নববর্ষের সকল আয়োজন শুভ হোক সকলের জন্য

ফেরদৌস আরা আলীম 

শনিবার , ২১ এপ্রিল, ২০১৮ at ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
13

বাহ্যিক আড়ম্বরে বিশ্বায়নের এই সময়ে ভোগবাদীতার এই রাজত্বে উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায় বলেই নারী লাঞ্ছনার মতো ঘটনা ঘটছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো নববর্ষের উৎসবেরও নির্ধারিত একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে বিষয় হিসেবে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের দাবি উঠে আসুক। নারী নির্যাতন উৎসবের অঙ্গ হলে সে উৎসব পবিত্রতা হারায়। কলুষিত হয়। এমন উৎসব আমরা চাই না। আমরা চাই না জাতীয় উৎসব বিজাতীয়, বিকৃতধিকৃত আচরণের চারণক্ষেত্র হোক।

বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগআতঙ্কের কথা যত শুনি ততই বর্ষ পরিক্রমায় আমাদের ছয় ঋতুর আসাযাওয়ার পথের দিকে আকুল মমতা ও নিবিড় মগ্নতায় তাকিয়ে থাকি। বৃক্ষরাজ্যে প্রাকৃতিক নিয়মের কোনও ব্যত্যয় দেখিনি। এবারেও নয়। মনে মনে বলিণ্ড ‘আমি যতদিন থাকি/ তুমিও থাকিও।’

যথানিয়মে কোকিলের ডাকে এবারেও বসন্ত এসেছে। ঝামুরঝুমুর আমের মুকুলের ঝুলন্ত ঝালর একদিন জানিয়ে দিল হাতে আর বাকি মাত্র চৈত্র মাস। ১৪২৪ এর বিদায়ের সময় হয়ে এল। এরই মধ্যে পুরনো পত্রাবলী ঝরিয়ে দিয়ে নতুন পাতায় সেজে ওঠা জামের ডালে ডালে ফুল ফোটানোর খেলা শুরু হয়েছে। কাঁটামুকুলেরা ঘাপটি মেরে পাতার আড়ালেআবডালে লুকিয়ে রইল কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির আশায়। চৈত্রের মাঝামাঝি একরাতের ঝিরঝিরে এক পশলা বৃষ্টি যেন যাদুর কাঠি ছুঁইয়ে দিল জামের সরুমোটা প্রতিটি ডালে! শ্বেতকেশরের নধরকান্তি বোতাম ফুলের ঠাসবুনুনির স্রোত যেন গাড়িয়ে পড়ছে প্রত্যেক ডালের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত।

নবনীকোমল, অমলধবল সে সুন্দরের আয়ু বড়জোর চারপাঁচদিন। পরাগের কৌমার্য ঝরিয়ে ডাল ফুঁড়ে বেরুনো ছোট ছোট বোঁটার কোলে জামের গুটি সেঁটে বসে গেছে। অন্যদিকে, রঙের শব্দহীন কামান দেগে পলাশশিমুল তোরণ সাজিয়ে বসে আছে বৈশাখের অপেক্ষায়। যথাসময়ে, যথানিয়মে এসে গেছে বৈশাখ; ওই যে তিনি, ওই যে বাহির পথে। শুভ নববর্ষ, প্রিয় পাঠক, শুভ নববর্ষ, শুভ কামনা উৎসবের আনন্দে পথে নেমে আসা কন্যাদের জন্য। তাদের পথের আনন্দ, পায়ের আনন্দ যেন পথহারা না হয়।

আমাদের নববর্ষের উৎসব দেশে দেশে উদযাপিত উৎসবের মতো কিছু মঙ্গল কামনা জড়িত আচারঅনুষ্ঠান মাত্র নয়। বাংলার মাটি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে নববর্ষের মতো এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎসব আর নেই। সেই সঙ্গে এও সত্য যে আমাদের আজকের উৎসব বাঙালি জাতিসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। পাকিস্তান পর্বে বাঙালি মুসলমান জাতিসত্তা নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়েছিল। আমরা বাঙালি না মুসলমান অথবা আগে বাঙালি না আগে মুসলমান এই ছিল প্রশ্ন। বৈশাখের প্রথম দিনে নববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে এর একটা উত্তর আমরা পেয়ে যাই। আমাদের জাতিসত্তা ধারাবাহিক একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে এবং নববর্ষ উদযাপনের মধ্য দিয়ে তার একটা স্বীকৃতি এসেছিল বলে নববর্ষের সঙ্গে বাঙালির একটা বিশেষ আবেগ জড়িয়ে ছিল এবং আছে। তবে এ উৎসবকে ধর্মবিরোধী প্রতিপন্ন করার একটা চেষ্টা বরাবর চলে এসেছে। চূড়ান্ত রূপে সে চেষ্টাটি আজ নারীর বিরুদ্ধে নারীকে জীবনবঞ্চিত করার চক্রান্তে রূপ নিয়েছে। কিন্তু আমরা জানি যে রমনার বটমূলে বোমা হামলাকারীরা পরাজিত হয়েছে। আজ মঙ্গল শোভযাত্রা যে বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে সেও তো অকারণ নয়। ৮০’র দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আর একবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এদেশের মানুষ। ১৩৯৬ এর নববর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যে মঙ্গলশোভাযাত্রাটি বেরিয়েছিল সেটি ছিল অশুভ, অন্যায় ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে আলোকেরই ঝর্ণাধারা।

ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রার এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। যথারীতি লক্ষ্মীর সরা, টেপা পুতুল এবং পাখি অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের মোটিফগুলো রয়েছে। রয়েছে মুখোশ, মুখ লুকোবার জন্য নয়, লাঠিতে ধরে মিছিল করার জন্য। সেখানে রয়েছে বাঘ, পেঁচা ও রাজারানীর সঙ্গে তাদের সেনাপতি এবং সূর্যদেবতা। শোভাযাত্রার সবচেয়ে বড় শিল্পকাঠামোটি হরিণ। সোনার হরিণ। সোনার হরিণ সোনার মানুষের কথা মনে করিয়ে দেবে: মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। নগরজীবনে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজনে এবারের প্রতিপাদ্যে লালন শাহের গান, গানের এ বাণীতে সময়ের যে চাহিদাটি অশ্রুত সুরে আকাশবাতাস মুখরিত করছে সেটি নারীর পক্ষে কথা বলছে।

বিপন্ন নারীর আর্তনাদ আজ সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীবর্জিত যে কোনও আয়োজন, অনুষ্ঠান নিষ্প্রভ হতে বাধ্য। অর্ধেক মানুষ মানুষ নয়, অর্ধেক জীবন জীবন নয়। প্রকৃতি স্বরূপ নারীই প্রাণশক্তি জগতের, জীবনের। মুখোশের আড়ালে কদর্যতার সুযোগ নেবে মুখোশধারী তাই ভেবে সরকার মুখোশ হাতে ধরার নির্দেশ দিয়েছে এবং অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নারী লাঞ্ছনাকারী সক্রিয় হয় তাই সূর্যডোবার আগে উৎসব শেষ করার ঘোষণা আসে। অথচ সমস্যার মূল কারণ সকলেরই জানা; সেখানে আলো পড়ছে না। আজ সৌদি আরবের মেয়েরা বাধ্যতামূলক নানা বিধিনিষেধের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে, নতুন জীবন পাচ্ছে। তেহরানের রাস্তায় রাস্তায় সফল নারীর প্রতিকৃতি নিয়ে বিলবোর্ড হচ্ছে। এদিকে আপন যোগ্যতায় এদেশের নারী যখন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে, বিশ্বজয়ে ভূমিকা রাখছে, পুরস্কৃত হচ্ছে তখন নিরাপত্তার নামে তাকে গৃহবন্দী করার আয়োজন চলছে প্রকাশ্যে। কিন্তু কেন, কাদের স্বার্থে? ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড ছিল বলে জানতাম। শিশু ধর্ষণের শাস্তি সেক্ষেত্রে হওয়া উচিত প্রকাশ্যে ফাঁসি। কিন্তু দিনাজপুরে (পার্বতীপুরে) দুবছরের শিশুটিকে ধর্ষণোপযোগী করার জন্য যে পাষন্ড ধারালো ব্লেড চালিয়েছিল তার ছাড়া পাওয়ার খবরে দেশজুড়ে আবার একটা তোলপাড় হয়ে গেল। ওই সময়ে রংপুর মেডিকেল কলেজে শিশুটির চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ডা. সোনিয়া (বর্তমানে ঢাকা মেডিকেলে কর্মরত) তাঁর ফেসবুকদেয়ালে এনিয়ে এক মর্মস্পর্শী লেখা দিয়েছেন। সেটি দেখে বিচলিত সেলিনা হোসেন ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ চাই’ শিরোনামে ৮ এপ্রিল দৈনিক সমকালে লিখেছেন। প্রতিরোধের আগুন কিন্তু জ্বলছে অনেকদিন ধরে। এখন শনৈ শনৈঃ ঘৃতাহুতিতে সে আগুন মুহুর্মুহু দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে। কারণ ঘটনা ঘটেই চলছে। চলন্ত বাসে রূপা ধর্ষণের দানবেরা এখনও মুত্যুদন্ড মকুবের আশায় বেঁচে আছে। এরই মধ্যে মাত্র ৪ দিন আগে ধামরাইয়ে আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়ে গেল।

