ছড়াগ্রন্থ : ‘তোমার যদি ইচ্ছে করে’

জসীম মেহবুব

শুক্রবার , ৪ মে, ২০১৮ at ৫:৪৬ পূর্বাহ্ণ
35

একটি সর্বজনীন, চিরকালীন সাহিত্য হচ্ছে ছড়া । ছড়াকে ভালোবেসে পরম মমতায় আগলে রাখতে হয় । আর সে জন্যেই ছড়া লিখিয়ের দায়িত্ব একটু বেশী । তাদের মনে রাখতে হবে ছড়ার ন্যাচারাল চারিত্রিক বৈশিষ্টের কথা । যা স্বাভাবিক, প্রাকৃতিক, গতিময়, ছান্দিক রূপময় নয়, তাকে ছড়া বলা চলে না । হতে পারে এলোমেলো কথামালা বা বর্ণনাশ্রয়ী কোন পদ্য । ছড়ার চলার ঢং পাঠকের মনে দাগ কাটবে । পাঠক ছন্দের তালে দুলে উঠবে । মনের কোণে সুর তুলবে, তবেই না ছড়া । ছড়ার গতিপ্রকৃতি জেনে নেয়া ছড়াকারের প্রধান দায়িত্ব।

ছড়ারা সবসময় ধরা দেয় না । হঠাৎ হঠাৎ ধরা দেয় । তখন যদি তা টুকে রাখা যায় তাহলে ভালো । তা না হলে ছড়ারা মন থেকে হারিয়ে যায় । আর খুঁজে পাওয়া যায় না । ছড়ারা খুব অভিমানি হয় । তাকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে লেখা হলে সে ছড়াকারকে টা টা বাই বাই বলে পালিয়ে যাবে । আর ধরা দেবে না । কাজেই ছড়াকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে । তবেই ধরা দেবে ছড়া । ছড়া তার সব কিছু জানান দিয়ে ছড়াকারের পাশে ঘুর ঘুর করবে । এভাবেই ছড়াকার হওয়া যায় । মোটা মোটা বই পড়ে, ছন্দের ক্লাস করে ছড়াকার হওয়া যায় না । ছড়াকার হতে অন্য কিছু লাগে ।

আজকাল ছড়ার নামে যা কিছু হচ্ছে তার সব কি ছড়া ? মোটেই তা নয়। ছড়ার দুনিয়ায় অনেকেই আসেন হেলে দুলে । কেউ কেউ ছড়াকার হতে পারেন, কেউ পারেন না ।

যাকে কেন্দ্র করে এত কথার অবতাড়না তিনি হলেন ছড়াকার সরওয়ার কামাল পাশা। তিনি মূলত নব্বই দশকের ছড়াকার । ফেব্রুয়ারি ২০১৮তে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম ছড়াগ্রন্থ “তোমার যদি ইচ্ছে করে”। গ্রন্থের মেজাজ বলে দেয় তিনি মূলতঃ সমাজ সচেতনমূলক ছড়াকার। যদিও এই গ্রন্থে শিশুপাঠ্য ছড়াও রয়েছে, তবুও বলবো তাঁর ছড়ার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সেদিকেই গড়ায় । এটি একজন লেখকের খুবই স্বাভাবিক একটি লেখকসত্ত্বা। যা কোন ক্রমেই এড়ানো সম্ভব নয় । একেক লেখকের লেখার বৈশিষ্ট এক এক রকম হবে সেটাই ধ্রুব সত্য ।

এবার সরাসরি তাঁর ছড়ার প্রসঙ্গে আসা যাক । গ্রন্থের প্রথম ছড়া “বাঘ নয়”

কানারাম চন্দ্র/সংক্ষেপে কানা/ বলে নাকি মেরেছে সে/বাঘ একখানা । গিয়ে দেখি কানা বটে/সত্যিই কানা/ মেরেছে সে বাঘ নয়/বেড়ালের ছানা।

