পাহাড়িয়া কথন

জান্নাতুল ঊর্মি

মঙ্গলবার , ১৫ মে, ২০১৮ at ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
63

আজ বলব ভ্রমণের গল্প। প্রাকৃতিক নৈসর্গের তীর্থস্থান দার্জিলিং। ছায়াঘেরা বনের পাথুরে পথে হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের অপার সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো। ট্রেকিংর জন্য দার্জিলিংর বিভিন্ন পাহাড়গুলো ট্রেকারদের বিশেষ পছন্দের। দার্জিলিং এর ‘মানেভঞ্জন’ থেকে ‘সান্দাকফু’ পর্যন্ত ট্রেকিং রুট সহ রোড রুটও রয়েছে। পাহাড়ের খাঁজে গড়ে ওঠা রাস্তাগুলো যেন মায়াময় কোনো জগতে পৌঁছে দেয় পথিককে। মেঘের লুকোচুরি খেলায় আলোআঁধারি রহস্যে পুরো পাহাড় যেন মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে যায় চোখের সামনে। এএক অদ্ভুত পাহাড়ি মায়া।

আমরা ক’জন বন্ধু মিলে ‘টুংলু’ পর্যন্ত গিয়েছিলাম ট্রেকিং করতে। শিলিগুড়ি থেকে মানেভঞ্জনের দূরত্ব প্রায় ৭৭ কিমি। ট্রেকটা মূলত শুরু হয়েছিলো মানেভঞ্জন থেকেই। ল্যান্ডরোভার থেকে নেমে দেখলাম একটা রাস্তা নেমে গেছে ’ধুত্রের’ দিকে আর একটা খাড়াই রাস্তা উঠে গেছে ‘চিত্রের’ দিকে। রুকসেকটা পিঠে নিয়ে আমরা ট্রেক শুরু করলাম সোজা উপরের দিকে। গন্তব্য ‘চিত্রে’। পিচ ঢালা রাস্তা বেয়ে যত উপরের দিকে উঠছি পাহাড়ের রূপ যেন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে দেখা পাওয়া যাচ্ছে পাইন, বির্চ, রডোডেন্ড্রনের। মাঝেমধ্যেই বনের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট পাথুরে রাস্তা দেখতে পাওয়া যায়। এই রাস্তাগুলো মূলত ট্রেকিং রুট। ট্রেকাররা সাধারণত এই রাস্তাগুলোই বেছে নেয়। আমরাও তার ব্যতিক্রম হলাম না। আলোআঁধারির মায়ায় ঘেরা বনপথে হাঁটতে হাঁটতে কত যে নাম না জানা পাখি, ফুল আর গাছ দেখেছিলাম।

চিত্রের রুটটা বেশ বেশ খাড়াই। মানেভঞ্জন থেকে চিত্রের দুরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার। একেকটা বাঁক নিয়ে যতই উপরে উঠছি হাঁপিয়ে যেন প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চিত্রের দেখা আর মিলছে না। কিছুদূর পরপর ট্রেকারদের বসার জন্য পাথর কিংবা বাঁশ দিয়ে তৈরি বেঞ্চ রয়েছে। কিছুসময় পরপরই আমরা বিশ্রাম নিচ্ছিলাম আর সেই সাথে গান। সাথে গিটার থাকায় গানে যেন একরাশ অলংকার যুক্ত হলো। নিঃশ্চুপ পাহাড় বিদীর্ণ করে আমাদের গান পৌঁছে দিলাম মেঘ পিওনের কাছে।

বনের গন্ধ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখলাম কোথা থেকে যেন একরাশ মেঘ আমাদের ঘিরে ধরল। সে এক অন্য অনুভূতি। এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কাউকেও দেখতে পাচ্ছি না। হিম করা এক অনুভূতিতে ছেয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই ফিক করে সূর্যটা হাসি দিলে আবার সব কিছু স্পষ্ট হল। আরেকটা বাঁক নিতেই দেখতে পেলাম একটা মন্দিরের চূঁড়ো। খুশিতে আমাদের লাফাতে ইচ্ছে করল। প্রায় পৌঁছে গেছি। কারণ আগে থেকেই জানতাম চিত্রেতে একটা বেশ বড় বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে।

