প্রকৌশলীদের প্রত্যাশা

প্রকৌশলী জাহিদ আবছার চৌধুরী

রবিবার , ৬ মে, ২০১৮ at ৩:৩১ পূর্বাহ্ণ
24

আগামীকাল ৭ মে ইঞ্জিনিয়ার্স ডে। ১৯৪৮ সালের মে মাসের ৭ তারিখে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সারাদেশের প্রকৌশলীবৃন্দ আজ উৎসবমুখর পরিবেশে ইঞ্জিনিয়ার্স ডে উদযাপন করছে। ইঞ্জিনিয়ার্স ডে কে সামনে রেখে কর্মক্ষেত্রে তথা পেশাগত জীবনে প্রকৌশলীদের করণীয় ও চ্যালেঞ্জসমূহ সম্পর্কে ধারণা দেবার প্রয়াসে আজকের এ নিবন্ধের অবতারণা।

ইনস্টিটিউশন তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠার বৎসর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরেই প্রথম এ. এম. আই. . পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম কাউন্সিল সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৬ শে ডিসেম্বর ১৯৭১ (বিজয়ের মাত্র ১০দিনের মধ্যে), সেই সভাতেই ‘ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স পাকিস্তান’ নাম পরিবর্তিত হয়ে ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ নাম পরিগ্রহ করে। আইইবি ১৯৭২ সালের ৭ই জুলাই, স্বাধীন বাংলাদেশে জয়েন্ট স্টক কোম্পানীতে রেজিস্ট্রিভুক্ত হয়।

আইইবি এর গঠনতন্ত্রে ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠার নানাবিধ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা লেখা আছে, প্রতিষ্ঠার ৬২ বৎসরেও সেগুলোর অনেকগুলোই বাস্তবায়িত হয়নি বা বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তবে নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের অর্জনও কম নয়। ইঞ্জিনিয়ারিং স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠা, বিপিআরবি, আইএসবিবি, বিএইটিই প্রতিষ্ঠা এ সবই আমাদের ধারাবাহিক উন্নয়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একবিংশ শতাব্দিতে আমাদের প্রত্যাশার আইইবি দেখতে চাইলে আমাদেরকে ‘সফলতায়’ আহ্লাদিত না হয়ে ব্যর্থতার দিকসমূহ চিহ্নিত করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কর্মসূচি নির্ধারণ করতে হবে। আমরা আমাদের অতীত অসম্পন্ন দিকগুলো এভাবে চিহ্নিত করতে পারি

য প্রকৌশলীদের একমাত্র জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের সকল প্রকৌশলীকে আইইবি এর ছত্রছায়ায় আনা সম্ভব হয়নি য সার্বিকভাবে পর্যাপ্ত এবং উন্নত অবকাঠামো ব্যবস্থার অভাব য আইইবি কার্যক্রম মূলত সদর দফতর ভিত্তিক, কেন্দ্র উপকেন্দ্রে কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা যায়নি আ আইইবিকে অদ্যাবধি দৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তিমূলে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি য অপ্রতুল জনসংযোগ ব্যবস্থা য অপ্রতুল প্রকাশনা য অনুন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি , দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, দূর্বল রেকর্ড কিপিং, তথ্য সরবরাহের ধীর গতি ও অপ্রতুলতা ইত্যাদি য জাতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ডে অন্যতম ‘পেসার গ্রুপ’ বা নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে ব্যর্থতা।

এখানে উল্লেখ্য, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, নানা প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বর্তমান সম্মানী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মোঃ আবদুস সবুর উপরোক্ত সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে অবিরাম দেনদরবাররত আছেন।

উন্নত জগৎ গঠন করুন’ এ মিশন নিয়েই আইইবি এর জন্ম। ‘উন্নত জগৎ’ গঠন করতে হলে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হবে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো একবিংশ শতাব্দির উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ভিত্তি বিংশ শতাব্দিতে রচনা করেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে একবিংশ শতাব্দির উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ হবে গতিশীলতা এবং শক্ত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা। একবিংশ শতাব্দির উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ইনস্টিটিউশনকে অতীত ভুল ব্যর্থতা ও অসম্পূর্ণতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুততা পুষিয়ে নিতে হবে এবং প্রকৌশলীদেরকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দিতে হবে। কেননা উন্নয়নের জন্য চাই প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব।

বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছে। গণতন্ত্রের বিকাশের সাথে সাথে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও অপরিহার্য হয়ে পড়বে। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে গণসম্পৃক্ততাও বৃদ্ধি পাব্‌ে। জনগণের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে দায়িত্ব পালনে প্রকৌশলীদের তাই আচরনগতভাবে, সামাজিকতায়, মত ও ভাব বিনিময়ে এবং সর্বোপরি মানবিক আচরণে দক্ষতা ও উৎকর্ষতা প্রদর্শন করতে হবে। ইনস্টিটিউশনকে উপযোগী কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ বিষয়েও ভূমিকা রাখতে হবে।

সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আগামী দিনগুলোতে ইনস্টিটিউশনের ভূমিকাকে আমরা এভাবে দেখতে চাই

