জ্ঞান শক্তিই মহাশক্তির সংযোগ শক্তি

রূপক কুমার রক্ষিত

শনিবার , ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
114

বিদ্বান বা জ্ঞানীর মূল কাজ বিদ্যা অর্জন। বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমে নিজ নিজ জ্ঞান তৃষ্ণা মিঠিয়ে নিজেকে ক্রমশ: উন্নত স্তরে উন্নীত করাই জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া স্বাভাবিক। জ্ঞান মানেই আত্মশক্তির উদ্বেলন, চৈতন্য সত্বার জাগ্রত ভাব। সাধকগণ বলেন, মানুষের দেহস্থিত মূলাধারে বিরাজমান অচৈতন্য ও নির্বিকার অথচ নির্লিপ্ত ও সুপ্ত মহা চৈতন্য শক্তির নাম “কুন্ডলিনী শক্তি”। সে কুণ্ডলিনী শক্তিকে সাধনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে উর্দ্ধায়িত করার প্রকৌশলের নাম হচ্ছে অধ্যয়ন। এ অধ্যয়ন একটি তপস্যা বা সাধনা। কুন্ডলিনী শক্তি তথা জ্ঞানশক্তি সাধনা বা তপস্যায় প্রত্যেককে ব্রতী হতে হয়। তবেই অভীষ্ট অর্জন সম্ভব। জ্ঞান মানুষের আত্মসত্বাকে উদ্ভাবন করে এবং জগতের কল্যানে নিজ জ্ঞানের আধারকে সমৃদ্ধ করে। জ্ঞানীরা বাকসিদ্ধ হন এবং আলোকবর্তিকা প্রাপ্ত হন। হৃদয়ে আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠলেই অন্তরেবাহিরে, ঊর্দ্ধেঅধে: সর্বত্র সর্বক্ষণ কেবল আলো আর জ্যোতি নি:সৃত হয়। এ জ্যোতিই জ্ঞান। শাস্ত্রে শিক্ষার্থীসহ জ্ঞানপিপাসু সকলের জন্য জীবনের মূল্যবান শিক্ষা নির্দেশিত আছে যা মনের পবিত্রতা, শুচিতা ও পবিত্রতার জ্ঞান দেয়। মনের শুদ্ধতাই আসল কথা। মনের নেতিবাচকতা পরিহার করে মনকে শূভ্র অর্থাৎ পবিত্র করা না গেলে কোন কর্মে কখনও সফলকাম হওয়া সম্ভব নয়। মানুষের প্রথম কাজ হল চিত্তের শুদ্ধিতা , তা না হলে সাধনায় কোন ফল আসে না। মনের হিংস্রতা দূর করতে পারলে রিপূ সমূহ ধীরে ধীরে শুদ্ধতায় মিশে যায়। মনের কালিমা মুছে গিয়ে পবিত্রতায় পরিপূর্ণ হয়। মূল কথা রুচি ও প্রকৃতিতে অর্থাৎ অন্তরে ও বাহিরে আমাদের শুচি শুদ্ধ হওয়া বাঞ্চনীয়। অন্যথায় তপস্যা অসিদ্ধ রয়ে যাবার সম্ভাবনা শতভাগ। জ্ঞানের সাধনা তখনই সম্ভব যখন আমাদের মন কালিমামুক্ত হয়। মনকে অস্বচ্ছ রেখে স্বচ্ছতার সাধনা অবান্তর। মনের শুদ্ধতাই প্রাণের শুদ্ধতা। মূর্খতার গ্লানি বিদূরিত করা না গেলে শুদ্ধতার উন্মেষ ঘটেনা। ফলে ভক্তির অভাবে মন ও প্রাণের যোগসূত্র সৃষ্টি হয়না। তাই জীবনের শুরু থেকেই আসুরিক চেতনাসমৃদ্ধ মনের অত্যাচারী চঞ্চলতা পরিহার করে সদ্‌গুণে মনকে রঞ্জিত করে আলোকিত পথের সন্ধান করাই শ্রেয়:। শুদ্ধতা উজ্জ্বলতার প্রতীক। মনুষ্য জীবনকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করার তাগিদে যাথার্থ জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।

