দুর্গম পাহাড়ে স্বাস্থ্য সেবা বঞ্চিত মানুষ

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

শনিবার , ৭ এপ্রিল, ২০১৮ at ৬:০৮ পূর্বাহ্ণ
10

আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। সারা দেশের মত বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়। পাহাড়ের স্বাস্থ্য সেবা শহর, গ্রাম ও মফস্বল কেন্দ্রিক। ভৌগোলিক গঠনের ভিন্নতার কারণে দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরত মানুষ আজো চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। চলাচলের উপযোগী পথ না থাকা বা পাড়া কেন্দ্রিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র গড়ে না ওঠার কারণে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত পাহাড়ের মানুষ। এছাড়া দুর্গম অঞ্চলের বাসিন্দাদের ভাষাগত সমস্যা, ঐতিহ্যগত চিকিৎসা সেবায় বিশ্বাসী এবং প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা না পৌঁছানার কারণে পার্বত্য এলাকার মানুষ আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। বিশেষত দুর্গম এলাকার মানুষ শহর বা উপজেলা পর্যায়ে গড়ে ওঠা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নেয়ার সুযোগই পায় না। ফলে অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। এছাড়া জেলা পর্যায়ের চিকিৎসা সেবা এখানে সাধারণ মানসম্পন্ন। ফলে তুলনামূলক জটিল বা গুরুতর দুর্ঘটনায় বাধ্য হয়েই ঢাকা বা চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে রোগীদের শরণাপন্ন হতে হয়। তবে পার্বত্য এলাকাসমূহে অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় মৃত্যু হার অনেকটা কমে এসেছে। এক দশক আগেও পাহাড়ে মশাবাহিত রোগের সংক্রমণ কিংবা বিশুদ্ধ পানি সংকটের কারণে বহু মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে দেশীবিদেশী সংস্থার কার্যকরী উদ্যোগে পার্বত্য এলাকায় মৃত্যুহার প্রায় শূন্যের কোটায়। কিন্তু পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের আক্রমণে এখনো দুর্গম অঞ্চলে মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পাহাড়ের ঝিরি বা কুয়ার পানি থেকে এসব রোগের সংক্রামণ ঘটছে। খাগড়াছড়ির দুর্গম গ্রামের বাসিন্দাদের দোর গোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা এখনো পৌঁছায়নি। দুর্গম এলাকাসমূহে স্বাস্থ্য সেবায় কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে উঠলেও ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসক সংকটে তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ে প্রান্তিক পর্যায়ে মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে নির্মাণ করা হয় কমিউনিটি ক্লিনিক। বর্তমানে কমিউনিটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর বেহাল দশা। দিনের পর দিন জরাজীর্ণ এসব ভবনে শৌচাগার কিংবা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ছাড়াই চলছে সেবাদান। ফলে এখানে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত বেকায়দায় পড়ছে রোগীরা। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার ৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকের সবকটিরই একই অবস্থা। জানা যায়, ১৯৯৭৯৮ সালে নির্মিত এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে নেই শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। এছাড়াও ভবনের পলেস্তরা খসে পড়ে এবং বৃষ্টির হলে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে ওষুধপত্র ও কাগজপত্র ভিজে যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, দুর্গম এলাকার মানুষের চিকিৎসার সুবিধার্থে খাগড়াছড়ির জনবহুল উপজেলা দীঘিনালার কবাখালী ইউনিয়নের তারাবনীয়া ও কৃপাপুর, বোয়ালখালী (সদর) ইউনিয়নের জামতলী ও তেভাংছড়া, দীঘনালা ইউনিয়নের বাঘাইছড়ি মূখ, বাবুছড়া ইউনিয়নের জারুলছড়ি ও মেরুং ইউনিয়নের বগাপাড়া, বেতছড়ি, নোয়াপাড়া এলাকায় ৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেহ্মক্স ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর যৌথভাবে স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে থাকে। দীঘিনালার জামতলী, তারাবনীয়া ও বেতছড়ি কমিউনিটি ক্লিনিকেরও একই জরাজীর্ণ অবস্থা দেখা গেছে। তারাবনীয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক প্রোভাইডাররা (সিএইচসিপি) জানান, ১৯৯৭৯৮ সালে নির্মিত উপজেলার সব ক্লিনিকের একই অবস্থা।

কবাখালী ইউনিয়নের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকরা বলেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে বসার পরিবেশও নেই। বৃষ্টি হলে ক্লিনিকগুলোতে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান বন্ধ থাকে। এছাড়া শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা না থাকায় সেবাদানকারী ও রোগীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। একই চিত্র জেলার মাটিরাঙা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আওতাধীনঞ্জ দুর্গম তবলছড়ি পল্লী স্বাস্থ্য কেন্দ্র, গুইমারা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, আলুটিলা স্বাস্থ্য কমপেহ্মক্স ও গৌরাঙ্গাপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। জনবল না থাকায় এখানে কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এর মধ্যে আলুটিলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি জনবলের অভাবে বন্ধই থাকে। মাটিরাঙার যুদ্ধ কুমার কার্বারী পাড়া থেকে এক রোগী জানান, ‘অসহায় হয়ে এখানে চিকিৎসা নিতে আসতে হয়। তাছাড়া এখানে কোন উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাও নেই। জেলার সিন্দুকছড়ি ও মাইসছড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কোন মেডিকেল অফিসার নেই। মাত্র চারজন কর্মচারী দিয়ে দুটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র চলছে। জেলার সবচেয়ে বেহাল দশা খাগড়াছড়ির দূরবর্তী উপজেলা লক্ষীছড়ি ও রামগড় উপজেলায়। রামগড়ে ৭ জন চিকিৎসক নেই। লক্ষীছড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ৫ চিকিৎসকের পদ শূন্য। ডাক্তার সংকটের কারণ প্রসঙ্গে ল ীছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, দুর্গম এলাকা হওয়ায় বেশির ভাগ ডাক্তারই বদলি হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। খাগড়াছড়ি জেলা সির্ভিল সার্জন মো. শওকত হোসেন বলেন, ‘চিকিৎসক সংকটের কারণে জেলার স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সরকার প্রত্যন্ত এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সেবার দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই লক্ষে ৪০জন কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক প্রোভাইডারকে (সিএইচসিপি) প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো উন্নয়ন করা গেলে দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা যাবে।’

x