নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত সীমান্ত ইউনিয়ন দোছড়িবাসী

নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক-বিদ্যুৎ সংযোগ

এনামুল হক কাশেমী, বান্দরবান থেকে

বুধবার , ১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ
43

দেশের সাধারণ ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও স্বাভাবিক জীবনমানের ছোঁয়া বঞ্চিত দোছড়ি ইউনিয়নবাসী। মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়ি ইউনিয়নের প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিক বিদ্যুৎ, উন্নত সড়কপথ এবং মোবাইল নেটওয়ার্কিং সুবিধা বঞ্চিত এখনও। কার্যত দোছড়ি ইউনিয়ন সর্বক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্‌্ন উপজেলা সদর থেকে। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী আধা সামরিক বাহিনী বিজিবির গুরুত্ব্‌পূর্ণ স্থাপনা, ইউপি অফিস, কৃষিসহ বেশকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও দোছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দারা সুবিধা বঞ্চিত থাকায় ক্রমেই তাদের অবস্থার অবনতি ঘটছে। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিপুল ত্রাণ প্রাপ্তির কারণে দু’বেলা খাবার নিশ্চিত সুযোগ ভোগ করলেও স্থানীয়রা অর্থাৎ বাংলাদেশি নাগরিকরা চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন বলেও জানা গেছে। আর্থিক অভাব অনটনে এ ইউনিয়নের মানুষ মহাসংকটে থাকলেও তাদের প্রতি ‘নেকনজর’ নেই কোন মহলেরই। এলাকা পরিদর্শনকালে এমন অবস্থা দেখা গেছে।

জানা গেছে, বান্দরবান জেলার অন্যতম দুর্গম ও মিয়ানমার সীমান্তবেষ্টিত ইউনিয়ন দোছড়ি পরিদর্শনে যাওয়া যেকোনো ব্যক্তির কাছে প্রশ্ন জাগবে এই ভূখন্ড আসলে কি এদেশের অংশ, না ওপারের কোন জায়গা। ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ সড়কপথগুলো এখনও ইট বিছানো এবং মাটির। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ৫ ইউনিয়নের একটি হচ্ছে এই দোছড়ি ইউনিয়ন। কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার গর্জনিয়া প্রধান বাজার পয়েন্ট থেকে দোছড়ি ইউনিয়ন সদরের দূরত্ব ১০ কি.মি এবং একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম এই পথ। সম্প্রতি পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরের উদ্যোগে কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও ইউনিয়নউপজেলা সংযোগ সড়কের বেহালদশা এখনও বিরাজ করছে। গত শনিবার দোছড়ি সফরকালে কথা হয় সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল নবী, যুবক ও দোকানদার আবদুল মান্নান এবং কৃষক রেজাউল করিমের সাথে। তাঁরা বলেন, এ ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাটের অবস্থা শোচনীয় এবং বর্ষায় ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নেই এ ইউনিয়নে, নেই এয়ার নেটওয়ার্ক। মোবাইল কোম্পানীগুলোর কোন টাওয়ার স্থাপিত না হওয়ায় মোবাইল ব্যবহারের সুবিধ বঞ্চিত পুরো ইউনিয়নবাসী। বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের দাবি নিয়ে বহুবার আবেদনপত্র সরকারি উচ্চ মহলে জমা দেয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও উদ্যোগ নেয়া হয়নি এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের। তাঁরা বলছেন, বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হলে ইউনিয়নের প্রায় ২ হাজার বাড়িঘর, কমপক্ষে ১০টি ধানচাল কল, ৭টি মসজিদ, ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি ন্নি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ইউপি অফিস, বিজিবির স্থাপনা এবং অন্যান্য সরকারি স্থানীয় অফিসগুলো বিদ্যুতায়িত হবে।

ইউনিয়ন সদরের সাথে সড়কপথে দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে সড়ক নিরাপত্তার স্বার্থে যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজীকরণে উঁচু পাহাড়গুলোর বিপদজ্জনক ‘গ্রেডিং’ কমাতে হবে এবং তা সহনীয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের আওতায় নিয়ে আসা দরকার বলেও স্থানীয়রা দাবি তুলেছেন। তারা বলছেন, বিপজ্জনক নিচুউঁচুতে দোছড়ি সড়কপথের অবস্থান হওয়ায় প্রতি সপ্তাহেই দুর্ঘটনা ঘটছে। গত কয়েকদিনে পৃথক ৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২/১৩জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মহাবিপজ্জনক আঁকাবাঁকা ও উঁচুনিচু ইটের এ সড়কে চলাচলকারী একমাত্র যানবাহন হচ্ছে চাঁদের গাড়ি। এসব গাড়িতে ১০ কি.মি পাহাড়িপথ দিয়ে বহন করে মুমুর্ষ রোগীকে গর্জনিয়া বা নাইক্ষ্যংছড়ি সদরে নেয়ার পথেই বেশিরভাগ রোগীর অকালে মৃত্যু ঘটে বলেও জানিয়েছেন স্বজনহারা লোকেরা। মুসলিম অধ্যুষিত এই ইউনিয়নে শ্রমিক বা দিনমজুরি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়াতে জিনিসপত্রের দামও বেশি। কাজকর্ম তেমন নেই। সরকারি পর্যায়ে চলমান কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে অন্য এলাকার শ্রমিককর্মী। ফলে আর্থিক অভাবঅনটন এ অঞ্চলের মানুষকে জিম্মি দশায় রেখেছে।

স্থানীয় গৃহিনী ছবুরা খাতুন, মালেকা বেগম এবং সাইরা বানু বলেন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাাদের অনুপ্রবেশ এবং এখানে অবস্থানের কারণে নামেমাত্র মজুরিতে রোহিঙ্গা নারীপুরুষরা কাজ করায় স্থানীয় শ্রমজীবীরা বিপাকে পড়েছেন। সরকারিসহ বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে প্রতিদিনই চালসহ বিপুল পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করা হলেও স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের বিরাজমান দৈন্যতার বিষয়ে কোন মহলই খবর রাখছে না। রোহিঙ্গারা তাদের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে বিতরণকৃত চালসহ করমারী ত্রাণও স্থানীয়দের দোকানে বিক্রি করে দিচ্ছে। কার্যত দোছড়ি ইউনিয়নের বেশির ভাগ মানুষই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করছেন।

x