ডা. মইনুল ইসলামের কলাম

বৃহস্পতিবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ
38

আনিসুল হকের প্রয়াণে অভূতপূর্ব নাগরিক

শোকের অভিপ্রকাশ থেকে শিক্ষণীয়

গত বৃহস্পতিবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৭ তারিখ বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ২৩ মিনিটে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র জনাব আনিসুল হক ইনতিকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহে……..রাজেউন)। গত শনিবার, ২ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে এক বিশাল জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছে। তাঁর এই অকাল মৃত্যু সারা জাতিকে শোকে মুহ্যমান করেছে, যার অভিপ্রকাশ ছিল তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সারা দেশ জুড়ে জনগণের আহাজারি, তাঁর মরদেহ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে তাঁর বনানীর বাসায় নেয়ার সময়ের টিভিতে দেখানো করুণ শোকের উচ্ছ্বাস, আর্মি স্টেডিয়ামের জানাজার আগের বিশাল সারিবদ্ধ সমাবেশ এবং সর্বোপরি ঐ সুবিশাল জানাজা। মেয়র নির্বাচিত হবার আড়াই বছর সম্পূর্ণ হতে না হতেই তাঁর এই অকাল মৃত্যু, কিন্তু ২৯ জুলাই লন্ডন যাত্রার আগের সোয়া দুই বছরে তিনি মেয়র হিসেবে যে বিশাল কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দিয়ে গেলেন তাতে সারা জাতির কাছে আনিসুল হক যুগ যুগ ধরে একজন ক্ষণজন্মাজন নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ব্যক্তিজীবনে আনিসুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে আমার ছাত্র ছিলেন, ১৯৭৩ সালের ১ আগস্ট যখন আমি অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেছিলাম তখন মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন আনিস। পরবর্তীতে বহু সভাসেমিনারে তাঁর সাথে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছে। সর্বশেষ, ২০১৬ সালের মার্চে অর্থনীতি বিভাগের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানের শুরুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত বিশাল র‌্যালির পুরোভাগে দুজন পাশাপাশি হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়েছি। একইমঞ্চে দুজনেই ভাষণ দিয়েছি। ঐ অনুষ্ঠানে প্রফেসর ইউনূসকে আমন্ত্রণ না জানানোর দুঃখে আমার ভাষণে যখন আমি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম তখন আমার পর বক্তৃতা দিতে উঠে তাঁকেও বেদনায় নীল হতে দেখেছি। মুখে শুধু তিনি বলেছেন, ‘স্যার, আমি এখন সরকারের অংশ। তাই, অনেক কথা বলার থাকলেও বলতে পারছি না’। আনিসুল হকের সোয়া দুই বছরের মেয়রের দায়িত্বপালনকালে তাঁর প্রতিটি কার্যক্রম আমি নিবিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করে এসেছি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হিসেবে কার্যকরভাবে দায়িত্ব সম্পাদনের পথে যে প্রশাসনিক বাধাবিঘ্ন ছিল সেগুলো উত্তরণের জন্যে আনিস তাঁর অফুরন্ত প্রাণশক্তি, প্রবল ইচ্ছাশক্তি, প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং সৃজনশীল মননশীলতাকে যেভাবে ব্যবহার করে একের পর এক সাফল্য অর্জন করে চলেছিলেন তা দেখে গর্বে আমার বুক ভরে যেতো প্রায়ই। ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ডঃ এ পি জে আবদুল কালাম স্বপ্নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে একটা চিরস্মরণীয় উক্তি মানবজাতিকে উপহার দিয়ে গেছেন, ‘মানুষ ঘুমের ঘোরে যা দেখে সেটা স্বপ্ন নয়, আসল স্বপ্ন হলো বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত যা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না’। আনিস এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে জানতেন, তিনি সারা দেশের মানুষকে এধরনের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। ঢাকাকে বাসযোগ্য মেগাসিটি বানানোর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে মেয়রের সীমিত ক্ষমতা সত্ত্বেও দিনরাত তিনি অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করে গেছেন এবছরের ২৯ জুলাই তারিখে ঢাকা ত্যাগের আগের দায়িত্ব পালনের মুহূর্ত পর্যন্ত। শক্তিধর প্রতিপক্ষের বাধা ডিঙানোর জন্যে প্রয়োজনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর শরণাপন্ন হতে বিলম্ব করেননি। তাঁর স্বপ্নগুলোর ভাগীদার করে ফেলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীকেও। ফলে, একের পর এক সাফল্য এসেছে তাঁর প্রয়াসগুলোতে। তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ, গাবতলীর রাস্তায় যত্রতত্র বাস পার্কিং উচ্ছেদ, ঢাকা উত্তরের সড়কগুলোর ফুটপাথ দখলমুক্ত করা, সড়ক থেকে বিলবোর্ড উচ্ছেদ, গুলশান, বারিধারা ও বনানীর সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম, সড়কের ফুটপাথে টাইলস সংযোজন, সারা ঢাকা উত্তরের এলাকার সড়ক ও পার্ক জুড়ে ফুলের বাগান গড়ে তোলার প্রয়াস এবং বৃক্ষের চারা রোপণ, সারা ঢাকা উত্তরের এলাকা জুড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, বিভিন্ন দেশের দূতাবাস কর্তৃক নিরাপত্তার নামে দূতাবাস ভবনের সামনের সড়ক ও ফুটপাথ দখলমুক্তকরণ, সড়কের ফুটপাথ থেকে হকার উচ্ছেদ করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণএমন অসংখ্য সাফল্য ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর এই সোয়া দুই বছরের কীর্তি হিসেবে। শক্তিধর অনেক দূতাবাস তাঁকে অবজ্ঞা করতে চেয়ে পরাভব মানতে বাধ্য হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আনিস সশরীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাকর্মচারীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজে নেমে পড়েছেন জীবন বাজি রেখে, সাহসের প্রতিমূর্তি হয়ে। অনেক সময় গোপনে পতাকাবিহীন গাড়ী নিয়ে কাজের অগ্রগতি সরেজমিনে তত্ত্বাবধানেও বেরিয়ে পড়েছেন একাকী। একাধিকবার মারমুখো প্রতিপক্ষকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বিরোধিতার নিরসন করেছেন। আবার, কড়াইল বস্তীতে আগুন লেগে যখন দরিদ্র মানুষের বসতিগুলো পুড়ছিল তখন নাকি সারারাত ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থেকে আনিস ঐ সর্বহারা মানুষগুলোকে সান্ত্বনা দিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে যথাসম্ভব দ্রুত ঐ মানুষগুলোর পুনর্বাসনে সাহায্যের হাতও বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কোন কাজে হাত দিলে পরাজয় স্বীকার করতে জানতেন না আনিস, সেজন্যেই সাফল্য ধরা দিয়েছে তাঁর কাজগুলোতে একের পর এক। অক্লান্ত এই জীবনপণ মিশনারী ও ভিশনারী প্রয়াসের জন্যেই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন ঢাকাবাসীর কাছে, দেশবাসীর কাছে।

