থিওচ-এর আয়োজনে চারদিনের নাট্যমেলা

পহেলী দে

বৃহস্পতিবার , ৫ এপ্রিল, ২০১৮ at ৪:৫২ পূর্বাহ্ণ
55

আমরা জানি নাটক সমাজের দর্পন। নাটক জীবনের কথা বলে, সমাজের কথা বলে। সময়ের কথা বলে, ইতিহাসের কথা বলে, সর্বোপরি মন ও মননের কথা বলে। প্রকৃতির যেমন বৈচিত্র্যের অন্ত নাই তেমনি নাটকেও রয়েছে নানা বৈচিত্র্যের সমাহার। বাস্তবিক কিংবা কাল্পনিক রং মিশানো। অসংখ্য বৈচিত্র্যপূর্ণ নাটক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাহিত্যের পাতায়, মঞ্চে কিংবা দূর দর্শনের পর্দায়। তৃপ্তি ও অতৃপ্তির স্থান অধিকার করে সগৌরবে প্রভাব বিস্তার করছে নাট্যজন ও দর্শকের মনোরাজ্যে।

গত ১২১৫ মার্চ ২০১৮ থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম’র আয়োজনে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমি’র মুক্তমঞ্চে ও মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বর্ণাঢ্য নাট্যমেলা। নাট্যজন তাপস শেখর নির্দেশিত মোট ১১টি নাটক মুক্তমঞ্চ ও মূল মঞ্চে মঞ্চস্থ হওয়ার আয়োজন ছিল। শুধু নাটক নয় বিনোদনের সর্বোচ্চ মাত্রা যোগ করা হয়েছিল এই উৎসবে। আবৃত্তি, দলীয় সঙ্গীত, নৃত্য ইত্যাদি সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার সকল উপকরণ। ১২ মার্চ ২০১৮ বিকেলে সাড়ম্বরে শুভ উদ্বোধন হয় তাপস শেখর নির্দেশিত নাটকের ‘নাট্যমেলা ২০১৮’। বরেণ্য নাট্যজন শিশির দত্ত, অধ্যাপক ম. সাইফুল আলম, মুনির হেলাল, সঞ্জীব বড়ণ্ডয়া, অলোক ঘোষ পিন্টু, . কুন্তল বড়ুয়া, রবিউল আলম, অসীম দাশ ও মোসলেম উদ্দিন সিকদারকে গুণীজন সম্মাননায় সম্মানিত করা হয়। তারপর স্বরলিপি সাংস্কৃতিক ফোরাম’ চট্টগ্রাম, দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে ‘প্রমা’, আবৃত্তি সংগঠন। তন্ময় বড়ুয়ার পরিচালনায় নৃত্যরঙ পরিবেশন করে দলীয় নৃত্য। সৌরভ সাখাওয়াত’র রচনায় তাপস শেখর’র নির্দেশনায় ‘চোর হওয়া সহজ নয়’ নাটকটি পরিবেশন করে ‘কিডস্‌ কালচারাল ইনস্টিটিউট’। মূল মঞ্চে অমল রায়’র রচনায় তাপস শেখর’র নির্দেশনা ও সাইফুল ইসলামের সহ নির্দেশনায় জার্মান রাজনীতির প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত নাটক ‘ইজ্জত’ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির চমৎকার পটভূমির একদিকে ছিল রাজনৈতিক উত্তেজনা অন্যদিকে প্রেমহীন কামাতুর পুরুষের নারী দেহ সম্ভোগের অনন্ত পিপাসা। কালে কালে যেসব বিপ্লবের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে পৃথিবী তার পদতলে সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছে কত নারী তারই একটি দৃষ্টান্তের পরিস্ফুটন ঘটেছে ‘ইজ্জত’ নাটকে। তাপস শেখর নির্দেশিত নাটকের অসাধারণ নৈপুণ্যে ৪দিন ব্যাপী খেলা করেছে অসংখ্য দর্শক হৃদয়।

১৩ মার্চ যথারীতি মুক্তমঞ্চে ‘সারগাম সঙ্গীত পরিষদে’র পরিবেশিত দলীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ২য় দিনের নাট্য উৎসবের সূচনা হয়। ‘উচ্চারক আবৃত্তি সংগঠন’ পরিবেশন করে বৃন্দ আবৃত্তি।

