প্রতিশ্রুতি অনেক বাস্তবায়ন কম

রমজানে নাগরিক চাহিদা ও সেবা ।। দ্রব্যমূল্য: লাগাম টানার চেষ্টা আছে ।। গ্যাস পানি বিদ্যুৎ কোথাও না কোথাও থাকে পালাক্রমে

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১৭ মে, ২০১৮ at ৪:৫৩ পূর্বাহ্ণ
63

পানি, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস। নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সারাবছরই এই তিন গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ চাহিদা অনুযায়ী পায় না নগরবাসী। অবশ্য চট্টগ্রাম ওয়াসা, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সরবরাহ করতে না পারলেও তাদের ব্যর্থতা সবসময় স্বীকার করতে চায় না। এমন পরিস্থিতিতে এসে আগামীকাল শুক্রবার শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান। রমজান মাসে এসবের চাহিদা পূরণ ও সেবা পাওয়াটা যেন নির্বিঘ্ন থাকে এমনটা নাগরিক চাওয়া। নগরবাসীর প্রত্যাশা, রমজান মাসে যেন অন্ততঃ চাহিদা অনুযায়ী বিশেষ করে ইফতার ও সেহেরির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও পানি সরবরাহ থাকে। পাশাপাশি তারাবির নামাজের সময়ও লোডশেডিং থেকে মুক্তি চান চট্টগ্রামবাসী। অবশ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলরা বলেছেন, নগরবাসীর চাহিদা পূরণে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

এদিকে বছরের বিভিন্ন সময়েই অস্থিতিশীল থাকে ভোগ্যপণ্যের বাজার। মনগড়া মূল্য দাবি করেন ব্যবসায়ীরা। এইক্ষেত্রে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরিরও অভিযোগ থাকে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে। অনেকটা ‘অসহায়’ ও ‘জিম্মি’ ভোক্তারাও হেরে যান এসব ‘কূটকৌশল’র কাছে। অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও নিশ্চিত থাকেন না ক্রেতারা। থাকে ভেজালের ভয়ও। রমজান মাস এলেই এই মূল্যবৃদ্ধি ও ভেজাল মিশ্রণের প্রবণতাও বেড়ে যায়। অবশ্য রমজানকে সামনে রেখে দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন গত ৯ মে থেকে বাজার মনিটরিং শুরু করেছে। কিন্তু ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি হচ্ছে, বাজার মনিটরিং সন্তোষজনক নয়। এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাজার মনিটরিং সন্তোষজনক নয়। এই বিষয়ে আমাদের পর্যবে ণগুলো তুলে ধরে আগামীকাল (আজ) আমরা এডিসি মহোদয়কে চিঠি দিব।’ ‘বাজার মনিটরিংয়ের অসন্তোষের কারণ’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না। জেলা প্রশাসন থেকে প্রতিদিন ৫টি টিম বাজার মনিটরিংয়ে যাওয়ার কথা। ওই জায়গায় যাচ্ছে মাত্র দুইটি। পাইকারি এবং খুচরা দুই জায়গায় মনিটরিং হওয়ার কথা। কিন্তু এখন হচ্ছে খুচরা বাজারে। পাইকারিতে যায় নি। এই ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেটকে বাজার মনিটরিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট করে দায়িত্ব দেয়া হোক এবং তাদেরকে অন্য কাজ থেকে রিল্যাক্স দেয়া হোক।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘পুরো রমজান মাসেই মনিটরিং কার্যক্রম চলবে। আমাদের পাঁচটি টিম রেডি করা আছে। প্রয়োজন হলে সবগুলো টিমই মনিটরিং করবে। আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারাও চান বাজারটা স্থিতিশীল থাকুক। এরমধ্যেও কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তো থাকেই। আমাদের অভিযান তাদের বিরুদ্ধে। আসলে মনিটরিংটা সবাইকে মিলেই করতে হবে। জেলা প্রশাসন, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ সবার অংশগ্রহণে। কোথাও যদি কোন অসঙ্গতি চোখে পড়ে আমাদের জানালে সাথে সাথে ব্যবস্থা নিব।’ এদিকে গতকাল বুধবার থেকে বাজার মনিটরিং শুরু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার ও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট (যুগ্ম জেলা জজ) জাহানারা ফেরদৌসের নেতৃত্বে একটি টিম কোতোয়ালী থানার কাজীর দেউড়ি কাঁচা বাজার ও সিডিএ মার্কেটের গ্রোসারি শপে পণ্যের মূল্য তালিকা টাঙানো নিশ্চিত করা ও দ্রব্য মূল্য মনিরটরিং করে।