আনিসের কর্মযজ্ঞের সাফল্য থেকে দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদের যে প্রধান শিক্ষনীয় তাহলো, সততা, কর্মনিষ্ঠা এবং টীমওয়ার্কের স্পিরিট গড়ে তুলতে পারলে ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এদেশে জনগণের সেবায় অনেক তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য অর্জন সম্ভব। ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রাখতে না পারলে কোন মেয়রই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না এদেশে। অতএব, সরকারী দল বা জোট কিংবা বিরোধী দল থেকে কেউ মেয়র নির্বাচিত হোক্‌ না কেন নিজেদের সততা ও নিষ্ঠা যেমনি থাকতে হবে তেমনি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথেও নির্বিরোধ ওয়ার্কিং রিলেশনশীপ গড়ে তুলতেই হবে, নয়তো রাজনৈতিক বৈরীতা পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ঢাকার সাবেক মেয়র হানিফ ও সাদেক হোসেন খোকা এবং চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মনজুর আলম তাঁদের মেয়াদকালে যেভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের রোষানলে পড়ে অহরহ বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হতেন তা দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে আমাদের। আবার, তার বিপরীতে মেয়র আনিসুল হকের প্রতিটি কার্যক্রমে যেভাবে ক্ষমতাসীন সরকার সহযোগিতা করেছে তাও দেখার সৌভাগ্য হলো আমাদের। দেশের নির্বাচিত শাসকদের এ ডাবল স্ট্যান্ডার্ড গণতন্ত্রে থাকার কথা নয়, তবুও বাস্তবতাকে অস্বীকার করেও তেমন লাভ নেই। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দৃঢ়মূল হলে ক্রমশঃ এহেন একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাবে হয়তোবা। কিন্তু এটুকু বলতেই হবে, মেয়র আনিস সফল হবার পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সস্নেহে সমর্থন বিশাল ভূমিকা রেখেছে। আমরা চাইব, দেশের সকল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এখান থেকে শিক্ষা নিন। একটি ক্ষুদ্র ‘চাটার দলের’ হালুয়ারুটির ব্যবস্থা করার পেছনে ক্ষমতার অপব্যবহারের বদখাসলত থেকে মেয়রদেরকে বের হয়ে আসতে হবে, আনিসের এই শিক্ষাও গুরুত্ববহ। আনিস একজন সফল শিল্পপতি ছিলেন, নিজের মেধা, যোগ্যতা এবং সাধনার মাধ্যমে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়েছিলেন। সবাই জানত যে এই মেয়র টাকা বানানোর জন্যে মেয়র হননি, জনগণের জন্যে কিছু করে যাওয়াই ছিল তাঁর মিশন। মেয়র আনিসের কোন মাস্তানবাহিনী ছিল না, পেশীশক্তিকে কখনো কেয়ারও করেননি। তাঁর এই নৈতিক শক্তি তাঁর সৎসাহসের প্রধান উৎস ছিল নিঃসন্দেহে।

