পর্যটনে অপার সম্ভাবনাময় রামুর কানা রাজার সুড়ঙ্গ

সুনীল বড়ুয়া ।। রামু

সোমবার , ১৪ মে, ২০১৮ at ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
52

আঁধার মানিক,কানা রাজার সুড়ঙ্গ,আবার অনেকে বলেন কানা রাজার গুহা । যে যাই বলুক,স্থানীয়ভাবে এটি কানা রাজার সুড়ঙ্গ নামেই বেশি পরিচিত। পর্যটন শিল্পে অপার সম্ভাবনার আধার এ সুড়ঙ্গটি অবস্থিত কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের উখিয়ারঘোনা এলাকায়।
দীর্ঘদিন এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকলেও রামু উপজেলা প্রশাসনের ঐতিহাসিক এ স্থানটি পুনরুদ্ধারের ঘোষণায় এলাকায় এ গুহা নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ঐতিহাসিক এ গুহাটি নতুন করে খনন করা হলে রামুর উখিয়ার ঘোনায় আঁধার মানিক বা কানা রাজার সুড়ঙ্গকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। পাশাপাশি সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো এ সুড়ঙ্গের আশপাশের পরিবেশ ঢেলে সাজানো হলে এটি হয়ে ওঠবে দেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।
সম্প্রতি রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাং শাজাহান আলী ওই সুড়ঙ্গ পরিদর্শনে যান এবং এ সময় তিনি এটি সংস্কার বা পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে এইসুড়ঙ্গকে নিয়ে আরো বেশি প্রাণ সঞ্চার ঘটে।
ঐতিহাসিক সূত্রমতে, প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে রাজা চিন পিয়ান বা কিংবেরিং এর উদ্বাস্তু জীবনের শেষ সময়কালের আশ্রয়স্থল বা দূর্গ বলে ধারণা করা হত। কথিত আছে,বর্মী সেনা ও বর্মী অনুগত আরাকানিদের উপর অত্যাচার নিপীড়নের কারণে প্রতিপক্ষের সংঘবদ্ধ আক্রমনে পরাজিত হয়ে চিন পিয়ান বৃহত্তর চট্টগ্রামে পালিয়ে এসে আত্মগোপন করেন। তাকে গ্রেফতার করতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী তৎকালীন ৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। এ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষার জন্য চিন পিয়ান পুনরায় আরাকানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সেখানেও বর্মীদের পাল্টা প্রতিরোধের কারণে তিনি রামুর পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেন। এখানে থাকাকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পাহাড়ের গভীরে খনন করা হয় এ গোপন সুড়ঙ্গ। কক্সবাজারের ইতিহাস গ্রন্থ ছাড়াও পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত পাকিস্তান পর্যটন ডিপার্টম্যান্ট টুররিষ্ট গাইড এ রামুর আঁধার মানিক বা কানা রাজার সুড়ঙ্গের কথা লিপিবদ্ধ ছিলো।
স্থানীয় বাসিন্দা ছড়াকার কামাল হোসেন বলেন, আমরা সেই ছোট বেলা থেকে সুড়ঙ্গটির কথা লোকমুখে শুনে আসছি। কিন্তু এটি নিয়ে খুব একটা প্রচার প্রচারণা ছিলোনা। যে কারণে স্থানীয় সাধারণ মানুষেরাও এটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানেনা। সম্প্রতি এটি পরিদর্শনে গিয়ে দেখি ঐতিহাসিক এ স্মৃতিচিহ্ন জঙ্গলে ঢেকে গেছে। সেই সুড়ঙ্গের প্রবেশ মুখও মাটিতে ভরাট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তবে আশার বিষয়,সম্প্রতি আবারও এটি আলোচনায় এসেছে।
প্রাবন্ধিক এম সুলতান আহম্মদ মনিরী জানান, এটি একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। কিন্তু অযত্ন অবহেলায় থাকতে থাকতে এ নিদর্শন মুছে যেতে বসেছে। এমনই ক্রান্তিলগ্নে স্থানীয় একদল তরুণ এ গুহাটিকে নতুন করে আবিষ্কার করলো। এখন এ গুহাকে নিয়ে এলাকার সর্বত্র আলোচনা হচ্ছে। এটি পুনরুদ্ধারের দাবি উঠছে,সংস্কারের কথা হচ্ছে। তিনি বলেন, সেই গুহার ভেতরে ঢুকলে বুঝতে পারবেন না, ভেতরে ঢুকার অনুভূতি কি। আর ঐতিহাসিক এ সুড়ঙ্গ পুণরুদ্ধারের পাশাপাশি এটি হয়ে ওঠবে দেশের আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট।
বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী তানভীর সরওয়ার রানা জানান, কাউয়ারখোপ হাকিম-রকিমা উচ্চ বিদ্যালয়ের রজত জয়ন্তী উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। ওই উৎসবে একটি স্মরনিকাও প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেই স্মরণিকার প্রচ্ছদের জন্য আমার কাছে আসেন ওই এলাকার একদল যুবক । তাদের চাওয়া, স্মরণিকার প্রচ্ছদের জন্য ‘আঁধার মানিকের’ ছবিটি আমি এঁকে দিই।
সেই ছবিটি আঁকার উদ্দেশ্যে আমি গুহা’টি সরেজমিন দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে তারা গত ২৩ মার্চ দূর্গম ওই এলাকায় নিয়ে যায়। সেই আঁধার মানিক বা কানা রাজার সুড়ঙ্গ দেখে সত্যিই আমি বিস্মিত হই। তবে ওই দিনই গুহাটি আমাদের নতুন করে খোঁজে নিতে হয়েছে।
তিনি আরো জানান, এটি কেবল একটি সুড়ঙ্গ নয়। এটি একটি হাজার বছরের ইতিহাস। ঐতিহাসিক পটভূমি ও লোকমুখে জানা তথ্যমতে এটি অনেক দীর্ঘ সুড়ঙ্গ। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ বিশেষ বা কোন প্রতাপশালী রাজার নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা সেনা ক্যাম্পও হতে পারে। তবে এ সুড়ঙ্গটিকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে সব প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তানভীর সরওয়ার রানা।
কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও কক্সবাজার জেলা পরিষদের সদস্য শামসুল আলম জানিয়েছেন, তাঁর গ্রাম থেকে একটু দূরেই কানা রাজার সুড়ঙ্গটি অবস্থিত। ছোট বেলায় বেশ কয়েকবার স্থানীয়দের সাথে ওই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছেন। ওই সময় সুড়ঙ্গটির প্রায় ১০০ ফুট ভিতরে যাওয়া যেত। সেই সুড়ঙ্গের ভিতরে একটি রঙ্গশালা বা মঞ্চ রয়েছে। যাকে অনেকে বিশ্রামাগারও বলে। তবে প্রথমে ঢুকেই দেখা মিলে তিন পথের মোহনা। ডানে-বামে দুটি আর একটি পথ চলে গেছে সোজা সামনের দিকে। তিনি বলেন, এক সময় এখানে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব চলাকালে মায়ানমার সহ আশপাশের রাখাইন ও বৌদ্ধ নারী পুরুষ এ সুড়ঙ্গ দেখতে আসতো। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এটি এখন হারিয়ে যেতে বসেছে।
উখিয়ারঘোনা গ্রামের অমিয় বড়ুয়ার স্ত্রী বানু বালা বড়ুয়ার বয়সও হয়েছে প্রায় ৭০ বছর। বয়োবৃদ্ধ এ নারী জানিয়েছেন, ছোটকালে অনেকবার তিনি ওই সুড়ঙ্গে গেছেন।
অনেকে সেই সুড়ঙ্গে আসতো মূল্যবান সম্পদের খোঁজে। এখনো এখানে অনেক মূল্যবান সম্পদ থাকতে পারে বলে ধারণা করেছেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, রামুর এ ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ব নিদর্শন সংস্কার করা হলে বাড়বে পর্যটনের সম্ভাবনা। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান হতে পারে এটি। রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাং শাজাহান আলী বলেন, রামুর আঁধার মানিক বা কানা রাজার সুড়ঙ্গ অনেক পুরনো ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রত্নতত্ব নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ ও পর্যটন শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে এ সুড়ঙ্গ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে।

x