দুর্বার প্রগতি সংগঠন

আলোর মশাল হাতে এগিয়ে চলেছে

মাহবুব পলাশ, মীরসরাই

সোমবার , ৯ এপ্রিল, ২০১৮ at ১:৫০ অপরাহ্ণ
11

ওরা সবাই বন্ধু, একসাথে চলেন ফেরেন। একসাথে ভাবেনও। সবাই কলেজবিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। সম্মিলিত চেষ্টায় ছোট উদ্যোগও যে আনতে পারে বড় পরিবর্তন, সে প্রমাণ রেখেছেন তারা। স্বপ্ন দেখেন একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলার। সে লক্ষে ২০১১ সালে ৭ জানুয়ারি মীরসরাই উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের মলিয়াইশে তারা ২৪ বন্ধু মিলে গড়ে তোলেন এদুর্বার প্রগতি সংগঠন। যেটি এখন এ অঞ্চলের তারুণ্যের মেলবন্ধনের বাতিঘর। যান্ত্রিক প্রযুক্তির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি তথা উৎকর্ষের এ সময়ে এসে নিজ চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে, চট্টলার এ গ্রামীণ জনপদে কিছু উদ্যমী তরুণের সমাজসংস্কৃতির সেবায় নিবেদিত হয়ে কাজ করা যে বিফল চেষ্টা নয়, তা এ সংগঠনকে দেখলে বুঝা যায়। শুধু সমাজসংস্কৃতি নয়, শিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, খেলাধুলা সহ মানবতার কল্যাণে বিভিন্ন জনহিতকর কাজ করে আজ তারা শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে। যার আলো দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র চট্টগ্রামেও।

তাদের এ কলেবরে ইতিমধ্যে যোগ হয়েছে আরো ৭৯ তরুণ। ব্যক্তি জীবনে সাফল্যচূড়ায় পৌঁছার আকাঙক্ষা সবার কমবেশি থাকলেও, এদের ক্ষেত্রে একটু আলাদা। তারা শুধু নিজেরা নয়পাশের মানিুষটিকেও কিভাবে ভাল রাখা যায় সে লক্ষে কাজ করেন। সংগঠনের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা নূন্যতম এস.এস.সি পাস। এ সকল তরুণ সমাজকর্মীরা পড়ালেখা করছেন শহরউপজেলার বিভিন্ন সরকারিবেসরকারি কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি এরা শপথ নিয়েছেন সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের। একজন আদর্শ সমাজকর্মী হিসেবে গড়ে ওঠাও তাদের লক্ষ । সময়ের ফাঁকে এসকল তরুণরা ছুটে আসেন আপন নীড়ে। কাঁধেকাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন, সকল অসুন্দরের বিরুদ্ধে। অবসরে আড্ডার সময় এখন আর তাদের অযথা কাটেনা। সময় পেলে ছুটে চলেন, আলোর মশাল হাতেকোননা কোন এক পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের জনসাধারণের মাঝে। তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে এ সকল তরুণদের চলে নানা রকম গবেষণা। প্রত্যেক সদস্য প্রতি মাসে চাঁদা দেন, টাকা জমান। সে জমানো টাকা ও দাতাদের অনুদান দিয়ে মলিয়াইশের ঐতিহ্যের স্মারক হেতালিয়া খাল পাড়ের ছোট্ট একটি ঘর থেকে, এ তরুণরা সুন্দর সমাজ গড়ার কাজ করে যাচ্ছেন। এ সংগঠন গত সাত বৎসরে অনেকখানি বদলে দিয়েছে মীরসরাইয়ের আটটি গ্রাম। তাঁদের উৎসাহে গ্রাম গুলোর শিশুকিশোররা স্কুলমুখী হওয়ার পাশাপাশি পাচ্ছে বিনামূল্যে কাগজকলম, পাচ্ছে স্কুলের বেতনও। শিশুকিশোরদের পড়ালেখাকে আনন্দময় করতে সংগঠনটি প্রকাশ করছে দেয়ালিকা, আয়োজন করছে চিত্রাংকন, কুইজবিতর্ক প্রতিযোগিতা ও ক্রীড়াসাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। সবুজের সমারোহ বাড়াতে স্থানীয় সড়কের পাশে তাঁরা রোপণ করেছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা। গরীব মেয়েদের বিয়েতে ও অসহায় মানুষের চিকিৎসায় দেয়া হচ্ছে অনুদান। গরীব জনসাধারণের মাঝে দেয়া হচ্ছে ইফতার, ঈদ সামগ্রী ও কাপড়। ফ্রি ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় ও স্বেচ্ছায় রক্ত দানের ব্যবস্থাও করা হয়।