অশিক্ষা, মূর্খতা আর অভিশাপগ্রস্ততা জীবনে পরস্পর আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকে। মনুষ্যত্ব বির্বজিত অনৈতিকতা ও অমানবিকতা জীবনের নিত্য সঙ্গী। লোভ ও মোহাবিষ্ট মন সততা ও নিষ্ঠাকে ধারন করতে অক্ষম। অজ্ঞানতা ন্যায়নীতির অনুভূতি জাগাতে অপারগ এবং সৎ ও অসতের পার্থক্য নির্ধারন করতে অসমর্থ। অবিদ্যা মানুষকে মানবীয় গুনাবলীতে পরিপুষ্ট করতে পারে না বরং লোভে অসাধু পথে পরিচালিত করে ক্রমশ: দানবে পরিণত করে। জীবন নানা সমাজিক অন্যায়অনাচারে জর্জরিত হয়। সততা ও স্বচ্ছতা বিক্ষত হয়, মনুষ্যত্ব নিস্প্রা, জরাজীর্ণ ও ভূলুণ্ঠিত হয়। অজ্ঞানতা জীবনকে প্রকৃত অবস্থান থেকে অনেক দূরে ঠেলে দেয়। চিন্তা চেতনা অব য়ের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে প্রকৃত আর অপ্রকৃত এর মাঝে পার্থক্য বোঝার বোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যার্জনের পথে এসব বিষয় এক বিশাল অন্তরায়। জীবন গঠনের চলমান পথে জীবনে জড়িয়ে থাকা এরূপ অনাচার থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে জীবনকে সুশোভিত করতে হবে। অন্যথায় জীবনে পথচলা দুরূহ হবে। প্রতিটি মানুষের চলার পথ জ্ঞানী ও গুণী হওয়ার শপথে রচিত। জ্ঞান অপরিমেয় শক্তির অধিকারী। এ’জ্ঞান কাহাকেও বন্টন করে দেয়া যায় না, চোর চুরি করতে পারে না, দান করলে কমে না । জাগতিক সকল ধনের চেয়ে এ ধন শ্রেষ্ট। এ ধন মহাধন। এ ধনে ধনবান জ্ঞানী। জ্ঞানের সমান অধিকারী আর কিছুই নেই। তাই বলা হয়, ‘নাহি জ্ঞানেন সদৃশং পবিত্রমিহ বিদ্যতে।’ এ জ্ঞান মানুষকে নিজের পরিচয় পরিস্কার করে দেয়। নিজেকে ধারন করতে না পারলে অর্থাৎ নিজেকে চিনতে না পারলে নিজের ভাল বা খারাপ কোনটাই আত্মস্থ করা যায় না। তাই শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “আত্মানং বিদ্ধি”। অর্থাৎ আত্মাকে জান। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস জীবন দর্শনের গবেষনামূলক উপলদ্ধি থেকে বলেছেন, ূিৃঘ কঔচওঋীএ। মূল কথা হচ্ছে, নিজেকে জানতে হবে আর আত্মপ্রত্যয়ী হতে হবে অর্থাৎ নিজের উপর বিশ্বাস জাগাতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, যে নিজেকে বিশ্বাস করে না সে ঈশ্বরকেও বিশ্বাস করে না। নিজেকে জানতে বা আত্মবিশ্বাসী হতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন জ্ঞানার্জন। জ্ঞানের গভীরতা ও বিস্তৃতি সীমাবদ্ধ হলে নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হয় না, ফলে বুদ্ধিমত্তার অপর্যাপ্ততায় আত্মদর্শন সম্ভব হয়না।

