প্রশ্নপত্র ফাঁস : এভাবে আর কতদিন?

সফিক চৌধুরী

শনিবার , ১০ মার্চ, ২০১৮ at ৭:৫৬ পূর্বাহ্ণ
131

শিক্ষা মানুষের ভেতরের সুপ্ত ক্ষমতা যেমন তাঁর কল্পনাপ্রবণতা ও সৃজনশীলতা এবং যুক্তি বিবেচনার ক্ষমতা ও মননশীলতাকে উজ্জীবিত করে। কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কী আদৌ যথার্থ শিক্ষা বান্ধব হতে পেরেছে? এর উত্তর না খুঁজে আমরা যদি আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন পরীক্ষাবান্ধব! আমাদের দেশে এখন একটি শিশু তার প্রাথমিক বিকাশকালীন সময়েই মুখোমুখি হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষার! আর এই পরীক্ষাকেন্দ্রিক বাস্তবতায় বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রমাগত ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের পরীক্ষাবান্ধব শিক্ষা ব্যবস্থায় এই যে প্রশ্ন ফাঁসের সমাজ বিনাশী উৎসব চলছে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মেধাহীন ও নিষ্প্রাণ করে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চলছে, তবুও কেন যেন আমরা সকলেই নিশ্চল, নিশ্চুপ! প্রশ্ন ফাঁসের এ ঘটনাগুলো আমাদের মাঝে শংকা তৈরি করেছে। আমাদের ভোঁতা অনুভূতির কারণে এ জাতীয় সমাজ বিনাশী কার্যক্রম দিনে দিনে মহিরুহ হয়ে উঠছে! পরীক্ষায় ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ আমাদের সমাজে বিগত দিনেও ছিল, যদিও তা কখনোই এমন মহামারি আকারে ছিল না। কিন্তু, বিগত কয়েক বছরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যখনি পাবলিক পরীক্ষা বেড়েছে, তখনই ধীরে ধীরে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ যেন এক মরণব্যাধী ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে, আর এখনতো বিভিন্ন অনলাইনের মাধ্যমে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করা হচ্ছে। সর্বশেষ চলমান এসএসসি পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল, কিন্তু তা যে ‘বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো’ তা অভিভাবকসহ আমরা সকলে টের পেলাম পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ক্রমাগত প্রশ্ন ফাঁস হওয়া দেখে! এ বছর এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে বলা হয়েছিল কেন্দ্রে শিক্ষকশিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ, কিন্তু গত ১১ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলো’র খবরে আমরা জানতে পারি, একটি কেন্দ্রে পরীক্ষার কক্ষেই মোবাইলে গণিতের ফাঁস করা প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে! যদিও প্রায় বিষয়ের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন হুবহু মিল থাকা সত্ত্বেও সরকার চলমান এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে করণীয় নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করেছেন। কিন্তু, এতদিন পেরিয়ে গেলেও আমরা এখনও জানিনা ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ব্যাপারে কমিটির মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত কী? অবশ্য কমিটির প্রধান কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব পত্রিকাকে জানিয়েছেন তিনি নাকি এখনো কমিটির আদেশই পাননি! কিন্তু, এভাবে আর কতদিন?

একটি জাতীর সম্পদ হলো তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশ্বায়ন ও প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজার অর্থনীতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান, নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। আর শিক্ষায় জ্ঞান ও গবেষণার সেই বাতাবরন তৈরির মূল দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রের, কারণ শিক্ষার্থীরা যখন জ্ঞান ও গবেষনায় এগিয়ে যায়, তখন মূলত এগিয়ে যায় তাঁর দেশ। কিন্তু এভাবে মহামারীর মতো নিরবচ্ছিন্ন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে আমরা আমাদের কেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছি তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? বলা হয়, কোনো জাতিকে ধ্বংস/পঙ্গু করার জন্য সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই চলে, কারণ তাতে যে প্রজন্ম বেড়ে উঠবে তারা হবে জ্ঞানবিজ্ঞান, দক্ষতা আর যোগ্যতায় অসাড়, তাদের দ্বারা ভবিষ্যতে পুরো জাতিই অবলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আমাদের ভাবনার সময় এসেছে, এভাবে মহামারির মতো প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষার সব স্তর এবং চাকুরির নিয়োগসহ সবখানে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস’ আমাদের কেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করছে, এরা কি পারবে আগামী দিনে আধুনিক বিশ্বের সাথে নিজেদের খাপ খাওয়াতে? প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে আমরা সত্যিকার যোগ্য মেধাবীদের হারিয়ে ফেলছি, যা কোনোমতেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

এখন প্রশ্ন এসে যায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন? প্রথমত, নিশ্চয়ই আমাদের সমাজেরই কারও কারও কাছে এর চাহিদা আছে, এখন প্রশ্ন এসে যায়, তারা কারা? জবাবটিও সোজা, যারা মেধার জোরে টিকে আসতে অক্ষম। দ্বিতীয়ত, যারা চায় না আমরা জাতি হিসেবে পরিপূর্ণ হয়ে গড়ে উঠি। প্রশ্ন ফাঁসের এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকর্মচারী, ছাত্রছাত্রনেতা, শিক্ষক, কোচিং সেন্টার, প্রেসের কর্মচারী এরাই নাকি প্রশ্ন ফাঁসের মূল নিয়ন্ত্রক। আর প্রশ্ন ফাঁসের এই সমাজ বিনাশী কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তিই নাকি সবচেয়ে বড় নিয়ামক। এখন এই যে প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে অনৈতিকতা তা বন্ধ করবে কে? এর জন্য প্রথমত দরকার নাগরিক সচেতনতা এবং সরকারের কঠোর অবস্থান, কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়ন এবং নির্মোহ হয়ে তার যথাযথ প্রয়োগ। সেদিন একজন একটি কৌতুক শুনিয়েছিলেনণ্ড ‘একবার স্বর্গের দেবতারা আর নরকের শয়তানেরা মিলে ক্রিকেট খেলবে বলে ঠিক করল। স্বর্গের দেবতারা খেলায় জয় নিয়ে খুবই আত্মবিশ্বাসী, কারণ সব ভালো ভালো ক্রিকেটাররা স্বর্গে তাদের সঙ্গেই আছেন। কিন্তু শয়তানদেরও এই নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত দেখা গেল না। তাদের নিশ্চিন্ত ভাবভঙ্গি দেখে এক দেবতা এক শয়তানকে ডেকে বলল, কী ব্যাপার, ভালো ভালো ব্যাটসম্যান তো সব আমাদের এখানে, কিন্তু তোমাদেরকে বিশেষ চিন্তিত মনে হচ্ছে না! শয়তান সঙ্গে সঙ্গে দাঁত বের করে শয়তানি হাসি দিয়ে বলল, তোমাদের যতই ব্যাটসম্যান থাকুক, আম্পায়ারগুলো তো সব আমাদের এখানে!

প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায় সময়ই তা স্বীকারই করতে চান না, প্রায়শই তাদের এড়িয়ে যাওয়ার মনোবৃত্তি। কিন্তু, এভাবে কী দায় এড়ানো যাবে? আর আমাদের অনুভূতিগুলো কি এতই ভোঁতা যে, আমরা নিশ্চল, নিশ্চুপ হয়ে থাকবো? আসুন, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে প্রতিবাদী হই। নিজে বাঁচি আর আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাই।

x