১০৩ তরুণের কর্মতালিকায় প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে আরো নতুন নতুন উদ্যোগ। অসহায় শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ । কৃষকরা বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানতাই এলাকার চার সেরা কৃষককে দেয়া হয় দুর্বার কৃষি পদক এবং কীটনাশক স্প্রে ও কাস্তে। স্থানীয় বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণে অনুদান ও বেঞ্চ প্রদান করে তারা। মসজিদ নির্মাণেও অনুদান প্রদান করা হয়। ছোট ছোট পাড়ামহল্লায় পরিচালনা করা হয় স্বাক্ষরতা ও শিক্ষা জরিপ। চালু করা হয়েছেদুর্বার পাঠাগার। যেখানে হরেক রকম বই ছাড়াও নিয়মিত পত্রিকার ব্যবস্থা আছে। যা এখন সব বয়সীদের বিনোদনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সংগঠনের মোট সদস্য ২২৪ জন এর মধ্যে প্রতিষ্ঠাতা ২৪ জন, সাধারণ সদস্য ৭৯ জন, আজীবন সদস্য ৮০ জন, দাতা সদস্য ১৯ জন ও পৃষ্ঠপোষক সদস্য ১৮ জন। যে ২৪ জন তরুণ এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁরা হলেনহাসান মো.সাইফ উদ্দীন, আশিষ দাশ, আমিনুল ইসলাম, এমদাদুল হক রাসেল, সাইদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউনুছ, আব্দুল্লাহ আল নোমান, মহিবুল হাসান সজীব, মো. আশরাফ উদ্দীন, রিপন কুমার দাশ, আরিফুল ইসলাম, মির্জা মিশকাতের রহমান, তাপস দাশ, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, নয়ন কুমার দাশ, ফরহাদ উদ্দীন, নুরের নবী রাহাত, রিপন চন্দ্র দাশ, বেলাল হোসেন, আমজাদ হোসেন, মো. আকবর হোসেন, মেহেদী হাসান জিকু ও ইমতিয়াজ মাহমুদ রিয়ান। ইতোমধ্যে সংগঠনটি ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নিবন্ধন ও ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে স্বীকৃতি লাভ করে। যার নিবন্ধন নম্বর চট্ট৩০৮৩/১৪ ও স্বীকৃতিপত্র নম্বর চট্ট০৬/১৭। যেটি এখন মীরসরাইয়ের সেরা কয়েকটি সংগঠনের মধ্যে অন্যতম । আর কেনইবা সেরা হবে না। এ অল্প সময়ে এ সংগঠন পশ্চিম মলিয়াইশ, পূর্ব মলিয়াইশ, রহমানিয়া, শেখটোলা, উকিলটোলা, গজারিয়া, তিনঘরিয়াটোলা, মধ্যম মুরাদপুর, সুফিয়া ও চরশরৎ গ্রামের গরিব ১৫১ জন শিক্ষার্থীর বেতন বাবদ মধুসূধন শিক্ষা বৃত্তির আওতায় ১২১১৬০ টাকা ও ২৫৫ জন শিক্ষার্থীকে কাগজকলম প্রদান করে। ১০৯ জন শিক্ষার্থীকে পাঠ্য বইয়ের বাইরে বিভিন্ন বই বিতরণ করা হয়। চরশরৎ হাই স্কুলে ২০টি বেঞ্চ ও অনুদান দেয়া হয়। ১২০০ জনের বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও ১৮০ জন রোগীকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করা হয়। এলাকার ৩০ জন গরীব মেয়ের বিয়েতে ও ২৫ জন অসহায় লোকের চিকিৎসার জন্য অনুদান দেয়া হয়। ৪৮০ জন অসহায়ের মাঝে ইফতার, ঈদ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। বেকারত্ব দূরীকরণার্থে সংগঠনের উদ্যোগে যুবকদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে এলাকার প্রায় ১৩০ যুবককে সরকারিবেসরকারি বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। জনসাধারণের মাঝে বিতরণ করা হয় ৮০০০ গাছের চারা এবং গ্রামীণ সড়ক ও অনাবাদি জায়গায় ৫০০ চারা গাছ রোপণ করা হয়। এছাড়া খেলাধুলাসংস্কৃতির বিকাশে, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, গান, বৈশাখী উৎসব, নাচ, কবিতা, চিত্রাংকন ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয় সমান গুরুত্ব দিয়ে। ক্রীড়া ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী আয়োজন হিসেবে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় ৪৫ উর্ধ্ব বয়সী প্রবীণদের নিয়ে ফুটবল খেলা। যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হয় জাতীয় দিবস সমূহ। শীতে শহরে ও গ্রামে ৮৯০ জন অসহায় শীতার্তদের মাঝে কম্বল, শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। কৃতি শিক্ষার্থী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা ও গুণীজনদের দেয়া হচ্ছে সংবর্ধনা। যৌতুক, মাদক, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং ও জঙ্গিবিরোধী জনসচেতনতা সৃষ্টিতেও কাজ করে তারা। স্কুল ও কলেজ শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিতর্ক উৎসবের আয়োজন করা হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল তবে মেধায় অনন্য এমন শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনে সহযোগিতা করছে এ সংগঠন। এছাড়া সংগঠনের কার্যালয়ে গরীবমেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। সংগঠনের এত সব কর্মযজ্ঞে যে সকল উদ্যমী কর্মী নিবেদিত হয়ে কাজ করছেন তাদের মধ্যে স্বরুপ দেবনাথ, সুজন ভৌমিক, এম.ডি ইমরান, জাফর ইকবাল, ইমাম হোসেন চৌধুরী, সৈকত চৌধুরী, কাজী এমরান হোসেন, জিয়া উদ্দিন, আহাদ উদ্দীন, কুন্তল মুনতাছির, আরফিন হোসেন, কামরুল হোসেন, নাহিদুল আনসার, অভিজিৎ নাগ, রাকিব উদ্দিন, জামিলুর রহমান, ইকবাল হোসেন, কপিল উদ্দিন, রবিউল হোসেন, আরিফ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, মুহা. আরিফ হোসেন, নাঈমুল হাসান, মেহেদী হাসান, রিয়াজ উদ্দিন, আমজাদ হোসেন, আলী হায়দার চৌধুরী, বোরহান উদ্দিন, রানা মজুমদার, এনামুল হক, জয় শর্মা, ফখর উদ্দিন, রিয়াজ উদ্দিন রাকিব, নকিব উদ্দিন, রাহাদ উদ্দিন, তরিকুর রহমান, শাহ আরমান ফরহাদ, নুরুচ ছোবহান শাকিল, জয়দেব দাশ, নাজমুল হাসান, রফিকুল ইসলাম, ইমতিয়াজ বাবু, আশরাফুল ইসলাম, আমজাদ হোসেন জিহান, টিপু সুলতান, আশ্রাফ উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন, সৈয়দ আবু হাসনাত, ইমরুল হাছান, সৃজন পাল, মেজবাহ উদ্দিন, শরিফুল ইসলাম ও অনিক ভৌমিক উল্লেখযোগ্য।