পর্যায়ে দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলোর হালহকিকত সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। আমাদের দেশের সিটি কর্পোরেশনের মেয়রদেরকে নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত দিক্‌ থেকে সরকার এবং শাসক মহলগুলো যেভাবে প্রকৃত প্রস্তাবে সংকীর্ণ ক্ষমতার অধিকারী ‘শিখন্ডী’ করে রেখেছে তার কোন প্রতিকার শেখ হাসিনা কিংবা বেগম জিয়ার পক্ষ থেকে ১৯৯১ সালে ভোটের গণতন্ত্র ফিরে আসার পর গত ২৬ বছরেও পাওয়া যায়নি। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় মেয়র হানিফ এবং চট্টগ্রামে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী জনগণের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে যখন প্রথমবারের মত নির্বাচিত মেয়র হিসেবে সিটি কর্পোরেশন দুটোর নেতৃত্বে আসীন হয়েছিলেন তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিল বিএনপি। অতএব, প্রথম থেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত এই দুজন মেয়রকে সরকারের বৈরিতা মোকাবেলা করে কাজ করে যেতে হয়েছিল। এতদ্‌সত্ত্বেও, ১৯৯৫৯৬ সালে বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনসংগ্রামে জনাব হানিফ এবং জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরীর বলিষ্ঠ ভূমিকা আমাদের ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে গেছে। ঢাকার ‘জনতার মঞ্চ’ গঠনের প্রধান নায়ক ছিলেন মেয়র হানিফ। আবার, ঐ আন্দোলনের সময় চট্টগ্রামে মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীকে যখন সরকার গ্রেফতার করেছিল তার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারা দেশে যে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তার ফলে বিএনপি সরকারের পতন যেভাবে তরান্বিত হয়েছিল তাও জনগণ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি।১৯৯৬ সালের নির্বাচনের সময় এই দুজন মেয়র সারা দেশের জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন বলা চলে। সেজন্যেই ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে যখন শেখ হাসিনা জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন তখন ঐ আন্দোলনসংগ্রামের এই দুই প্রধান নেতা যে তাঁর কাছে যথাযথ গুরুত্ব পাবেন, সেটাই ছিল যৌক্তিক প্রত্যাশা। কিন্তু, নির্বাচনের পর যখন তাঁরা দুজন ঐক্যবদ্ধভাবে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন দুটোকে ‘মেট্রোপলিটান গভর্নমেন্টে’ রূপান্তরিত করার জন্যে শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তখন তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছিল। তাঁদের প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল, এই দুই মহানগরীতে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার সাথে সংশ্লিষ্ট ৩২ টি সংস্থার কাজকর্মে যে সমন্বয়ের প্রকট অভাব রয়েছে তা দূরীকরণে মেয়ররা তাহলে প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারতেন। আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের নজির উদ্ধৃত করে আমার একাধিক কলামে তাঁদের ঐ দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরেছিলাম। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই যে প্রস্তাবিত মেট্রোপলিটান গভর্নমেন্টের অনুরূপ ব্যবস্থা চালু রয়েছে তাও তুলে ধরা হয়েছিল ঐ সময়ের পত্রপত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত সকল কলাম ও অভিমতগুলোতে। যতদূর জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এহেন দাবি উত্থাপনের জন্যে দুজনের উপরেই বরং নাখোশ হয়েছিলেন, এবং ঐ দাবি অচিরেই মাঠে মারা গিয়েছিল। ‘গরু মেরে জুতো দান’ হিসেবে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গিয়েছিল একটি সমন্বয় কমিটি, যার সমন্বয়কের দায়িত্ব পড়েছিল তদানীন্তন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জনাব জিল্লুর রহমানের উপর। বলা বাহুল্য, ঐ কমিটি ডাঁহা ফেল মেরেছিল। মেট্রোপলিটান গভর্নমেন্টের এই প্রয়োজনটি গত কুড়ি বছরেও আর মেটানো হয়নি। