পাটি বানিয়ে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর

কলাউজানে নারীর সংগ্রাম

মোঃ জামাল উদ্দিন, লোহাগাড়া

সোমবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৮ at ১২:১৫ অপরাহ্ণ
15

লোহাগাড়ার কলাউজান একটি ঐতিহাসিক স্থান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উজ্জ্বল এ ইউনিয়নে প্রতিদিন অপার সম্ভাবনা নিয়ে পূর্ব দিগন্তে সূর্য উদিত হয়, পশ্চিমে অস্ত যায়। ইউনিয়নের মধ্যবর্তী পরিষদ ভবনের আশেপাশে নাথ পাড়ায় হাজারো রমনী পাটি বানিয়ে পারিবারিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত করে চলেছেন। তার স্বপ্ন দেখেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার পরিশ্রমের অন্যতম ফসল। এ বাংলাদেশে সোনালী দিগন্তে। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ সফলতা অর্জন করেছে। জাতির জনকের জন্মদিনে জাতি সংঘ এ দেশকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মর্যাদা দিয়েছে। এ আবেগকে সামনের দিকে প্রসারিত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ প্রতিনিধি গত ৩০ মার্চ সকালে এলাকায় গিয়ে তাদের কর্মযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন। তবে এখানে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের কোন ছোঁয়া লাগেনি। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি ঘন বসতি পূর্ণ। জনপদ একান্নবর্তী পরিবার ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির চতুর্দিকে ঘিঞ্জে বসতিতে পরিণত হয়েছে। কারো রান্নাঘরের সামনে মলমূত্র ত্যাগের ঘর। প্রত্যক্ষ করা যায় উৎকট দুর্গন্ধে রান্নাবান্না হয়। খাওয়াদাওয়া হয়। তবুও তারা মিলেমিশে দিনাতিপাত করেন। শিক্ষাদীক্ষায় তারা তেমন অগ্রসর হতে পারেনি। পুরুষরা দিনমজুর, প্রান্তিক চাষী, কৌরকর্ম, পাহাড় থেকে লাকড়ি আহরণ কিংবা দিনমজুরী করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের রোজগারে সংসার চলেনা বলে বৌঝি’রা পাটি বানান। এতে সংসারে দু’পয়সা আয় হয়। অর্থনৈতিক সাশ্রয় হয়। এলাকার সাবেক মেম্বার রনধীর দেব নাথ জানিয়েছেন, দক্ষিণ নাথ পাড়া, উত্তর নাথ পাড়া, পশ্চিম নাথ পাড়ায় অনধিক ৫শ পরিবারের অনেক বিধবা কিংবা গৃহবধূ অথবা স্বামী পরিত্যক্তা মহিলারা এ কাজে নিয়োজিত। স্থানীয়ভাবে পাটি বুননের কাঁচামাল পাটি বেত (ঝাং) পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে একটি পাটি বানাতে কমপক্ষে ৫শ টাকার মতো খরচ হয়। তার মধ্যে পারিশ্রমিকও রয়েছে। একটি পাটি বুনতে ৪৫ দিন অতিবাহিত হয়। পাটি বুননের পাশাপাশি নারীরা অন্যান্য ঘরকান্নার কাজ করেন। অনেকে টাকা জমিয়ে গরুছাগল ও হাঁসমুরগি পালন করেন। সমন্বিত ব্যবস্থায় সরকারিভাবে কোন সহযোগিতা তারা পাননি বলে জানিয়েছেন। তবে কয়েকটি এনজিও থেকে কড়া সুদে কর্জ গ্রহণ করেছেন। একটি পাটি খুচরা দামে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে প্রান্তিক এসব উৎপাদকরা কম টাকা পান। এমন অভিযোগ এন্তার। বর্তমানে প্লাস্টিকের পাটিতে বাজার সয়লাব। কম দামে এসব পাটি পাওয়া যায় বলে ভোক্তারা প্লাস্টিকের পাটির প্রতি ঝুঁকে পড়েন। চট্টগ্রাম জেলার বাইরে থেকে অনেকে এসব পাটি ফেরি করে বিক্রি করে। ফলে প্রতিযোগিতায় কলাউজানের নারীরা টিকে থাকতে পারেন না বলে তারা জানিয়েছেন। তবে তারা হাল ছাড়ার পাত্র নন। তাদের মতে বাপদাদার এ পেশা তারা ছাড়তে নারাজ। আগেরকার দিনে গ্রামীণ জনপদে পাটির কদর ছিল। গ্রামবাসীরা পাটিতে বসে বিশ্রাম নিতেন, রাত কাটাতেন। কালের প্রবাহে তা অতীত হয়ে গেছে। কলাউজানের উৎপাদিত পাটি বিদেশেও রপ্তানী হয় বলে বিধবা সারদা দেবী জানান। তিনি বলেছেন, প্রতি সপ্তাহে চট্টগ্রাম, চকরিয়া, কক্সবাজারের পাইকাররা কলাউজানে এসে পাটি কিনে নিয়ে যান। বিভিন্ন মেলা কিংবা পূজাপার্বনে কলাউজানের পাটির কদর আলাদা। দরবেশহাট, লোহাগাড়া বটতলী, আধুনগর বাজার, পুটিবিলা এমচরহাটে এসব পাটি কেনাবেচা হয় বলে জানা গেছে। সারদা দেবী আরো জানালেন, আগেরকার দিনে বিয়ে শাদীতে কলাউজানের পাটি ব্যবহৃত হত। নাপিতরা বরের চুল কাটার সময় পাটিতে বসে আয়েশ করতেন। আত্মীয়স্বজনরা পাটিতে বসা নাপিতকে বকশীস দিতেন। এ যেন সোনালী অতীতের সাথে কলাউজানের পাটির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। জানা যায়, লোহাগাড়ার বড়হাতিয়া জগতের পাড়া, মহাজন পাড়া, পুটিবিলা নাথপাড়া প্রভৃতি স্থানে এখনো অসংখ্য পাটি বুনন মহিলা কারিগর রয়েছে। তাদের দুটি হাত পারিবারিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ মজবুত করছে। তাদেরকে সমন্বিত উপায়ে সময় কাটতে একত্রিত করে যদি এ শিল্পের প্রসার ঘটানো যায় তাহলে আগামী দিনে উন্নয়নশীল বাংলাদেশের বাতিঘরে নতুন আলোর, নতুন রেখা ছড়িয়ে পড়বে। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। এমনটাই মন্তব্য করলেন এলাকাবাসী।

x