মীরসরাইয়ের সকল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অভিভাবক উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সাবরিনা রহমান লিনা বলেনখুব অল্প সময়ে দুর্বার প্রগতি সংগঠন বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল কার্যক্রম পরিচালনার মধ্য দিয়ে মীরসরাইতে বেশ সাড়া জাগিয়েছে’। সংগঠনের পথচলা সম্পর্কে সাধারণ সম্পাদক মির্জা মিশকাতের রহমান জানান– ‘বন্ধুরা সবাই একসাথে চলতাম, সাথে ভালো কিছু করার জন্য উৎসাহী থাকতাম সবসময়। তখন থেকে আমাদের এ মেলবন্ধন খুবই সুদৃঢ় ছিল। একদিন এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়ী সৈয়দ আহমদ সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হাসান মোহাম্মদ সাইফ উদ্দীন কে একটি সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। সে সময় থেকে একটা সংগঠন গড়ে তোলার প্রবল ঝোঁক তার মাথায় ঝেঁকে বসলো। নানা চড়াইউৎরাই পেরিয়ে আমাদের ২৪ বন্ধুকে নিয়ে হাসান মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন এ সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই থেকে পথ চলা। আর থেমে থাকা হয়নি’। মীরসরাইয়ের এ ‘দুর্বার প্রগতি সংগঠন’ এ প্রজন্মের তরুণদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। এ সকল তরুণদের তারুণ্যের জ্যোতি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে সমগ্র বাংলাদেশে। সংগঠনের মাধ্যমে তারুণ্যের ঐক্যের যে সুদৃঢ় মেলবদ্ধন তৈরি হয়েছে তা অটুট থাকুক চিরকাল ণ্ড এ প্রত্যাশা সবার।

এতসব কাজের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এ সংগঠনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি তরুণ সংগঠক হাসান মোহাম্মদ সাইফ উদ্দীন। সংগঠনের সম্পর্কে জানতে চাইলে, তিনি বলেনণ্ড ‘ভাল কিছু করার মধ্য দিয়ে একটি সুখীসমৃদ্ধ সমাজ গড়াই আমাদের লক্ষ। এ অভিযাত্রায় আমরা সবাইকে সাথে নিয়ে এগোতে চাই। সে লক্ষে আমাদের স্লোগান ‘এসো হাতে হাত রেখেসুন্দর সমাজ গড়ি সবাই মিলে’। দুর্বার আর হাসান যেন এক অবিচ্ছিন্ন সত্বা।

x