পান চাষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সময়ের দাবী

কেশব কুমার বড়ুয়া, হাটহাজারী

সোমবার , ২৩ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:৫৩ পূর্বাহ্ণ
9

পান এক জাতীয় ভেষজ ঔষধ। পানের বহুবিধ গুন রয়েছে। পান মানুষের হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। মুখের রুচি আনে। এক সময় দেশের কবিরাজগণ পানের রসকে ঔষধের উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করত। বাড়িতে অতিথি আসলে খাওয়ার পর পান না দিলে তারা এইটা নিয়ে সমালোচনা করে। ছেলে বা মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার সময় নাস্তার সাথে পান নিয়ে যাওয়া সমাজের রেওয়াজ। বিয়ে বাড়িতে বরযাত্রীদের খাওয়ার পর পান দেওয়ার রেওয়াজ ও রয়েছে। ইদানিং অবশ্য ডিজিটাল বিয়েতে বিশেষ করে কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের অনুষ্ঠানে ক্ষেত্র বিশেষে আপ্যায়নের পর পান দেওয়ার রেওয়াজ কিছুটা কমে এসেছে। আগেরকার দিনে এক সমাজের পক্ষ থেকে অন্য সমাজকে নিমন্ত্রণ করার সময় সমাজের সর্দার/ মুরিব্বীকে পানের বিড়া না দিলে তারা নিমন্ত্রণ নিত না। এক বিড়া সমান ১৮/২০ গন্ডা)। আবার মেয়ের জামাইকে কোন অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করতে গেলে পানের বিড়া দিয়ে নিমন্ত্রণ করার ও প্রচলন ছিল। তাছাড়া কোন অনুষ্ঠানে জমিদার বাড়ির কর্তাকে নিমন্ত্রণ করতে গেলে পানের বিড়া বা পান হাতে দেখলেই ধারণা করা হত নিমন্ত্রণ দিতে এসেছে। পানের বিড়া দিয়ে নিমন্ত্রণ করা একটা সম্মানের ব্যাপার। তবে কবে নাগাদ এ প্রথা প্রচলিত হয়েছে তার কোন সুনির্দিষ্ট সময় জানা নেই।

পানের প্রচলন শুরুর পূর্বে পান চাষাবাদের প্রয়োজন সর্ব প্রথম। কারণ চাষাবাদ না করলে পান কোথায় পাবে। পান কৃষকদের উৎপাদিত একটি কৃষিজ পন্য। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানের মত হাটহাজারীতে ও পানের চাষাবাদ হয়ে থাকে। বিশেষ করে উপজেলা সদরের পৌরসভার পশ্চিম দেওয়াননগর ও ধলই ইউনিয়নের পশ্চিম ধলই এলাকায় পানের চাষাবাদ হয়। এসব জায়গা ছাড়া ও উপজেলার আওতাধীন চট্টগ্রামনাজিরহাট মহাসড়কের পশ্চিম পার্শ্বে অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে পান চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। সেচ ব্যবস্থার যেখানে সুবিধা রয়েছে বিশেষ করে শুস্ক ও শীত মৌসুমে পান ক্ষেতে সেচ দিতে হয়। তাই যেসব জায়গায় খাল ও ছরায় পানি থাকে সেখানে পান চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। একবার জমিতে পানের লতা রোপণ করলে মাটি ভেদে ৩ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত ফলন হয় বলে জানান পশ্চিম দেওয়ান নগর এলাকার পানচাষী সুমন দে উত্তম ও নারায়ন দে। এই দুইজন সহ এলাকা প্রায় ১০ পরিবার পান চাষ করে তাদের পরিবার পরিজন পরিচালনা করে থাকে। তাছাড়া এলাকার অনেকেই এ ব্যবসার সাথে জড়িত।

সরোজমিনে পশ্চিম দেওয়ান নগর এলাকার পান ক্ষেত পরিদর্শন করে উল্লেখিত দুই পানচাষীর সাথে কথা বলে জানা যায়, পান চাষ করতে বাঁশের কঞ্চি, শন অতি প্রয়োজনীয় উপকরণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলার পশ্চিমের পাহাড়ে শনের আবাদ নেই বললেই চলে। তাই দুর এলাকা থেকে পান চাষের জন্য শন সংগ্রহ করতে হয়। একই সাথে পাহাড় উজাড় হয়ে যাওয়ায় পাহাড়ের বাঁশ উজাড় হয়ে গেছে। পান ক্ষেত অত্যন্ত একটি পবিত্র ক্ষেত। এখানে যে কেউ প্রবেশ করতে পারে না। ক্ষেতের পরিচর্যা করতে প্রবেশ করার সময় তাকে পবিত্র হয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। একটি পান গাছের লতায় বছরে ৪ শ পান উৎপন্ন হয়। পান ক্ষেতের মধ্যে পর্যাপ্ত রাসায়নিক ও জৈব সার দিতে হয়। শীত ও শুস্ক মৌসুমে পানের আবাদ একটু কম হয়। এলাকার পান ক্ষেতে কাজ করে প্রায় ৩০ টি পরিবারের সংসার চলে । অতিবৃষ্টি ও পান ক্ষেতের জন্য ক্ষতিকর। শীত ও শুস্ক মৌসুমে পানের উৎপাদন কম হয় বলে দাম একটু চড়া থাকে। তবে বর্ষা মৌসুমে পানের মূল্য একটু কম থাকে। পশ্চিম দেওয়ান নগর ও পশ্চিম ধলই এলাকায় যে পাড়ার লোকজন পান চাষাবাদের সাথে জড়িত সে পাড়া বাড়ই পাড়া হিসাবে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিত। এক সময় এই দুই জায়গার লোকজন ব্যাপক হারে পান চাষাবাদের সাথে জড়িত ছিল। এলাকার লোকজন শিক্ষিত হওয়ায় অনেকেই এখন নানা চাকরিবাকরি, ব্যবসা বাণিজ্য ও মধ্য প্রাচ্যে অবস্থানের কারণে পানের চাষাবাদ ছেড়ে দিয়েছে। হাটহাজারীতে যে পরিমাণ পান উৎপন্ন হয় সেগুলো দিয়ে এলাকার মানুষের চাহিদা পূরণ হয়না। তাই মানুষের প্রয়োজন মিঠাতে কক্সবাজার, উখিয়া, মহেশখালী ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এনে এ উপজেলার মানুষের চাহিদা পূরণ করতে হয়। হাটহাজারী বাসস্টেশন এলাকায় এক সময় পানের আড়তের জমজমাট ব্যবসা ছিল। ইদানিং নানা কারণে এ ব্যবসায় একটু ভাটা পড়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ফেলে হাটহাজারীর বিভিন্ন স্থানে পান চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে এলাকার মানুষের পানের চাহিদা পূরণ করে অন্যত্র পান সবরাহ করা যাবে।

x