জলে-পাহাড়ে মায়াময় রাঙামাটি-বরকল

রফিক আহমদ খান

মঙ্গলবার , ১ মে, ২০১৮ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
41

রাঙামাটি সদর থেকে লঞ্চে করে বরকল যাওয়ার নৌপথ। কী অপরূপ লেক! নাদেখলে বোঝা যায় না। দু’পাশে পাহাড়ের পর পাহাড়। পাহাড় কোথাও উঁচু, কোথাও আরো উঁচু,খুব উঁচু। উঁচুনিচু যাই হোক, দৃষ্টিনন্দন পাহাড় ডানে বায়ে সামনে। পাহাড়ের বুক চিড়ে আঁকাবাঁকা লেক চলে গেছে দূরেবহুদূরে; যেখান থেকে কর্ণফুলীর উৎপত্তি। জলেপাহাড়ে ঘেরা এমন সুন্দর জায়গা উন্নত দেশে হলে বহু দেশের পর্যটকে ভরপুর থাকতো এলাকাটি। এখানে গড়ে উঠতো তারকা হোটেল। এখানকার ছবি ছড়িয়ে পড়তো সারাবিশ্বে। পৃথিবীর দেশে দেশে ঘরে অফিসে শোভা পেত এই লেকের ছবি। এখানে শান্ত লেকে লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে দু’হাত মেলে বুকভরে হাওয়া খেতে আমার ভাল লেগেছে; আপনারও অসীম ভালো লাগবে।

রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সাত শত ষাট বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে তিপ্পান্ন হাজার জনসংখ্যার বরকল উপজেলার কোথাও তিন চাকার গাড়ি চলে না। এখানে অধিকাংশ জনগণ চাকমা। পাশাপাশি মারমা ও কিছু বাঙালিও আছে। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বাঙালিরা মুসলিম ও হিন্দু ধর্মের।

পুরো বরকলে কোনো যানবাহন নেই। শুধু যানবাহন নয়, যানবাহন চলার মত কোনো সড়কও নেই। বরকল বাজারে একটি মাত্র সড়ক আছে। তাও কোনো গাড়ি নেই। পাহাড় থেকে পাহাড়ে পায়ে হেঁটে বা লেকে নৌকা/লঞ্চে করেই যাতায়াত ব্যবস্থা এখানে। ১২ এপ্রিল’১৮ যেদিন আমরা বরকল গিয়েছি, সেদিন বরকল থানায় কোনো মামলা হয় নি; এমনি কী কোনো মানুষ অভিযোগ নিয়েও আসে নি থানায়। কেবল সেদিন নয়, চলতি বছরেই কোনো মামলা রেকর্ড হয় নি। এখানে থানায় মাঝেমধ্যে অভিযোগ আসলেও তা বাঙালিদের; পাহাড়িদের খুব কম। বাহ! কী শান্তিপ্রিয় এখানকার মানুষ। বরকল থাকার সামনে স্যালুটিং ডাইসে বসে বসে গল্প করছিলাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রিয় মফজল ভাইয়ের সাথে। লেকের পাশেই বিশাল পাহাড়ে বরকল থানা। লেকের ওপাশে দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল পাহাড়। নাগরিক সুবিধা অপ্রতুল হলেও প্রাকৃতিকভাবে অসীম সুন্দর জায়গায় এই বরকল থানা ভবনটি।

পাহাড়ে বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব ’বিজু’ চলছে এখন। বিজু চাকমাদের বড় উৎসব। মারমা’রা একে বলে ’সাংগ্রাই’। গত কয়েকদিন ধরে চলছে বিজু। চৈত্রের শেষদিন উৎসবের প্রধান দিন। পাহাড়ে ঘরে ঘরে চলছে খাওয়াদাওয়া। বরকল থানার ওসি মফজল ভাই আমদের নিয়ে প্রথমে গেলেন বরকল উপজেলা ডাকবাংলোতে। সেখানে আমাদেরকে সাদরে আপ্যায়ন করালেন বরকল উপজেলা চেয়ারম্যান মনি চাকমা।

উপজেলা চেয়ারম্যান মনি চাকমা অত্যন্ত সহজসরল ভদ্রমহিলা। উনি নিজেই বেরুলেন আমাদের সাথে ঘুরতে। বরকল উপজেলা বিজু উদযাপন কমিটির সভাপতির ঘর সহ গণ্যমান্য চাকমাদের ঘরে ঘরে ঘুরেছি। ঘরে ঘরে নানান খাবারের সমাহার।

