প্রবীণদের নিয়ে ভাবনা

লায়ন এম. সামশুল হক

শুক্রবার , ২ মার্চ, ২০১৮ at ৬:৪৭ পূর্বাহ্ণ
32

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনটা নানারূপে বা কালে বিভক্ত। যেমনশৈশব কাল, কৈশোর কাল, প্রাক যৌবন কাল, যৌবন কাল এবং প্রৌঢ়ত্বের সীমারেখা পেরিয়ে একজন মানুষ একসময় বার্ধক্যে উপনীত হন। বার্ধক্য বা বৃদ্ধাবস্থা মানব জীবনের শেষ পর্যায় বা ধাপ। জীবনের সকল আশাআকাঙক্ষার সীমানা পেরিয়ে জীবন চক্রের শেষ প্রান্তে উপনীত হওয়া একজন মানুষপ্রবীণ বা বৃদ্ধ হিসাবে পরিচিত হন।

সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবেশের ভিন্নতায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবীণ কালকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। আমাদের মত উন্নয়নশীল বিশ্বে ৬০ বছর এবং উন্নত বিশ্বে ৬৫ বছরকে প্রবীণ কালের শুরু হিসেবে ধরা হয়। প্রবীণকাল কিন্তু দীর্ঘ সময়। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকি “ন্যাচার”এ প্রকাশিত প্রবন্ধে মানুষের সর্বোচ্চ জীবন কাল ১২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

বিংশ শতাব্দীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণার ফলশ্রুতিতে চিকিৎসায় ব্যাপক উন্নতি, স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়ন মৃত্যুহার যেমন কমিয়েছে তেমনি মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের অন্যতম উদ্বেগজনক ও বিস্ফোরণোন্মুখ সমস্যা হল প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। অথচ এ বিষয়ে আমরা একেবারেই অসচেতন, উদাসীন ও নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ। ২০৫০ইং সালে এর সংখ্যা হবে ৪ কোটি ৩০ লক্ষ ২০ হাজার যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হয়।

প্রবীণ জনসংখ্যার এ বৃদ্ধিকে বিবেচনায় এনে বিশ্বব্যাপী প্রবীণ বিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৮২ইং সালে “ভিয়েনা ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান অব একশান অন এ্যাইজিং” এবং ২০০২ইং সালে মাদ্রিদে “মাদ্রিদ ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান অব একশান অন এ্যইজিং” গৃহীত হয়। যা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সর্ব্বোতভাবে অনুমোদিত ও গৃহীত হয়। জাতিসংঘ বার্ধক্যকে মানব জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে। এ সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯২ইং সাল থেকে ১লা অক্টোবর বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’ পালিত হয়ে আসছে।

আমি নিজে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সমাজসেবা, লায়নিজম অর্থাৎ মানবসেবা, সর্বোপরি মানবাধিকার কর্মী হিসাবে কাজ করতে গিয়ে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, বর্তমানে আমি যাদের কাতারে অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একজনতাদের নিয়ে কিছু করা এটা সময়ের দাবি। হঠাৎ করে এক শুভলগ্নে পরিচয় ঘটলো নবগঠিত সিনিয়র সিটিজেন সোসাইটি, ঢাকার কর্ণধার জনাব সোহরাব হোসেন (সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও রাষ্ট্রদূত) ও এস.এস.সি কর্মকর্তাদের সাথে। সিনিয়র সিটিজেন সোসাইটি প্রসঙ্গে আলাপচারিতার একপর্যায়ে ঢাকার আদলে চট্টগ্রামে সোসাইটির কার্যক্রম পরিচালনার কথা ভেবে দায়িত্ব অর্পিত হয় আমার উপরে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে একযোগে প্রবীণদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হলে তার প্রভাব জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলবে বলে সকলের ধারণা।

আবহমান কাল ধরে বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী যৌথ পরিবার ব্যবস্থায় প্রবীণরা নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতেন। দ্রুত শিল্পায়ন ও শহরায়নের ফলে পারিবারিক এবং সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সহ বহুবিধ কারণে বর্তমানে যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে একক পরিবারে রূপ নিচ্ছে। এই পরিবর্তনশীলতার নীরব শিকার হচ্ছেন প্রবীণ জনগোষ্ঠী। অধিকাংশ প্রবীণ পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে উপেক্ষা, অবহেলা, বঞ্চনা ও নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির শিকার হয়ে সমাজে বাড়তি বোঝা হিসাবে বিবেচিত হন। পরিবারের সদস্যদের অবজ্ঞা, প্রবীণদের প্রতি তরুণ সমাজের অনীহা ও উদাসীনতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু, উপার্জনক্ষম সন্তানের অকাল মৃত্যু, অপসংস্কৃতির প্রভাব ইত্যাদি নানা কারণে অনেক প্রবীণ ব্যক্তি মানসিক ও আবেশিয় সমস্যায় ভোগেন। সমাজে প্রবীণদের অভিজ্ঞ মানুষ হিসাবে না দেখে বোঝা হিসেবেই দেখা হয়। প্রবীণদের মর্যাদা ও সেবা দেওয়ার মানসিকতা দিনে দিনে লোভ পাচ্ছে। তারা স্বজনসন্তানদের কাছে অবাঞ্চিত হয়ে যাচ্ছেন। ভাতা দিয়ে প্রবীণদের আশ্বস্ত করা যাবে না। নূতন প্রজন্মকে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলতে হবে। প্রবীণদের মর্যাদা রক্ষায় পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিম্নে প্রদত্ত কয়েকটি বিষয়ে আমাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। যেমনঃ