তখন প্রায় বিকেল। চিত্রেতে পৌঁছে দেখলাম ঘাসের বিছানায় লাল নীল রঙের তাঁবু। আর অল্প কিছু বাঁশের তৈরি ঘর। অনেকই এসেছে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে। ঘাসের বিছানায় একেকজন শুয়ে পড়ে পথের ক্লান্তি কিছুটা দূর করলাম। আমাদের জন্য ওই বাঁশের রুমগুলো বুক করা ছিলো। ঘরে ঢুকে দেখলাম দু’দিকে দুটো বিশাল জানালা। জানালা খুললেই দেখা যায় বিশাল পাহাড় আর মেঘের রাজত্ব। মনে পড়ল অঞ্জন দন্ডের সেই গানটা -‘জানালা আমার পুব না পশ্চিমের দিকে খোলা, জানালা সে তো নিজেও জানে না।’

একটু ফ্রেশ হয়েই ছুটলাম উঁচুনিচু সেই ছোট্ট ঘাসের মাঠটায়। দিনের আলো আস্তে আস্তে নিভে যাচ্ছে আর নিচের দিকে গভীর খাঁদের মধ্যে লাল নীল অপরুপ বাতি জ্বলতে শুরু করেছে। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম ওই হ্যামলেটের নাম দার্জিলিং। পাহাড়ের ছোট ছোট গ্রামগুলোকে বলা হয় হ্যামলেট।

রাত বাড়ছে আর সেই সাথে শরীর হিম করা শীতল বাতাস। বাড়ির মালিক খাওয়ার তাড়া দিলে ভেতরে পৌঁছে দেখলাম টেবিল ভর্তি নানান খাবার। মেনু ছিলো আগুন গরম ভাত, ডাল, ডিমের কারী আর সেই সাথে ভীষণ নরম ছোট ছোট এক প্রকার রুটি। যা দেখতে অনেকটাই তন্দুরের মতো কিন্তু খেতে একেবারেই অন্যরকম। বাঁশের তৈরি বেশ উঁচু গ্লাসে একপ্রকার পানীয় ছিলো, যার স্থানীয় নাম থুম্বা। থুম্বা তৈরি হয় সর্ষেদানা থেকে। খাওয়া শেষে আবার একপ্রস্ত গানবাজনা হলো।

পাহাড়ে ভোরের আলো ফুটে খুব তাড়াতাড়ি। গায়ে সোয়েটারটা জড়িয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে ভেজা ঘাসে পা ফেলতেই মনটা আনন্দে ভরে উঠল। পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়াতে সেগুলো যেন ঝিকিমিকি আলো ছড়াচ্ছে। মেঘের আনাগোনা বেশি থাকায় কাঞ্চনজংঘা দেখতে পেলাম না। নাহ, আর দেরি করা যাবে না। এবার বেরিয়ে পড়তে হবে টুংলুর উদ্দেশ্যে। আজ যে করেই হোক পেরুতে হবে ৯ কিলোমিটার।

”The world is a book and those who don’t travel read only a page”

Saint Augustine

অগাস্টিনের কথাটার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারতাম না, যদি ঘর ছেড়ে পাহাড়ের টানে বেড়িয়ে না পড়তাম। মাথার উপরে বাধাহীন ঘন নীল আকাশ আর শরীরে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ সাথে নিয়ে আমাদের পথ চলা। চিত্রেতে ভোরবেলায় যদিওবা একটুখানি সুর্যের দেখা মিলেছিলো এখন তাও নেই। শ্বেতশুভ্র মেঘের মাঝ থেকে রাস্তা হাতড়ে ফিরছিলাম যেন আমরা। বেশ অনেকখানি উপরে ওঠার পর তালাবন্ধ এক ঘর দেখতে পেলাম। এখানে আদৌ কেউ থাকে কিনা বোঝা গেল না। সামনে পাতা বেঞ্চিতে বসে ঐশিক ভাই গিটারে সুমনের একটা গান ধরলেন-‘প্রথম আলোয় ফেরা, আঁধার পেরিয়ে এসে আমি।’ ঠিক যেন আমাদের মনের কথা। একটু বিশ্রামের পর আবার হাঁটা শুরু হলো।

