নারী দিবস ও বাংলাদেশ

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১০ মার্চ, ২০১৮ at ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ
22

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রীতি রেওয়াজ নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলার প্রধান অন্তরায়। ৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। অসংখ্য নারী ও শিশুর ধর্ষণ, খুনের দায় নিয়ে বিশ্ব নারী দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশের এ অবস্থার পরিবর্তন কখন কীভাবে হবে আমার জানা নেই। একটা জিনিসই শুধু প্রত্যাশা করি সেটা হচ্ছে সুশাসন।

নারী শোষণে বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের কোন পার্থক্য নেই। বুর্জোয়া পুরুষ শুধু সর্বহারা শ্রেণিটাকে শোষণ করে না, শোষণ করে তার নিজের শ্রেণি নারীকেও। আর সর্বহারা পুরুষ শোষিত হয়েও অন্যকে শোষণ করতে দ্বিধা করে না সে শোষণ করে তার নিজের শ্রেণি নারীকে।

হুমায়ুন আজাদ।

সৃষ্টির আদিতে নারী পুরুষের বৈষম্য ছিল না। তারা একে অপরের সহযোগী ও সম্পূরক হিসেবেই ছিল। সম্পত্তিতে যখন ব্যক্তিগত মালিকানার সৃষ্টি হলো তখন থেকে লিঙ্গ বৈষম্যের শুরু। মানুষ যখন গুহাযুগ থেকে কৃষিযোগে উত্তরণ করে তখন জমির উপর পুরুষের একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুধু জমি নয় নারীর উপরও মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে নারী ধীরে ধীরে শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে।

নারী দিবস উপলক্ষে কিছু লেখার আগে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতটা একটু দেখে নেই। আমার দেশ দ্রুত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় উড়াল সেতু হচ্ছে। পদ্মা সেতু হচ্ছে। ফোর লেইন, সিক্স লেইন হচ্ছে মহাসড়ক। গাঁওগেরামে লাল নীল বাত্তি জ্বলছে। মানুষের চলায় বলায় এক কথায় লাইফ স্টাইলে পরিবর্তন এসেছে। অনেকেই গর্ব করে বলে থাকেন খালি গায়ে, খালি পায়ে, খালি পেটের মানুষ এখন বাত্তি দিয়ে খুঁজলেও পাওয়া যাবে না। তা না পাক। যে জায়গাটার পরিবর্তন আসা খুব জরুরি ছিল তা আসেনি। উন্নয়নের জোয়ারে ভাসা এই রাস্তা, এই উড়াল সেতু, এই মহাসড়কজুড়ে চলবে গণপরিবহন আর নারীর জন্য থাকবে ওৎ পাতা নিপীড়ন ধর্ষণ, মৃত্যু।

৮ই মার্চ আমরা নারী দিবস পালন করি। সুন্দর সুন্দর কথা বলি। নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্প বলি। ঠিক ঐ দিনটায় কত মেয়ে তনু রুপার ভাগ্যবরণ করবে তার পরিসংখ্যান আমাদের সামনে নাও আসতে পারে। ধরে নিয়েছি শিশু হোক কিংবা ষাট বছরের বৃদ্ধাই হোক সুযোগ পেলেই শকুন হয়ে উঠে কিছু মানুষ। এক একটা ঘটনার নৃশংসতা আর একটাকে অতিক্রম করছে। অবিশ্বাস্য সব ঘটনা আমরা আর আঁতকে উঠি না। প্রতিনিয়ত প্রকট হয়ে উঠছে ক্ষয়িষ্ণুতার চিহ্ন, ধ্বংসের উৎসবে পাশবিকতার চিৎকার, উল্লাস, মানবিক সমাজ আমরা দাবি করতে পারি না। এ সমাজটাকে আর সমাজ বলা যায়? এই রাষ্ট্রটিকে কি আর রাষ্ট্র বলা যায়? এই মানুষগুলো কি আর মানুষ বলা যায়? রুপা তনুর কথা না হয় বাদ দিলাম। ৯ বছরের ছোট্ট একটা শিশুকে ৮ জন নরপশু মিলে ধর্ষণ করে গলা টিপে মেরে ফেললো। এতই তুচ্ছ মানব শিশুর জীব? পিঁপড়ে তেলে পোকার মত ইচ্ছে হলেই মেরে ফেলা যায়? এই আটটি মানুষের মধ্যে একজনেরও কি মনে আসেনি তাদের সন্তানের মুখ? কিংবা ছোট্ট বোনের চেহেরা এতটা বিকৃতি কীভাবে হয় মানুষের? তারা কি কখনও শিশুমুখের পবিত্রতা দেখেনি। এই অবুঝ ৯ বছরের শিশুটির শরীরে নারীর শরীর খুঁজেছে। চট্টগ্রামের বিশ্ব কলোনীর সেই ছোট্ট মেয়েটার ঘটনার কোন আপডেট আমার জানা নেই। জানা নেই তনু হত্যার কি খবর? বিচার হবে কি হবে না জানা নেই। সাগর রুনি হত্যার বিচারের আপডেট আমার জানা নেই। বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে জন্মদিনের দাওয়াত দিতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ মামলায়ও কোন আপডেট আমার জানা নেই। একটার উপর আর একটা চাপা দিতে পাহাড় বানিয়েছি। আমরা জানি সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনেক কিছুই সম্ভব মাত্র চার সপ্তাহ কর্ম দিবসে রুপা হত্যার বিচার হয়েছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত আমাদের এই বিচার আশাবাদী করে তোলে।