পানি সরবরাহ কতটা নিশ্চিত হবে :

নগরীতে দৈনিক ৪০ কোটি লিটার পানির চাহিদা আছে। এর বিপরীতে চট্টগ্রাম ওয়াসা সরবরাহ করতে পারে মাত্র ২৯ থেকে ৩০ কোটি লিটার। রমজানে পানির চাহিদা বেড়ে গিয়ে তা উন্নীত হবে ৪২ কোটি লিটারে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে ওয়াসা চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয় সেখানে রমজানে অতিরিক্ত চাহিদা পূরণ করতে পারবে তো? এ প্রশ্ন নগরবাসীর। নগরীর বিভিন্ন এলাকার লোকজনের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেছেন, হালিশহর, মধ্যম হালিশহর, পতেঙ্গা সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন চাহিদার বিপরীতে পানির ঘাটতি থাকে। এসব এলাকায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ পার হলেও পানি পাওয়া যায় না। অবশ্য ওয়াসার দাবি, ওইসব এলাকায় সরবরাহ লাইনের ত্রশুটির কারণে পানি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিদ্যমান পাইপ লাইনগুলো সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত এ সমস্যা থাকবে। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একে এম ফজলুল্লাহ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘পবিত্র রমজান মাসে নগরবাসী যাতে নিরবচ্ছিন্ন পানি পান আমরা সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। এক্ষেত্রে আমাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি থাকবে না। কোথাও কোন অসুবিধা হলে তা দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করার চেষ্টা থাকবে।’ ‘শহরের অনেক এলাকার লোকজন এখনো নিয়মিত পানি না পাওয়ার অভিযোগ করেন। ওইসব এলাকায় রমজান মাসে পানি সরবরাহ নিশ্চিতে কি উদ্যোগ নেবেন?’- এমন প্রশ্নে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘কিছু কিছুৃ জায়গায় পানি একটু কম পাওয়া যায়। শহরের শেষপ্রান্তে এই সমস্যাটা একটু হয়। কারণ, ওখানে পাইপলাইনগুলো এখনো পুরোপুরি সংস্কার হয় নি। এখন আমরা পানির ‘প্রেসার’ (গতি) বাড়ালে পুরোনো পাইপলাইনগুলো ফেটে যেতে পারে। তাই ওইসব এলাকায় আপাতত সমস্যাটা আছে। তবে ওই এলাকাগুলোতে পানি সরবরাহ নিশ্চিতে আমরা ভউচার (পানি বহনকারী গাড়ি) ব্যবহার করবো। পর্যাপ্ত ভাউচার আছে আমাদের। এলাকার লোকজন যদি আমাদের পানি না পাওয়ার বিষয়টি অবহিত করেন, আমরা সাথে সাথে ভাউচার পাঠাবো।’

রমজান উপলক্ষে বিশেষ কোন সুবিধা থাকবে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন মসজিদ এবং যেসব স্থানে ইফতার আয়োজন হয় সেখানেও আমরা ভাউচারের মাধ্যমে বিনামূল্যে পানি পৌঁছে দিব।’