চিত্রে থেকে টুংলু পৌঁছানোর রাস্তাটা একটু আলাদা। পিচ ঢালা পথ মাড়িয়ে মাঝেমধ্যেই দেখা মিলছিলো সরু সরু পাথুরে পথ। যেগুলো আসলে ট্রেকিংর জন্যই তৈরি। আমরাও পায়ে চলা এসব পথই বেছে নিয়েছিলাম। একটু হাঁটা আবার খানিকক্ষণ বিশ্রাম এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম। প্রায় ৪ কিলোমিটার উপরে উঠে পৌঁছালাম ‘লামেধুরা’ নামে একটা জায়গায়। যেটা নেপাল আর ইন্ডিয়ার বর্ডারে অবস্থিত। ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত লেগেছিল। লামেধুরায় যে দোকানটায় বসে চা খাচ্ছিলাম সেটা ছিলো নেপালে আর ঠিক পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা উঠে গেছে টুংলুর দিকে সেটা ইন্ডিয়ায়। সীমানা অতিক্রমে সেখানে কোন পাসপোর্ট লাগে না।

চা খেয়ে রুকসেকটা আবার কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটতে লাগলাম। ইতোমধ্যে দুপুর হব হব করছে। কিন্তু সেই সাথে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। একেকটা বাঁক পেরুচ্ছি আর মুগ্ধ চোখে পাহাড়ের সবুজ সৌন্দর্য উপভোগ করছি। প্রকৃতির কি অপরূপ খেলা। একটার পর একটা পাহাড় যেন ছবির মতো সাজানো। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সাজিয়ে রাখা সবুজ দিগন্ত। গুণে শেষ করা যাবে না।

লামেধুরা থেকে প্রায় ২ কিমি উপরে ’মেঘমা’। এখান থেকে একটা রাস্তা উঠে গেছে টুমলিং র দিকে আরেকটা গেছে টুংলুর পথে। মেঘমাতে সাধারণত পাসপোর্ট, আইডি কার্ড চেকিং হয়ে থাকে। আর আপনি যদি বিদেশি হয়ে থাকেন তবে প্রয়োজনীয় তথ্য সব লিপিবদ্ধ করে রাখবে বিএসএফ। ইতোমধ্যে এত চড়াই পেরুনোর কারণে আমরা সবাই বেশ ক্ষুধার্ত। হালকা নাস্তা করে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে হোটেল থেকে বাইরে তাকাতে দেখতে পেলাম কিছু গ্রীণ হাউজ। তুলনামুলকভাবে চিত্রের চেয়ে মেঘমায় ঠাণ্ডা বেশি। তাই একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ধরে রাখতে ফসলের চাষ হয় গ্রীণ হাউজে।

প্রায় বিকেল হতে চলল। পাহাড়ে খুব জলদিই রাত নেমে যায়। ছ’টার মধ্যে টুংলু পৌঁছাতে না পারলে রাস্তা ভুলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই আর অবসাদকে পাত্তা না দিয়ে আমাদের পথ চলা আবার শুরু হলো। হাঁটতে শুরু করতেই মেঘমা যেন এক লহমায় অদৃশ্য হলো মেঘের আড়ালে। মেঘমা থেকে টুংলু পর্যন্ত রাস্তাটা অনেক খাড়া। একেকজন প্রায়ই হাঁপিয়ে যাচ্ছি। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হলে যে যার ব্যাগ থেকে রেইনকোট বের করে গায়ে চড়ালো। পাহাড়ে বৃষ্টিও অদ্ভুত। আমরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজেছি তার ঠিক কয়েক গজ পরেই মাটিটা শুকনো। অর্থাৎ ওখানে বৃষ্টি হয় নি। প্রায় সন্ধ্যে নাগাদ পৌঁছালাম টুংলুতে। ১৩ জন বন্ধুবান্ধবের মধ্যে প্রায় সকলেই এই প্রথম ট্রেকিং করেছি। সকলেই খুব ক্লান্ত। সরকারী রেস্ট হাউজে রুম আগে থেকেই বুক করা ছিল। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে একটু খাবার মুখে দিতেই ক্লান্তিতে সবার চোখ বুজে এলো।