() প্রবীণ ব্যক্তিদের অবদানের স্বীকৃতি।

() রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি।

() স্বাস্থ্য, পরিচর্যা, পুষ্টি লাভে প্রবীণদের অগ্রাধিকার।

() প্রবীণ নাগরিকদের পরিচিতি কার্ড প্রবর্তন।

() সব ধরনের যানবাহনে প্রবীণদের জন্য আসন সংরক্ষণ।

() জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগে প্রবীণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও পূনর্বাসন ইত্যাদি বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।

বিশ্বের উন্নত সব দেশেই এই প্রবীণরা রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশে প্রবীণদের প্রধান সমস্যা অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা। এই কারণেই প্রবীণদের জীবনের মৌলিক চাহিদা যথাঅন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদির যোগান দিতে আমাদের সকলের বিবেকের পানে তাকিয়ে আছে প্রবীণরা। সরকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য পেনশন, দরিদ্র প্রবীণদের জন্য বয়স্কভাতা, জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন২০১৩ সহ বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে যা প্রশংসনীয়। তবে এসকল সুযোগসুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ২০১৭২০১৮ইং সালে ৩৫ লক্ষ প্রবীণ নাগরিক মাসিক ৫০০/-(পাঁচশত) টাকা হারে বয়স্কভাতা লাভ করছেন। এজন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে একুশ হাজার কোটি টাকা।

প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বহুমুখী সমস্যা মোকাবেলায় পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকরী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন:

১। বিদ্যমান বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রবীণদের নিকট এভাতা সঠিকভাবে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ।

২। দুস্থ, অসহায়, দরিদ্র প্রবীণদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান করা।

৩। দুঃস্থ প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আবাসনের সুব্যবস্থা করা।

৪। প্রবীণ বীমা ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।

৫। প্রবীণ মাবাবার ভরণপোষণের সন্তানসন্ততির আইনগতঃ বাধ্যবাধকতা ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবহিতকরণ।

৬। সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেলে মাবাবার জন্য আলাদা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা।

৭। যেসব বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান আর্থসামাজিক উন্নয়নে তাদের কার্য্যক্রম পরিচালনা করে আসছে তাদেরকে এবং এনজিওদের ‘প্রবীণ কল্যাণ কর্মসূচি’ গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া।

৮। প্রবীণ নারীর দেনমোহর ও উত্তরাধিকার সম্পত্তি প্রাপ্তি নিশ্চিত করণে রাষ্ট্র কর্তৃক কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।

৯। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমনমসজিদ, মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ইত্যাদিতে সাপ্তাহিক ধর্মীয় বিশেষ দিনে প্রবীণদের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে আলোকপাত করা।

জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা২০১৩” এবং “মাবাবার ভরণপোষণ আইন২০০৫” এর সুপারিশ ও ধারাগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদাগুলো যথাযথভাবে পূরণ করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

৬০ (ষাট) বছর পেরোলেই জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেলেন মোটেই তা নয়। বরং সারা জীবনে সংসারের ঘাঁনি টানা থেকে প্রাণ খুলে বাঁচার সময়। বয়স বাড়লে তাকে সানন্দে, হাসিমুখে গ্রহণ করুন। প্রাকৃতিক নিয়মে সময়ের সঙ্গে বয়স তো বাড়বেই, এটাই চিরন্তন সত্য। মনে করবেন না চাকরি ফুরালেই জীবন ফুরোয়। বরং জীবন দৌড়ে দম ফেলে বাঁচা শুরু হলো। অতীতে মনের ইচ্ছায় যা করতে পারেন নি তা করার স্বাধীনতা পেলেন। আসুন, আমরা প্রবীণদের সুস্থ জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। বয়স্ক মানুষদের সহায়তা ও সাহচর্য প্রদান করি। একা মানুষের স্বজন হয়ে উঠি। তাদের আশাআকাঙক্ষায় তাদের পাশে থাকি। প্রতি প্রবীণের মুখে যেন দেখতে পাই আমার স্নেহময়ী মাবাবার প্রতিচ্ছবি। প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার ও সুযোগসুবিধা সুরক্ষাই ‘সিনিয়র সিটিজেন সোসাইটির’ ভিশন।

লেখক : জেনারেল সেক্রেটারি, সিনিয়র সিটিজেন সোসাইটি, চট্টগ্রাম।

Email:lionshamslhuque@gmail.com

x