পাহাড়ে বিলুপ্তির পথে অধিকাংশ বন্যপ্রাণী

আজ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস

সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

শনিবার , ৩ মার্চ, ২০১৮ at ৭:১১ পূর্বাহ্ণ
25

গভীর অগভীর অরণ্য নিয়েই বিস্তৃত পার্বত্য চট্টগ্রাম। বৃহত্তর সবুজ অরণ্যভূমিজুড়ে নানা প্রজাতির প্রাণীকূলের বিচরণ ছিল। অতীতে বাঘ, ভাল্লুক, সাম্বার হরিণ, হাতি, বন মোরগ, শিয়াল, গুইসাপসহ নানা প্রজাতি পাখি ও সরিসৃপ প্রাণীর আবাসস্থল ছিল পাহাড় বেষ্টিত এই অঞ্চল। ক্রমাগত বন উছাড়, বৃক্ষ কর্তন এবং জুমের আবাদ জন্য পাহাড় পুড়িয়ে ন্যাড়া করায় বাস্তুসংস্থান হারাচ্ছে বনের প্রাণীকূল। পার্বত্য অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোও প্রায় প্রাণীশূন্য। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। আজ বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। বণ্যপ্রাণী রক্ষা, সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হয়। বণ্যপ্রাণী বিলুপ্তির জন্য কেবল বনাঞ্চল ধ্বংসই দায়ী নয়। বন্যপ্রাণীর চড়া বাজার মূল্য এবং মানুষের খাদ্য তালিকায় থাকার কারণে দিন দিন বিলুপ্তের পথে হরিণ, বন মোরগ, সজারু, বন্য শুকুরসহ বিভিন্ন পশু পাখি। প্রকাশ্যে শিকার ও বণ্য প্রাণী বিপণন চললেও প্রশাসন নিশ্চুপ। শিকারিদের উৎপাতের কারণে আশংকাজনকভাবে খাগড়াছড়িসহ তিন পার্বত্য অঞ্চল বণ্যপ্রাণীর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে মানুষের খাদ্য তালিকায় থাকা বন্য প্রাণীগুলো শিকার করছে শিকারিরা। বর্তমানে বনে সজারু, হরিণ, বন মোরগ, বন্য শুকুর টিকে থাকলেও অন্যান্য প্রাণী প্রায় বিলুপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

শিকারিরা জঙ্গলে ফাঁদ ফেলে বনমোরগ শিকার করছে। পাহাড়ের স্থানীয় বাজারে শিকার করা প্রতিটি বনমোরগ বিক্রি করা হয় ১২০০২০০০ টাকা দামে। হাটে বনমোরগ কিংবা হরিণ বিপণন করলেও শিকারিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না। বন বিভাগের কোন নজরদারি না থাকায় এভাবে হাটে বেচাকেনা হয়। খাগড়াছড়ির শহরের মধুপুর বাজার, স্বনির্ভর, মাটিরাঙ্গা, দিঘীনালাসহ বিভিন্ন হাটে প্রকাশ্যে চলে বন্যপ্রাণী ও বন্যপ্রাণীর মাংস বিক্রি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা জানান, ‘কাচালং রিজার্ভ ফরেস্টসহ বিভিন্ন বন থেকে হরিণ শিকার করা হয়। প্রতি কেজি হরিণ ৭০০৮০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। প্রায় প্রতি মাসেই হরিণ শিকার করা হয়। সাধারণত ফাঁদ দিয়ে এবং বন্দুক দিয়ে হরিণ হত্যা করা হয়। চলাচলকারী রাস্তায় ফাঁদ পেতে রাখে শিকারিরা, হরিণ ফাঁদে আটকে পরার পর হত্যা করে বাজারে বিক্রি করে। শিকারিদের সাথে অনেক হোটেল বা ব্যক্তির যোগাযোগ থাকায় গোপনেও হরিণের মাংস বিপণন চলে। হরিণের মাংস ছাড়াও হরিণের চামড়া চড়া দামে বিক্রি হয়। অতীতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গৃহপালিত পশু না থাকায় প্রাণীজ আমিষের অভাব পূরণ করার জন্য হরিণসহ বিভিন্ন বণ্য প্রাণী শিকার করা হত। বর্তমানে বাজারের সাথে স্থানীয়দের যোগাযোগ স্থাপিত হ্‌ওয়ায় হরিণ শিকার করে তা মূলত বাজারে বিক্রি করা হয়। আবার অনেকে শিকার করাকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে।

হরিণ শিকারের পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় সবচেয়ে বেশি শিকার হয় বন মোরগ। অনেক সময় বিষ টোপ দিয়ে হত্যা করায় বনমোরগের পুরো ঝাঁকই মারা যায়। শিকারি রবিউল বলেন, সপ্তাহে বনমোরগ শিকার করি, নিজের পোষ্য মোরগ বন বেঁধে রাখলে বনের মোরগগুলো এর আকর্ষণে আশেপাশে আসতে থাকে, ফাঁদ পেতে বন মোরগ শিকার করায় তার পেশা। এছাড়া প্রায়শ সজারু কিংবা বণ্য শুকর শিকার করে পাহিড়রা। শিকারিদের উৎপাতের কারণে বিপন্ন হতে চলেছে হরিয়াল, হিল ময়নাসহ নানা প্রজাতির পাখি।

খাগড়াছড়ি বন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান, বণ্য প্রাণী বনের সৌর্ন্দয্য এবং আমাদের ইকো সিস্টেমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের বাঁচার স্বার্থেও বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা উচিত। বিশেষ করে মানুষের কারণে যাতে বন্য প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করা জরুরি। কেউ যদি বন্য প্রাণী শিকার এবং বাণিজ্যিক উদ্দ্যেশে বিপণন করে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

x