ত্রিভুবন ট্রাজেডি এবং পৃথুলা

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ৩১ মার্চ, ২০১৮ at ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ
47

উইপোকার মতো জীবন আমাদের। ভালবাসি নিজেকেই। আমার আমিতেই নিমগ্ন আমরা। হঠাৎ এমন মানবিকতা কিংবা উৎসর্গীত প্রাণ আমাদের চমকে দেয় বৈকি। মৃত্যুকে উপেক্ষা করতে পারে ক’জন? তাও যদি হয় অন্যের জীবন বাঁচাতে। হলি আর্টিজানের আর এক তরুণের গল্প শুনেছিলাম। ফারাজ, মৃত্যু না বন্ধু জীবন না মৃত্যু। পা বাড়ালেই জীবন। তবুও বন্ধুদের ছেড়ে একা বাঁচতে না চাওয়া এক অসীম সাহসী প্রাণ। এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

শিশুমুখ পৃথুলা রশিদ। US বাংলার কো পাইলট। Daughter of Bangladesh বলে নেপালীরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। কি অসাধারণ মানবিক গুণে গুণান্বিত। ইচ্ছে করলেই নিজে বাঁচার মতো সুযোগ ছিল। সেই সুযোগ পৃথুলা নেয়নি। মৃত্যুর আগে ১০ জন নেপালি ছাত্রকে বাঁচিয়ে নিজেই মৃত্যুকে নিলো আপন করে। ডানা ভাঙা চড়ুই পাখির যত্ন নিত, একোরিয়ামের মাছগুলো ছিল ওর ভাইবোন, আর কুকুরের শ্বাসকষ্টে বাবার ইনহেলার দিয়ে সেবা দেওয়া মেয়েটিই পৃথুলা রশিদ। এত কোমল মন নিয়ে জন্ম হয়েছিল পৃথুলার। ভালবাসতো মানুষকে, ভালবাসতো তার চারপাশকে। ভালবাসত তার পোষা বিড়াল চড়ুই, কুকুর, মাবাবার আদরের একমাত্র সন্তান। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। শখ ছিল আকাশে উড়ার। ত্রিভুবনে তৃতীয় যাত্রাই তার শেষ যাত্রা। কাজ শেষে অবসর কাটতো মাবাবার সাথে। মা পৃথুলাকে বাবা বলেই ডাকতো। বাবা আর ফিরবেনা ঘর আলো করে। পৃথুলা শান্তশিষ্ট এক অসাধারণ মেয়ে ছিল। ওর সংস্পর্শে এলেই মন ভাল হয়ে যেতো। পরিচিতজনের মন্তব্য।

উড়ো জাহাজ পরিচালনার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোন ধরনের ফাঁক ফোকরের ব্যাপারে সারা বিশ্বে জিরো টলারেন্সের নীতি মেনে চলা হয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিমান দুর্ঘটনার পরিণতি নিশ্চিত মৃত্যু। কার ভুল? কেন ভুল? ১২ই মার্চ কাঠমুণ্ডুর ত্রিভুবন বিমান বন্দরে ইউএস বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে এখন পারস্পরিক দোষারোপ চলছে। ইউএস বাংলা বলছে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কাঠমুণ্ডু বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে পাইলট ভুল জায়গায় বিমানটি অবতরণ করাতে দুর্ঘটনায় পড়েছে। ব্ল্যাক বক্স এবং ভয়েস রেকর্ডার দুর্ঘটনার আগের ১৫ মিনিটের কথোপকথন সংরক্ষিত আছে। তবে বাংলাদেশ ও নেপালের ব্ল্যাকবক্স পরীক্ষার সুবিধা নেই। এটি বাইরে পরীক্ষা করাতে হবে।

আমাদের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র দেওয়ার সময় পাইলটদের অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কতগুলো পরিবার কিরকম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। কতগুলো সম্ভাবনাময় জীবন অকালে ঝরে গেল। দুর্ঘটনার ১০ দিন পর আজ একটা খবরে চোখ আটকে গেল মাহি নামের একটি ছেলের ছবিতে। সে দুর্ঘটনায় নিহত ক্যাপ্টেন আবিদ হাসানের ছেলে। স্বামীর শোক সহ্য করতে না পেরে তার মাও তাকে নিঃস্ব করে চলে গেল। প্রায় এক সপ্তাহ মৃত্যুর সাথে লড়াই করে আফসানা অর্থাৎ মাহীর মা তার স্বামীর সাথে চলে গেল পরপারে। এই পারে মাহী একা। কেউ নেই। আকাশভাঙা কষ্ট বুকে চেপে নির্বাক মাহী। চোখের পানি ঝরছে অঝোর ধারায় নিঃশব্দে।

শান্তির নীড়টা হঠাৎ করে উজাড় হলো। নিয়তি ছিনিয়ে নিল তার নির্ভার আশ্রয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়ানো অনেক কাহিনী অনেক গল্প বুকের ভেতর অনেক কষ্ট উসকে দিচ্ছে। শোকার্ত পরিবারগুলোর কষ্ট আমরা মুছে দিতে পারব না। কেউ আনন্দভ্রমণ, কেউ অবকাশ যাপন, কেউ ছুটির আনন্দে বাড়ি ফেরা, বাধ সাধলো অমোঘ নিয়তি। আপাতত নিয়তিকে দোষ দেই। এক একটা মৃত্যু এক একটা পরিবারে কি ঝড় তুলেছে শুধু ভুক্তভোগী পরিবারই জানে। কারো স্বামী কারো স্ত্রী কারো সন্তান, কারো অবুঝ শিশু, আবার স্বামীস্ত্রী দু’জনেই এক সাথে চলে যাওয়া কেমন করে মেনে নেওয়া যায়! মা সন্তান খুঁজছে, সন্তান মাকে খুঁজছে এক বিভীষিকাময় অবস্থা। ত্রিভুবনে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় অনেকগুলো জীবনের উপখ্যান কাঁদাচ্ছে মানুষকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা, ঢাকা থেকে নেপালে রাজধানী কাঠমুন্ডগামী উড়োজাহাজটিতে মূলত বাংলাদেশ ও নেপালের যাত্রীরা ছিল। দুর্ঘটনায় এত মৃত্যু দু’টো দেশকে শোকার্ত করে তুলেছে। প্রাণহানির ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। বর্তমানে দেশে যেভাবে বিভিন্ন বেসরকারি এয়ার লাইনসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেখানে উড়োজাহাজ পরিচালনায় নিরাপত্তা খ্যাতি আছে কিনা তা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে যাচাই বাচাই করে দেখা উচিত। প্রয়োজনে বর্তমান বিধি বিধান আরও কঠোর করতে হবে।

ভালোবাসাহীন এই সময়ে পৃথুলাদের বড় প্রয়োজন। যেখানে থাকো পৃথুলা শান্তিতে থাকো।

x