, তেমনিভাবে সুন্দর নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করবেন। তাঁদের হতে হয় আন্তরিক, দয়াপরবশ, হৃদয়বান ও মমতাস্পর্শী। তাঁরা যদি অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন কিংবা অবিচারকে আশ্রয় করে চলেন, তাহলে সামাজিক অবিচার প্রতিনিয়ত কেবলই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। শিক্ষকরা তাঁদের মেধা, শ্রম ও সেবা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন। তাঁদের কাজ হলো লেখাপড়া শিখিয়ে শিক্ষার্থীদের নির্ভীক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। যাতে ছেলেমেয়েরা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্ণধার হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘শিক্ষকদের সদয় ও স্নেহপূর্ণ ব্যবহার, শিক্ষা দেওয়ার আগ্রহ, তাঁদের আচারব্যবহার, কথাবার্তা, চালচলন শিশুর জীবনের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। নিষ্ঠাবান, কর্মঠ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন চরিত্রবান ব্যক্তিত্ব তৈরিতে শিক্ষককেও হতে হবে নিষ্ঠাবাননীতিমান ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। সময়, পরিবেশ আর পারিপার্শ্বিকতা মানুষকে বদলাতে শেখায়’।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যিই যে, আমাদের স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই কতিপয় শিক্ষকদের নির্যাতনের শিকার। এই নির্যাতনের কারণে তাদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। তাদের ভিতর তৈরি হয় স্কুল ভীতি। শাস্তির কারণে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বাইরেও শিক্ষার্থী হীনম্মন্য হয়ে গড়ে ওঠে, ফলে তারা মনোবল হারিয়ে ফেলে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিশুদের ওপর শাস্তি প্রদানের যে প্রবণতা, তা সত্যি আতঙ্ক জাগায়। এই আধুনিক যুগেও স্টিলের স্কেল দিয়ে শিশুকে শারীরিকভাবে আঘাত করার নিয়মিত ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করি। এরকম অভিযোগ অভিভাবকদের পক্ষে আমরা অহরহ পাই। এ জন্য শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পিতামাতার পর যাঁদের স্থান সেই শিক্ষকশিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে অভিভাবকরা আইনের আশ্রয় নিক, বা শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগে কোনও শিক্ষক আইন আদালতের মুখোমুখি হোক, তা কখনো কারো কাম্য হতে পারে না। তাই এ বিষয়ে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানের করণীয় অনেক। স্কুল কর্তৃপক্ষ শাস্তি বন্ধের পদক্ষেপ ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া শিক্ষা প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করলে ছাত্রছাত্রীরা তথাকথিত শিক্ষকদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারবে।

x