ভোরে ঘুমের মাঝেই শুনতে পেলাম আমাদের এক বন্ধু কোয়েল চিৎকার করে বলছে কাঞ্চনজংঘা দেখা যাচ্ছে। ঐ একটা শব্দ ‘কাঞ্চনজংঘা’ কেমন যেন মন্ত্রের মতো কাজ করল। এত ঠান্ডাতেও কম্বল থেকে শরীরটাকে বের করে সবাই দৌঁড় দিলাম বাইরে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য! আকাশ পরিষ্কার থাকায় পুরো রেঞ্জটা দেখতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল নীল আর সাদা মেঘের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে কাঞ্চনজংঘা। যেন এখনই সাঁতরে গিয়ে ধরে ফেলতে পারব। নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না যে এতটাই সুন্দর কাঞ্চনজংঘা।

সকালের চা হাতে নিয়ে হোটেলের সামনে বসে বসে মেঘের সমুদ্রে কাঞ্চনজংঘার হাবুডুবু খাওয়া দেখছিলাম। রোদটা একটু চড়তেই আমাদের দলের সোহাম এসে বলল এবার তো টুমলিং রওনা দিতে হয়। আজ বেশ রিল্যাক্সে আছি আমরা। মাত্র দুই কিলোমিটার নিচে অবস্থিত টুমলিং। টুমলিং ঘুরে এসে আবার টুংলুতেই রাত কাটাবো। তাই পিঠে রুকসেক না থাকায় মহা আনন্দে মাত্র আধ ঘণ্টায় আমরা টুমলিং পৌঁছলাম। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা ছোট্ট হ্যামলেট হচ্ছে টুমলিং। মাত্র সাত আটটা পরিবারের বাস এখানে। পাহাড়িরা বেশ অতিথি বৎসল হয়ে থাকে। গতবার সান্ডাকফু যাওয়ার পথে টুমলিংএ হোটেলের মালিক এক দিদির সাথে পরিচয় হয়েছিলো। আমাকে দেখে চিনতে পেরেই উনি জড়িয়ে ধরলেন। আহ্‌ দেশ থেকে এত দূরে এসে বাড়ির মতো আতিথেয়তা পেতে কার না ভালো লাগে!

উৎরাই পেরিয়ে একটু নিচের দিকে নরম ঘাসের উপর বসেছিলাম আমরা। সেখান থেকে আরো অসংখ্য সবুজ পাহাড়গুলো খুব ভালোভাবে দেখা যায়। মাঝেমধ্যেই একরাশ মেঘ এসে আমাদের নিয়ে লুটোপুটি খেলছিলো। এর মধ্যেই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে সবাইকে হোটেলের দিকে ছুটতে হলো। দুপুরের খাবারটা সেরে নিতে নিতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। এবার তাড়াতাড়ি রওনা দেওয়া দরকার। নয়তো অন্ধকারে টুংলুর রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে না। টিপটিপ বৃষ্টিতেই কয়েকটা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমরা ১৩ জন রওনা দিলাম। পাহাড়ি রাস্তায় নামাটা খুব সহজ। কিন্তু এবার তো উঠতে হবে! তারওপর বৃষ্টিতে রাস্তা বেশ পিচ্ছিল। তাই খুব আস্তে ধীরে অনেক সময় নিয়ে উঠছিলাম। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর টুংলু পৌঁছলাম। কিন্তু পৌঁছে ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করার পরও আমাদের দলের তন্ময়, দোয়েল, প্রতীক, সুমিত,শান্তনু, বিশ্বজিত এরা পৌঁছালো না। সকলেই বেশ উদ্বিগ্ন। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে যারা পৌঁছে গেছিলো টুংলু তারা সকলে মিলে ওদের খুঁজতে বেরুলো। অনেকটা সময় পর সকলে ফিরল বৃষ্টিতে ভিজে, গায়ে কাদা মাখিয়ে। পরে তন্ময়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম যে পথে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় টুংলু তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য ওরা শর্টকাট রাস্তা ধরেছিলো। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় এবং সেই সাথে মেঘের কারণে ওরা পথ ভুলে অন্যরাস্তায় চলে গিয়েছিলো। যাই হোক সবাই সুস্থ থেকে ফিরতে পেরেছে এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি।