কানারাম কানার মতই কাজ করেছে বটে । সে বাঘ ভেবে বেড়ালের ছানা মেরে বাহাদুরি করছে । এ ছড়াটি শিশুদের আনন্দ দেবে এতে দ্বিমত নেই । ছড়ার শেষে চমক আছে, যা ছড়া হিসেবে উৎড়ে যাবার মত । লেখায় ছন্দ পতন না থাকলেও তিনি যদি কানারাম চন্দ্র না বলে কানারাম পোদ্দার বা অন্য কিছু বলতেন, তাহলে ছড়াটি সাবলিল ভঙ্গিতে শতভাগ উৎড়ে যেত ।

তাঁর আর একটি ছড়া স্বপ্ন

ফুলের দেশে পাখির দেশে/ডানা মেলে পাখির বেশে/ ঘুরে বেড়াই ইচ্ছেমত/ ছোট্ট মনে ইচ্ছে যত।

রাঙিয়ে দিতে রঙ তুলিতে/পরশ দিয়ে যাই/ যা খুশি তাই চাই।

শিশুর চাওয়াপাওয়ার শেষ নেই । যা খুশি সে চাইতে পারে । এমনকি আকাশের চাঁদকেও সে চায় হাতের মুঠোয় । এমনি চাওয়াপাওয়ার কথা সহজ সরল ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক । যা শিশুদের ভালো লাগবে। ভালো লাগবে সব শ্রেণির পাঠকের।

ভূত বিষয়ক ছড়াটি এ রকম

ভূত নিয়ে তর্ক/পক্ষে বিপক্ষে/ কাল দেখা গিয়েছিল দিব্যি স্বচক্ষে । পোড়োবাড়ি গিয়েছিল/ঘুরবার লক্ষে / আমি তবে যাইনি/ চেপে রেখে মনকে।

ডর ভয় কাঁপুনিও/লাগেনি যে বক্ষে / যাক বাবা বেঁচে গেছি/রক্ষে রক্ষে।

ভূত নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে । ভূত থাক বা না থাক । ভূত নিয়ে ছড়াগল্প লেখা যায় । এতে শিশুরা মজা পায় । ভূতের গল্পে শিহরন বেশ উপভোগ্য । এ ছড়ায় ভূতের ভয় থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে । তবে ২য় স্তবকের প্রথম লাইনে “পোড়োবাড়ি গিয়েছিল” লাইনটি আরো স্পষ্ট করে সেখানে কে গিয়েছিল সেটি পরিষ্কার করলে আরো সাবলিল হত ।

এ গ্রন্থের “ছড়ার সাথে” শিরোনামে ছড়াটি সুন্দর

তাল পুকুরে ভরদুপুরে/হাসের ছানা খেলছে/ দূর আকাশে ঐ বাতাসে/চিলরা ডানা মেলছে। কাকচক্ষুর জলের ওপর/পদ্মকমল ফুটলো/ মৌমাছিরা ফুলের পানে/মধুর নেশায় ছুটলো। তালপুকুরে তালের ঘাটে/মিষ্টি মেয়ে নাইছে/ আপন মনে আপন সুরে/অচেনা গান গাইছে।

ছড়াটি এখানেই শেষ হয়ে যায়। পরের ৪ লাইন না হলেও চলে। খন্ড খন্ড চিত্র ছড়াটিকে এখানে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। যা একটি ছড়ার জন্য অপরিহার্য। এটাই ছড়ার প্রাণ। সরোয়ার কামাল পাশাকে ছড়ার এই বিশেষ দিকটিতে নজর দিতে হবে। পাঠক ধরে রাখতে হলে এ কৌশলটি ভালো করে রপ্ত করা জরুরি। তার একটি মজার ছড়া “ঠিক নাই”

ঠিক নাইরে ঠিক নাইরে মাথা/ গতরাতে চিবিয়ে খেলাম/রঙ পেন্সিল খাতা। শিউলিমালা গাঁথা/জামাটা ফুলহাতা/ জাম জামরুল আতা।