রিয়া দাশ চায়না’র পরিচালনায় ‘নৃত্য নিকেতন’ পরিবেশন করে নৃত্য। ফারুক নওয়াজ’র রচনায় তাপস শেখর’র নির্দেশনায় ‘কমান্ডার’ নাটক পরিবেশন করে ‘কিডস কালচারাল ইনস্টিটিউট’। তারপর থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম মঞ্চস্থ করে নাটক ’৭১ এর তেলেসমাতি’। রচনায় শোভনময় ভট্টাচার্য ও নির্দেশনায় তাপস শেখর। যথারীতি মুক্তমঞ্চের আয়োজন শেষে মিলনায়তন মঞ্চে ‘কাজী চপল’র রচনায় তাপস শেখর’র নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘পাইচো চোরের কিস্‌সা’। বেশ চটুল ধাচের নাটক। যথেষ্ট কৌশলী একটি চোর সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজাকে পর্যন্ত ফাঁকি দিয়ে রাজকুমারীকে নিয়ে পালিয়ে যায়। তারপূর্বে গ্রামেগঞ্জে, হাটেবাজারে নানাজনকে নানাভাবে ফাঁকি দিয়ে ‘পাইচো চোরা’ নামের চোর ব্যক্তিটি আরও কত কী চুরি করল। হল ভর্তি দর্শক খুব মজা পেয়েছিল নাটকটি দেখে। থেকে থেকে কোরাস হাসির শব্দে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মেলার ৩য় দিন বিকেলে ‘উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী’ চট্টগ্রাম, পরিবেশিত গণসঙ্গীত দিয়ে উৎসবের শুরু। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশিত হয় ঢাকা হতে আগত ‘বঙ্গস্বর’ আবৃত্তি পরিষদের পরিবেশনায়। হিল্লোল দাশ সুমন’র পরিচালনায় ‘সুরাঙ্গন বিদ্যাপীঠ’ পরিবেশন করে নৃত্য। কিডস্‌ কালচারাল ইনস্টিটিউট পরিবেশন করে নাটক ‘একাত্তরের বিচ্চু’। রচনায় সৌরভ শাখাওয়াত নির্দেশনায় তাপস শেখর। গোলাম শফিকের রচনায় তাপস শেখর’র নির্দেশনায় ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ চট্টগ্রাম, পরিবেশন করে নাটক ‘এই পরিতি সেই পিরিতি নয়’। মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘বেধুয়া’। রচনায় নীহারেন্দু কর ও নির্দেশনায় তাপস শেখর।

মেলার ৪র্থ শেষ দিনেও সাজানো হয়েছিল মুক্তমঞ্চের নানা আয়োজন। কিন্তু নেপালের ত্রিভুবন বিমান বন্দরে ইউএস বাংলা বিমান বিধ্বস্ত হয়ে নিহত যাত্রীদের জন্য জাতীয় শোক পালনে একাত্মতা ঘোষণা করে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’ চট্টগ্রাম মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান বাতিল করে। তবে মিলনায়তন মঞ্চে মঞ্চায়িত হয় নাটক ‘অন্তর্দাহ’। নাটকটি সম্পাদনা ও নির্দেশনায় ছিলেন তাপস শেখর। এ সমাজ যাদের ঘৃণা করে, দিনের আলোয় অবজ্ঞা করে, রাতের আঁধারে দেহগহ্বরে বিষ ঢেলে দেয় তাদেরই জীবন চিত্রিত হয়েছে নাটকের পটভূমিতে। একটি ছন্দোবদ্ধ বাহিনী দারুণ গতিতে সুচারুরূপে এগিয়ে গেছে যবনিকার দিকে।

সম্পূর্ণ একক নির্দেশনায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রাম’র মুক্তমঞ্চ ও মিলনায়তনে মঞ্চে এতগুলো নাটক মঞ্চস্থ করা চাট্টি খানি কথা নয়। সহজ সাধ্য কোন কর্ম নয়। নাটকের প্রতি কতখানি দরদ থাকলে, দায়িত্ববোধ থাকলে, মানুষ এত বড় দায়িত্ব কাঁধে নিতে পারে আমরা তা থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম’র নাট্যমেলা দেখে উপলব্ধি করতে পারি। চারদিনব্যাপী নাট্যোৎসবের পরতে পরতে সাজানো ছিল সুস্থ সংস্কৃতির অমলিন ধারাবাহিকতা। এক ঝাঁক প্রাণোচ্ছল তরুণ অভিনয় শিল্পীর তারুণ্যের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল মেলায়। শিশুরাও অংশগ্রহণ করেছে স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে। সর্বোপরি চট্টগ্রামের নাট্যপ্রিয় দর্শক সমাজ কিছু রুচিশীল উৎকৃষ্টমানের নাটক উপহার পেয়েছে উক্ত আয়োজন হতে। থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম’র আয়োজন সার্থকতার ছোঁয়া পেয়েছে। ভবিষ্যতে আরো নতুন কিছু উপহার পাবে দর্শক সমাজ এই প্রত্যাশা তাদের কাছে।

x