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিস এবং সাঈদ খোকন দুজনেই ক্ষীণ কণ্ঠে কয়েকবার উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার অভাবের কথা উত্থাপন করলেও এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুবিবেচনা পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে, দেশের সকল সিটি কর্পোরেশনের জনগণ উন্নয়নের নামে সারা বছর যে অবর্ণনীয় দুর্দশা ও যন্ত্রণার শিকার হচ্ছেন সেটা ক্ষমতাসীনদের কাছে মোটেও গুরুত্ব পাচ্ছে না। আনিস ব্যাপারটা বুঝতে পেরে কোন কাজ শুরু করার আগে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আদায় করে তারপর নাকি কাজে নামতেন। এব্যাপারে আনিসের বিশেষ অভিগম্যতা (টডডণ্র্র) ছিল প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে। কিন্তু, দেশের অন্য কোন নগরীর অন্য কোন মেয়র এরকম সৌভাগ্যের অধিকারী না হওয়ায় ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে জনগণকেই। চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র নাকি কোন এক গোস্তাখির কারণে মাসের পর মাস প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতই পাচ্ছেন না। এর আগে মহিউদ্দিন চৌধুরীও তাঁর নিজ দলের সরকার ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও কয়েকবার সরকার প্রধানের অনুগ্রহ লাভে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে শোনা যায়, যার ভুক্তভোগী হয়েছে চট্টগ্রামবাসী। ১৯৯৬৯৭ সালে জনাব মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রাম বন্দরে এসএসএ’র মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি গাঁড়ার পাঁয়তারাকে যেভাবে রুখে দিয়েছিলেন তার জন্যে তিনি ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। হয়তো ঐ ব্যাপারে তিনি শেখ হাসিনার বিরাগভাজন হওয়ায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ১৯৯৬২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক বঞ্চনার শিকার হয়েছিল। কিন্তু, তাতে মহিউদ্দিন চৌধুরীর জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে গিয়েছিল। এবারের অভিজ্ঞতা থেকেও বলা প্রয়োজন, মেয়রকে শিক্ষা দিতে গিয়ে বারবার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকল্পগুলোকে সিডিএ’র নিয়ন্ত্রণাধীনে দিয়ে দেয়ার কালচার সুশাসনের পরিচায়ক নয়। অতীতে দেখা গেছে, বিএনপি সরকারের সময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আওয়ামী লীগের মহিউদ্দিন চৌধুরী হওয়াতে চট্টগ্রামকে অবিশ্বাস্যভাবে কম উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এমনকি ২০০১০৬ মেয়াদের বিএনপিজামায়াত জোট সরকারের সময় পরপর দু’বছর সিলেটের চাইতে অর্ধেকেরও কম বরাদ্দ পেয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে পাঠানো সব প্রকল্পপ্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে আটকে দেয়াই ছিল নিয়ম। একবার তো চট্টগ্রামের এক বিএনপি নেতা বলেই দিলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী যদ্দিন মেয়র থাকবে তদ্দিন কোন প্রকল্পই পাশ হবে না। এরপর যখন আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপিতে গিয়ে জনাব মঞ্জুর আলম ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হলেন তখন শেখ হাসিনার সরকার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে থোক্‌ বরাদ্দের ব্যাপারে অনেক কম টাকা দিয়ে ঠকিয়েছে বারবার। ভাগ্যিস! সিডিএ’র চেয়ারম্যান জনাব ছালাম ঐ সময়টায় প্রধানমন্ত্রীর শুভদৃষ্টি পাওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে চট্টগ্রাম তেমন বঞ্চিত হয়নি, যদিও সিটি কর্পোরেশনের কাজকর্ম অর্থায়ন না পাওয়ায় তেমন এগোতে পারেনি। তবে আমি রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, সিটি কর্পোরেশনকে ওভাবে শাস্তি দিতে গিয়ে প্রকারান্তরে জনগণকে বঞ্চিত করার এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ, দেশের সকল নির্বাচনে শুধু শাসকদল বা জোট জিতবে, তা তো হতে পারে না। কোথাও বিরোধী দল বা জোট জয়ী হলে জনগণকে শাস্তি পেতে হবে কেন? ২০১৩ সালের মেয়র নির্বাচনে রাজশাহী, সিলেট, গাজীপুর এবং বরিশালে বিএনপি’র মেয়র প্রার্থীরা জয়ী হওয়ার পর ঐ মেয়রদেরকে যেভাবে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে এবং এমনকি জেল হাজতে পাঠানো হচ্ছে সেটা কোনমতেই গণতান্ত্রিক আচরণ বিবেচিত হবে না। ঐ নগরগুলোর ভোটাররাও নিশ্চয়ই এর ফলে শাস্তি ভোগ করে চলেছেন! এধরনের একদেশদর্শী কর্মকান্ড আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধ করা হোক। সরকারের শুভদৃষ্টি পেলে মেয়ররা যে জনগণের জন্যে ইতিবাচক অনেক কিছু করতে পারেন, প্রয়াত মেয়র আনিস সেটা জাতিকে দেখিয়ে দিয়ে গেলেন। আমরা কি এই শিক্ষাকে কাজে লাগাব না? ৫ ডিসেম্বর ২০১৭

লেখক : অর্থনীতিবিদ; ইউজিসি প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x