নতুন কেনা ছাতা/গাঁয়ে দেয়ার কাঁথা/ ছড়ার বইয়ের পাতা/কাছে পেলাম যা তা।

এ ছড়ায় অন্ত্যমিলের চমক আছে। এলোমেলো ভাবনার মজা আছে। যা ছড়ায় বেশ উপভোগ্য। যা পাচ্ছে তাই চিবিয়ে খাচ্ছে একজন। ছড়ায় শিশুরা মজা পাবে এ কথা সত্য। তবে শেষে “খুশির চোটে ঘুরে বেড়াই/মাথার চতুর্দিক।” এখানে অস্পষ্ট লাগছে। কার মাথার চতুর্দিক ঘুরে বেড়ায় এ বক্তব্য পরিষ্কার হওয়া দরকার। তা না ছড়ার সঙ্গতি হবে প্রশ্নবিদ্ধ।

হঠাৎ ভুলে’ একটি ছড়া

কালকে আমি মায়ের কাছে/এই করেছি পণ/ দুষ্টুমিটা করবোনা তো/আর যে সারাক্ষণ। কিন্তু আবার আজ দুপুরে/হঠাৎ করে ভুলে/ চুইংগামটা লাগিয়ে দিলাম/ছোট্ট বোনের চুলে।

শিশুরা দুষ্টুমি করার সময় উচিৎ অনুচিত নিয়ে ভাবে না। তাদের বয়সটাই এমন। সে চিত্র ফুটে উঠেছে এ ছড়ায়। এমন দুষ্টুমি সব শিশুরাই কম বেশী করে। মা বাবা বুঝিয়ে শুনিয়ে তবেই তাদের বাগে আনতে পারেন।

ভট ভট করে ছোটে/কত সাধ চড়িবার/ সাথে পুরো পরিবার। তাই নেই সুযোগটা/একটুও নড়িবার। ভয় হয় ডানে বামে/কাত হয়ে পড়িবার।

দু চাকার গাড়ি বলো/ কী বা আছে করিবার/

মোটর বাইকে পুরো পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াবার এই ছড়াটি বড়দের ছড়া। তবে মজা আছে, কৌতুক আছে, যা বেশ উপভোগ্য। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি খন্ড চিত্র এটি। ছড়াটি একটি সমাজ মনস্ক ছড়ার দৃষ্টান্ত।

সফরকারী তাঁর একটি বয়স্ক পাঠ্য ছড়া

সফরকারী সফর করে/গফরগাঁয়ে এলেন/ গফরগাঁয়ে বেগুন সেরা/ তার যে দেখা পেলেন। যাত্রা পথে বেগুন দিয়ে/ ভর্তা করে খেলেন

সঙ্গে পেলেন সঙ্গি করার/রুপকুমারী হেলেন/ দুজন মিলে আবার সফর/ স্বপ্নে ডানা মেলেন/ গফরগাঁয়ে সফর শেষে/সর্ষেবাড়ি গেলেন/

এই হচ্ছে সরওয়ার কমাল পাশার ছড়ার সার সংক্ষেপ, বিশ্লেষন। ছোট বড় মিলিয়ে ৩২ পৃষ্ঠার বইয়ে মোট ২৫ টি ছড়া রয়েছে। ছড়াগুলো শিশুতোষবুড়োতোষ মিলিয়ে করা হয়েছে। এটি না করে আলাদা আলাদা করলেও পারতেন। প্রথম বই হিসেবে ছোট খাট ত্রুটি বিচ্যুতি এড়িয়ে বলা চলে সরওয়ার ভালই করেছেন। পরবর্তী বই প্রকাশ করার সময় আরোও সতর্কহবেন এ আস্থা রাখা যায়। কেননা সরওয়ার এর লেখালেখির বয়স তিন দশক। এই তিন দশকের অর্জন কম নয়।

পেশায় চিকিৎসক হয়েও সাহিত্যকে ভালোবেসে তাকে আকড়ে ধরেছেন। এটি একটি শুভলক্ষণ। তাঁর মননশীলতা সৃজনশীলতায় পাঠকের উপশম নিশ্চিত একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। বইয়ের প্রচ্ছদ সুন্দর। অলংকরণ কিছুটা কার্টুনধর্মী হলেও মোটামোটি পাঠক মন জয় করার মতো। মূল্য ১২০ টাকা। বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

x