আমাদের সংবিধানে নারীসহ সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের পর্যাপ্ত আইন আছে কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। দুর্নীতিগ্রস্ততার কারণে আইনের প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আইনের গতি আটকে দেওয়া হয়। অপরাধীদের রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হয়।

বাংলাদেশের ৮৯ ভাগ পুরুষই মনে করে স্ত্রী অন্যায় করলে তাকে মারার অধিকার আছে। শুধু স্ত্রী হিসেবে মার খায় না সন্তান হিসেবেও লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয় নারী।

একটা ছেলে শিশুর জন্ম একটি পরিবারে যেই আনন্দ এনে দেয় ঠিক ততটাই বিমর্ষ করে তোলে পরিবারকে একটি মেয়ে শিশুর জন্ম। এখনও এই সময়েও নারী যতই শিক্ষিত উপার্জনক্ষম হোক আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র তাঁকে পরিপূর্ণ মানুষের মর্যাদা দিতে পারে না। একজন নারী জীবনের প্রতিটি স্তরে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হয়। যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে শোষণ বঞ্চনা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়া চিরাচরিত ব্যাপার। নারী হয়ে জন্মানোর খেসারত দিতে হয় তার পুরো জীবন। একজন পুরুষের যা প্রাপ্য তার পরিবারের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে, সমাজের কাছে একজন নারী তা কখনোই ভাবতেও পারে না তারও একই রকম অধিকার রয়েছে।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত রীতি রেওয়াজ নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলার প্রধান অন্তরায়। ৮ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস। অসংখ্য নারী ও শিশুর ধর্ষণ, খুনের দায় নিয়ে বিশ্ব নারী দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশের এ অবস্থার পরিবর্তন কখন কীভাবে হবে আমার জানা নেই। একটা জিনিসই শুধু প্রত্যাশা করি সেটা হচ্ছে সুশাসন।

এই যে নারী দিবস সারা পৃথিবীব্যাপী পালন করছি সেটা অর্জন করতেও শতাধিক বছর কেটে গিয়েছে। ১৮৫৭ থেকে ১৯৮৫। ১৯৫৭ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে সেলাই কারখানার মহিলা শ্রমিকেরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবন ও ১২ ঘণ্টা কর্ম দিবসের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের উপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন ১৮৬০ সালে কারখানার মহিলার শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন এবং সাংগঠনিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯০৮ সালে ৮ই মার্চ সিটিতে মিছিল করে।

১৯১০ সালের ৮ই মার্চ কোপেন হেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মহিলা নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন।

১৯৮৫ সালে ৮ই মার্চকে জাতিসংঘ নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

১৯৯১ সালে নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় “অগ্রগতির মূল কথানারী পুরুষের সমতা” দিয়ে ৮ই মার্চ নারী দিবসের যাত্রা শুরু করে।

নারীর প্রতি সবরকম সহিংসতা বৈষম্য অন্যায় অবিচার অবসান হোক। একটি সুখী সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার কাজে পুরুষের সাথে নারীরও সমান অবদান রাখার পরিবেশ সৃষ্টি হোক এই প্রত্যাশা রাখছি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল নারীদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্যণ্ডউন্নয়নের তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম শহরে, কর্মজীবন ধারা।

x