য পেশাগত মান উন্নয়ন এবং দক্ষতা অর্জন ও বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ, সেমিনার, কনফারেন্স ও সর্বোপরি “লার্নেড সোসাইটি কার্যক্রম” জোরদারকরণ য সামাজিক যোগাযোগবৃদ্ধি ও সমকক্ষ অন্যান্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য ক্ষেত্রে জাতীয় উন্নয়নে যৌথ অবদান রাখার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা য ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন সমূহের ব্যাপ্তি ঘটানো, কার্যক্রমবৃদ্ধি ও অধিকতর স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান। গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে উৎসাহ প্রদান য অনলাইন ভোটিং সিস্টেমসহ সার্বিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজ্‌ড করার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। পরবর্তী মেয়াদের নির্বাচনঅনলাইন ভোটিং সিস্টেম্‌স এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আমরা আইইবিকে ডিজিটাল যুগে উত্তরণ ঘটাতে পারি য ইঞ্জিনিয়ার্স মোবিলিটি ফোরামের চূড়ান্ত সদস্যপদ লাভ এবং ওয়াশিংটন একর্ডভুক্ত হবার জন্য বিপিআরবি এর প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে য কর্মকান্ড কেন্দ্রীভূত করার পরিবর্তে কেন্দ্র উপকেন্দ্রসমূহে প্রসারিত ও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে য ইএসবিবি এর কার্যক্রম যুগোপযোগীকরণ, উন্নত প্রযুক্তি আত্মীকরণের সহায়ক কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন

য দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের ও সেবার মান উন্নয়নে কোডস এন্ড স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়নে ‘অথরিটির’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার প্রচেষ্টা নিতে হবে য প্রকৌশল শিক্ষার মান উন্নয়নে উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে হবে য প্রযুক্তি হস্তান্তর , বিনিময় এবং আত্মীকরনে সরকারকে সময়ে সময়ে এবং নিয়মিতভাবে কার্যকর পরামর্শ ও সুপারিশ প্রদানের কার্যক্রম জোরদার করা

য একটি কালজয়ী উন্নয়ন ও পরিবেশ বান্ধব জাতীয় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল নীতি প্রণয়নে সরকারকে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে

য জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানী নীতি প্রণয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি সম্পদ উন্নয়ন, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণে ‘জাতীয় উপদেষ্টার’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উন্ন্‌য়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করতে হবে য ইনস্টিটিউশনের পেশাগত স্বাতন্ত্র অটুট রাখা আ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রকৌশলীদের ভূমিকা সুনির্দিষ্ট করার ব্যবস্থা নিতে হবে

উপরোক্ত কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নে আশু করণীয়গুলো সংক্ষেপে

য অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, উন্নত অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রবর্তন য একটি সুশৃঙ্খল,যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মীবাহিনীর মাধ্যমে যাবতীয় প্রশাসনিক কর্মসম্পাদন য তথ্য আদান প্রদানে উন্নত ব্যবস্থার প্রবর্তন

য উন্নত রেকর্ড কিপিং ও আর্কাইভিং ব্যবস্থার প্রবর্তন য সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ য কেন্দ্রউপকেন্দ্র ও প্রকৌশল বিভাগসমূহকে উদ্যমী ও কর্মমুখর করার প্রচেষ্টা নিতে হবে য পর্যাপ্ত ও উপযোগী ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন য আইইবি’র সামগ্রিক কর্মকান্ড ডিজিটালাইজ্‌ড করা।

উপরোক্ত আলোচনায় সকলে নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, বর্তমান শতাব্দির উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের প্রকৌশলীদেরকে প্রস্তুত করতে হলে ইনস্টিটিউশনকেই মূখ্য ও নিয়ামক ভূমিকা রাখতে হবে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছে, জননেত্রী শেখ হাসিনা রুপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেছেন। আমি মনে করি তিনি এবং তাঁর সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক। আমরা ৫৮তম কনভেনশনের যে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছি সেটি রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের আকাঙক্ষার সঙ্গে সাযুজপূর্ণ। আশা করি এই কনভেনশন আমাদেরকে জাতীয় উন্নয়নে নেতৃত্বদানে প্রস্তুত হতে অনুপ্রাণিত করবে।

সম্মানিত ও বিজ্ঞ প্রকৌশলীদের নিকট নিবেদন ; সমাজের অগ্রসর শ্রেণি হিসেবে দেশ ও জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরিসীম। পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন, উৎকর্ষতা সাধন এবং আমাদের মনন ও মেধার সর্বোত্তম প্রয়োগের মাধ্যমে কেবল সে দায়িত্ব পালনে সফল হওয়া সম্ভব, ‘অন্য কোন পন্থায় নয়’। অন্য কথায় নিরঙ্কুষ পেশাগত আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও দক্ষতাই আমাদের মর্যাদা অর্জন এবং সার্বিক সাফল্য লাভের একমাত্র সোপান।

লেখক : প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী সংগঠক।

x