স্বাভাবিক সময়ে এবং রমজান মাসে পানির চাহিদা কতটুকু থাকে এবং এর বিপরীতে ওয়াসা সরবরাহের পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাধারণত দৈনিক ৪০ কোটি লিটার চাহিদা থাকে। এর বিপরীতে আমরা ২৯/৩০ কোটি লিটার সরবরাহ করে থাকি। রমজানে পানির একটু চাহিদা বাড়ে। এই েতে্র দৈনিক ৪২ কোটি লিটার হতে পারে। আমাদের চেষ্টা থাকবে সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করে নগরবাসীর চাহিদা পূরণে।’

রমজানে গ্যাস পরিস্থিতি :

আবাসিক এলাকায় সার্বক্ষণিক গ্যাস না থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সকালে থাকে তো বিকেলে থাকে না। নগরীর পাঁচলাইশ থানার মুহাম্মদপুর, পতেঙ্গা, হালিশহর, বাকলিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় প্রায় সময় সকাল ৮টা ৯টায় গ্যাস চলে গেলে আসে দুপুর দেড়টার পর। আবার আসলেও চাপ থাকে খুব কম। ফলে সারা বছরই ওইসব এলাকার লোকজনকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাদের দাবি রমজান মাসে অন্ততঃ সেহেরি এবং ইফতার তৈরির সময় যেন গ্যাস সরবরাহ ঠিক রাখে কর্তৃপ । এ বিষয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ম্যানেজার (কাস্টমার এন্ড মেইনটেন্স) অনুপম দত্ত দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমাদের চেষ্টা থাকবে ইফতারি এবং সেহেরির সময়ে যেন গ্যাস সরবরাহ ঠিক থাকে। আসলে যতটুকু চাহিদা আছে ততটুকু আমরা ন্যাশনাল গ্রিড থেকে পাচ্ছি না। এ মুহূর্তে পাওয়ার স্টেশনগুলো বন্ধ আছে। ফার্টিলাইজারের একটি ইউনিট চালু আছে। এখন ২২০ থেকে ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা আছে। এর বিপরীতে ৫/১০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থাকে। আসলে ক্রাইসিস থাকবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে রমজানে যেন এ ক্রাইসিসটাকে মিনিমাম পর্যায়ে আনা যায়।’

রমজানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি :

বিদ্যুৎ নিয়ে সারাবছরই অভিযোগ থাকে। লোডশেডিং নিয়েও আছে ভোগান্তি। আছে লোভোল্টেজেরও ভেল্কিবাজি। গতকালও আন্দরকিল্লা, খলিফাপট্টি, ঘাটফরহাদবেগসহ বিভিন্ন এলাকায় লোভোল্টেজ ছিল। এর প্রভাবে কোন কোন বাসায় টিউবলাইট জ্বলেনি। ওইসব এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকার পরেও নির্ভর করতে হয়েছে জেনারেটরের উপর। এমন পরিস্থিতি থেকে রমজান মাসে মুক্তি চান নগরবাসী। বিশেষ করে ইফতারসেহেরির সময় ছাড়াও তারাবির নামাজের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ চান। অবশ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবিএখন লোডশেডিং হয় না। রমজান মাসে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কেমন থাকবে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিতরণ দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘রমজান মাসে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সেহেরি, ইফতার এবং তারাবির সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ শতভাগ থাকবে। এটা অনেকটা নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। তবে ঝড়তুফান হলে বা কালবৈশাখী হলে সেটা ভিন্ন কথা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হয়তো ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু বাকি সময়ে শতভাগ থাকবে। বর্তমানে লোডশেডিং হয় কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন তো লোডশেডিং নেই। দৈনিক ১ হাজার থেকে ১১শ’ মেগাওয়াট চাহিদা থাকে। সেইক্ষেত্রেও ৯শ’ এর উপর চট্টগ্রামেই উৎপাদিত হচ্ছে। বাকিটা ন্যাশনাল গ্রিড থেকে পাচ্ছি।’

x