অজ্ঞান আর অবিদ্যায় ভরা জীবন যাত্রা কারও আশাপ্রদ নয়, বরং ঘৃণিত। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ব্যক্তিক অস্বচ্ছতা ও অসততায় কলুষিত সমাজের এক শ্রেনীর মানুষ দানবীয় শক্তির দাপটে ব্যাভিচারী হয়ে সমাজে বৈষম্য ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ফলে সৎ লোকের জীবনযাত্রা হতাশায় আচ্ছন্ন হয়, ধৈর্য্য হারিয়ে মানুষ হিংস্র ও উশৃঙ্খল হয়ে উঠে। মানুষের সহজ সরল সুরেলা জীবনগীত বেসুরা হয়ে পড়ে। স্বচ্ছতার অভাবে সমাজে অন্যায় ও অনিয়ম প্রতিষ্ঠা হয়। মানুষ হিংসাত্মক হয়ে পাশবিকতায় উগ্র হয়ে উঠে। জীবনে জ্ঞান অর্জনের নেশায় মত্ত হয়ে পারস্পরিক প্রেমও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে পারলে জীবন অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে। সবাইকে হতে হবে প্রগতিশীল। সমাজের কুশিক্ষাকে বর্জন করে সুশিক্ষায় ব্রতী হতে হবে। জীবনের প্রতিটি বলয়ে কুসংস্কারকে যৌক্তিকতার সাথে পরিহার করে সংস্কারের সাধন করতে হবে। এ সংস্কারই মূল সত্য যা প্রানরূপে আমাদেও মাঝে অধিষ্ঠিত। এ প্রাণই সকল প্রাণের মূল. . . এ প্রাণের সাধনাই সকল সাধনার মূল। এ সাধনায় হিংসাবিদ্বেষ পরিত্যজ্য। এতে মানুষ কেবল আত্মকেন্দ্রিক ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠে। এ হিংসাবিদ্বেষ হলো আগুন, জ্বালিয়ে ভিতরের ভালোটাকেও ছাই করে দেয়। এসব থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে সমাজের স্বচ্ছতায় ব্রতী হয়ে মানুষকে সৎ ও সহনশীল হতে হবে। অসততা আর অস্বচ্ছতার কারণে সমাজে নির্ভরতার জায়গাগুলো ক্রমশ: দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। সততা, স্বচ্ছতা আর নীতি বোধকে জাগ্রত করতে হবে যাতে শুদ্ধ ও শুচিতায় পরিপূর্ণ জীবন যাপন নিশ্চিত হয়। অশিক্ষা, অবিদ্যা ও মূর্খতার বলয় পেরিয়ে আত্মপ্রত্যয় ও মানবতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জ্ঞানের পরিপূর্ণ অর্জনের মাধ্যমে অন্তরে জ্ঞান রূপ শক্তির অধিষ্ঠানের আয়োজন করতে পারলেই জীবনে সুখ ও স্বস্তি আনয়ন সম্ভব। স্মরণ রাখা দরকার, মনের কালিমা দূরীভূত না হলে সদ্‌ জ্ঞান জন্মে না বরং মানুষ বিবেকহীন হয়ে পড়ে। একজন বিবেকবর্জিত মানুষের বিবেকহীন কাজ অধর্ম যা জীবনে অমঙ্গল ডেকে আনে এবং ব্যক্তি ও সমাজকে বিপথগামী করে। অপরদিকে একজন প্রকৃত অর্থে জ্ঞানী লোক সৃষ্টিকর্তার অতি প্রিয়। তিনি সদা প্রফুল্ল ও আলোকময়। প্রাপ্তি তাকে অহংকারী করে না , অপ্রাপ্তি তাকে বিষন্ন করে না। তিনি ত্যাগে আনন্দিত হন, সেবায় তৃপ্তি অনুভব করেন। তাঁর কর্ম জ্ঞান দ্বারা পরিশ্রুত ও ভক্তি দ্বারা বিশোধিত। তারা জগতের কল্যানের অগ্রদূত। আগামীর সুস্থ ও নিরাপদ জীবন ধারা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান প্রজন্মকে সদ্‌ জ্ঞানের তপস্যায় ব্রতী হতে হবে। এ জ্ঞান শক্তিই মহাশক্তির সংযোগ শক্তি।

লেখক : সহকারী মহাব্যবস্থাপক

রূপালী ব্যাংক লিমিটেড।

x