রাতটা কোনমতে কাটিয়ে আমরা পরদিন ভোরে ট্রেকিং করে নামতে শুরু করলাম ধোত্রের উদ্দেশ্যে। দুরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। যেহেতু নামছি তাই তেমন কোনো কষ্ট হচ্ছে না। আনন্দে চারপাশের প্রকৃতি উপভোগ করছি আর গান গাইতে গাইতে নামছি আমরা। রাস্তাটা আগের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে থাকায় একটু সাবধানে নামতে হচ্ছিল। ছোট ছোট কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে নামছিলাম। ট্রেকারদের জন্য পায়ে চলার সরু সরু পথে হাঁটছিলাম আর মাঝেমধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম পাহাড়ি বনের আশ্চর্য মায়া দেখে। কত শত নাম না জানা ফুল ফুটে আছে রাস্তার দু’ধারে। বেশ কিছুদূর রাস্তা নেমে পেছন ফিরে চাইতেই টুংলুকে দেখে মনে হল যেন আকাশ ছুঁয়ে আছে। পথে যেতে একটা মন্দির পড়ল, তাতে নেপালি ভাষায় কোনো মন্ত্র লেখা রয়েছে। সবাই সম্মানের সাথে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটলাম। প্রায় চার কিলোমিটার নামার পর ঘন জঙ্গলে ট্রেকারদের বসার জন্য একটা বড় বেদী পেলাম আমরা। বেশ কিছুক্ষণ বসে অনেক ছবিটবি তুলে আবার ট্রেকিং শুরু করলাম। প্রায় তিনঘণ্টা পর আমরা পৌঁছালাম আমাদের শেষ গন্তব্য ধোত্রেতে।

ধোত্রে টুংলু কিংবা টুমলিংর থেকে একটু বড় হ্যামলেট। সিঙ্গালীলা ফরেস্টের কাছাকাছি। আগে থেকে রুম বুকিং না থাকায় আমাদের থাকার জন্য হোটেল খুঁজতে হয়েছিলো। বেশ খোঁজাখুঁজির পর একটা পছন্দসই হোমস্টে পেয়ে গেলাম আমরা। তিনতলায় বেশ বড়সড় দুটি ঘর, ছোট্ট একটা জানালা খুললেই পুরো আকাশটা যেন আমার। বীফ এবং চিকেন দিয়ে বানানো অনেক মজার পাহাড়ি ‘মোমো’ খেলাম পেট পুরে। প্রায় বিকেল হতে চলল। আজকেই আমাদের ট্রিপের শেষ দিন। কবির আর তন্ময়কে নিয়ে বেরুলাম ছবির মতো সুন্দর ছোট্ট শহরটাকে দেখতে। হাঁটতে হাঁটতে শহরের শেষ মাথায় পৌঁছে দেখলাম একটা সরু রাস্তা গিয়েছে ফরেস্টের দিকে। দু’ধারে বিশাল বিশাল পাইন গাছ। নানা নাম না জানা পাখির ডাক আর ভেজা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা যেন হারিয়ে গেলাম কল্পনার কোন মায়াবী জগতে। তারপর হঠাৎ টিপটিপ বৃষ্টি নামল। ঘন জঙ্গলে বৃষ্টি দেখে মনে পড়ল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই কবিতাটা -’ বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস, এখানে মেঘ গাভীর মতো চড়ে;পরাঙ্মুখ সবুজ নালী ঘাস, দুয়ারে চেপে ধরে।’

হোটেলে ফেরার পথে দেখা হলো আমাদের দলের রক্তিমা আর অর্ণবের সাথে। সবারই বেশ মন খারাপ কাল এই মায়াবী পাহাড় ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে। সন্ধ্যায় ধোত্রের সব থেকে উঁচু মন্দিরে বসে দেখছিলাম সান্ডাকফু পাহাড়ের আড়ালে রহস্যময় আভা ছড়িয়ে সূর্যদেবের বিদায়ক্ষণ। হোটেলে ফিরে আবার গান নিয়ে বসা হল। নিশ্চুপ শহরে গিটারের টংকার মনকে আবেশে ভরিয়ে দিলো। এবার ফেরার পালা। যদিও মনটা কিছুতেই চাইছিল না আবার শহুরে জীবনে ফিরে ফিরে আসতে! পাহাড়ের টানে ঘরছাড়া আমরা ক’জন উদাসী মনে মনে বারতা নিয়ে ফিরলাম যেবারবার ফিরে ফিরে আসব মায়াময় এই পাহাড়ের কোলে।

x