বিজু’র খাবার তালিকায় ছিল প্রধানত ‘পাঁচন’। সাথে সেমাই, আচার, নানান ফল, মুরগীর মাংস, গরুর মাংস দিয়ে রুটি, চটপটি, হালুয়া, পেঁপের সেমাই, রাঙামাটির মিষ্টি, ইন্ডিয়ার মিষ্টি, জিলাপি, কাস্টার্ড, বেলের শরবত, কোকাকোলা সহ আরো অনেক কিছু। উপজেলা চেয়ারম্যানের ঘরে জীবনে প্রথম বারের মত খেয়েছি বাঁধাকপি’র সেমাই। আমাদের দলের তরুণী তাসিন, তুরসা, সায়মা, আমার স্ত্রী মনি ও মফজল ভাইয়ের স্ত্রী মনি ভাবী ঘরে ঘরে আচার খেয়েছে, আর প্রতি ঘর থেকে অল্প অল্প প্যাকেট করে নিয়েছে। এখানে কোথাও সমতল নেই। পাহাড় থেকে পাহাড়ে পায়ে হেঁটে বেড়ানো। এক ঘর এপাহাড়ে হলে, আরেক ঘর অন্য পাহাড়ে। বিজুর দিনে দ্বিতীয় পর্বের বেড়ানো শুরু করেছি সন্ধ্যার পর থেকে। প্রথমেই সিঁড়ি বেয়ে গেলাম উঁচু পাহাড়ে চমৎকার এক ঘরে। এই ঘরে নিজে আন্তরিকতার সাথে আপ্যায়ন করিয়েছেন একজন তরুণী। তিনি একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার; তাঁর কর্মস্থল রাজধানী ঢাকায়। এখানে বরকল হাই স্কুল থেকে পড়ালেখা করে তিনি আজ পুলিশের এএসপি। দুর্গম পাহাড় থেকে গিয়ে ঢাকার পুলিশ কর্মকর্তা। একজন এএসপি ঘরের ভেতর থেকে অনেক আইটেমের খাবার একটার পর একটা নিজ হাতে এনে আমাদের সামনে রাখছেন, আবার প্লেটে নিয়ে হাতে তুলে দিচ্ছেন। আহা! কী আন্তরিক। উনাকে সাথে নিয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে আরো কয়েক বাড়িতে বেড়ালাম। যথারীতি এক ঘরের চেয়ে আরেক ঘর বহু উপরে। কখনও মেঠো পথে কখনও সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ি ঘরে গিয়ে মন শান্তি হয়ে যায়, তাদের চমৎকার ঘর গুলো দেখে। আর ওদের রান্না নাখেলে বুঝবেন না কত মজা। ত্রিশচল্লিশ আইটেমের সবজি দিয়ে রান্না করা ’পাঁচন’ অবশ্যই কমন আইটেম বিজুর দিনে। সাথে আরো কত খাবার! ওদের রান্না করা গরুর মাংসের কী স্বাদ তা লিখে বোঝানো যাবে না।

পরের দিন অবশেষে আমরা গেলাম রাঙামাটি পর্যটন কেন্দ্রে। শৈশব থেকে শুধু ছবিতেই দেখে এসেছি রাঙামাটি ঝুলন্ত ব্রিজ; আজ দেখে এলাম। ভাল লাগলো, হৃদয় ছুঁয়ে গেলো ঝুলন্ত ব্রিজের উপরে পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা হ্রদের স্বচ্ছ জল। দেখে মনে হয়েছে কোনো নীল সমুদ্রের মোহনা। ডানে বায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক গুলো উপদ্বীপ দেখে বারবার মনে হচ্ছে আমাদের দেশের পর্যটন এলাকা গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা হয় নি এখনও। রাঙামাটি থেকে লঞ্চে একটু সামনে এগুলেই ছোট ছোট অসংখ্য উপদ্বীপ দেখলে পৃথিবীর যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমি সেখানে একখানা কুঁড়েঘর বেঁধে থেকে যেতে চাইবে। বড় মায়াময় এই লেক। মনে রাখার মত চমৎকার কয়েকটি দিন কাটালাম বরকলরাঙামাটি ভ্রমণে।

x