ধামরাইয়ের শ্রীরামপুরের একটি পোশাক কারখানার কর্মী ছুটির পর রাত ৯ টার দিকে সাভারগামী যাত্রী সেবা পরিবহন নামের একটি বাসে ওঠেন। পরের বাসস্ট্যান্ড কালামপুরে অন্য যাত্রীরা নেমে গেলে চালক বাসটি মানিকগঞ্জের দিকে ঘুরিয়ে নেন। কিছুদূর যাওয়ার পর বাসের নিয়ন্ত্রণের হাত বদল হয়। বাসচালক তার সঙ্গীসহ মেয়েটিকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন। অন্যরা তাদের সহযোগিতা করে। এরই মধ্যে বাস আবার ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। সাভারমুখী বাসটি জয়পুরা পৌছুলে তরুণীর চিৎকার শুনে ধামরাই থানার টহল পুলিশ বাসটি থামানোর চেষ্টা করে কিন্তু বাসটি চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ পিছু ধাওয়া করে এবং ৭ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে বাসটি থামাতে সক্ষম হয়। উদ্ধারপ্রাপ্ত তরুণী ৫ জনকে আসামী করে ধামরাই থানায় মামলা করেছে এবং তরুণীকে ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। এই এপ্রিলে যখন আসন্ন নববর্ষের উৎসবের প্রস্তুতি চলছে সবখানে তখন চাঁদপুরের হাজিগঞ্জে দরিদ্র মুন্নী (যাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়েছে) ১ লক্ষ টাকা যৌতুকের জন্য জ্বলন্ত উনুনে নিক্ষিপ্ত হয়। (..১৮) একই দিনে প্রথম আলোতে মার্চে (২০১৮) ৮৮টি ধর্ষণের ঘটনার খবর আসে। এর মধ্যে ১২টি গণধর্ষণ এবং হত্যার শিকার ৩ জনের কথা বলা হয়। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদে সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্যমতে এই মার্চে বিভিন্ন কারণে ৫০ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকারদের মধ্যে যৌতুকের দাবিতে ৮ জন, অ্যাসিডদগ্ধ হয়ে ১জন এবং নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩১ জন। ৩৪ জনের মৃত্যু ছিল রহস্যজনক। এই এপ্রিলে (২০১৮) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ধর্ষণবিরোধী এক গণ সমাবেশে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক আরিফা রহমান রুমা, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদের সহসভাপতি ডা. মাহবুবুর রহমান, প্রজন্ম ৭১ এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ রেজা নূর প্রমুখের বক্তব্য শুনেছেন অনেকে। এঁরা কেউই একক ব্যক্তিমাত্র নন। এঁরা সংগঠনের পক্ষে, প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কথা বলেন এবং বিশাল জনগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করার বা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন। এঁরা ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড চেয়েছেন। চেয়েছেন পৃথক ট্রাইবুনালে দ্রুত গতিতে ধর্ষণের বিচার হোক।

আমরা জানি আজ যারা নববর্ষের উৎসবকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য বেশ কিছুদিন ধরে টানা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তাঁরাই নারীর পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন। আমরা বিশ্বাস করি যে নববর্ষের সকল আয়োজন, সব ধরনের উৎসব থেকে জাতিকে জাতীয় ঐতিহ্যের মূলে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকে, থাকা বাঞ্ছনীয়। বাহ্যিক আড়ম্বরে বিশ্বায়নের এই সময়ে ভোগবাদীতার এই রাজত্বে উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায় বলেই নারী লাঞ্ছনার মতো ঘটনা ঘটছে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো নববর্ষের উৎসবেরও নির্ধারিত একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে বিষয় হিসেবে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপের দাবি উঠে আসুক। নারী নির্যাতন উৎসবের অঙ্গ হলে সে উৎসব পবিত্রতা হারায়। কলুষিত হয়। এমন উৎসব আমরা চাই না। আমরা চাই না জাতীয় উৎসব বিজাতীয়, বিকৃতধিকৃত আচরণের চারণক্ষেত্র হোক।

x