প্রশ্ন ফাঁস, রোহিঙ্গা ও সমকালীন বিষয়ে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী

সংবাদ সম্মেলন

আজাদী ডেস্ক

মঙ্গলবার , ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৪:২৬ পূর্বাহ্ণ
228

আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) গভর্নিং কাউন্সিলের ৪১তম বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিয়ে ইতালি ও ভ্যাটিক্যান সিটি থেকে দেশে ফেরার পর গতকাল সোমবার গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দেশের সমকালীন রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, রোহিঙ্গা বিষয়সহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বাচন হবে । ‘বিএনপি ২০১৪ সালে নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করেছে, পারেনি। এবারও পারবে না। জনগণের ওপর যে দলের আস্থা আছে, যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। বিএনপি অংশ না নিলে আমাদের কিছুই করণীয় নেই।’

শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচন হচ্ছে মানুষের অধিকার। এখন বিএনপি বলছে নির্বাচনে যাবে না। আপনারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এত কথা বলেন, সেই দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত নেত্রীকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। রায়টা তো আর আমি দেইনি। রায় দিয়েছেন কোর্ট। এখন তারা নির্বাচনে না গেলে আমাদের কিছুই করার নেই। কেউ যদি বলে নির্বাচন করতে দেব না, তাহলে সেটা তাদের গায়ের জোরের কথা। সময়মতো, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। আপনাদের নিশ্চয় স্মরণ আছে, ২০১৪ সালে তারা নির্বাচন করবে না বলে, নির্বাচন ঠেকানোর নামে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে। প্রায় সত্তরটা সরকারি অফিস তারা পুড়িয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করেছে। গাড়িতে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে। ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ সালে এই সময়ের মধ্যে তারা প্রায় পাঁচ শ’য়ের মতো মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষকে পুড়িয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়

প্রশ্নপত্র ফাঁস বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে এটা চলে আসছে। কখনো সামনে চলে আসে, কখনো আসে না। তিনি বলেন, পরীক্ষার আগের দিন তো প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না। প্রশ্ন ফাঁস হয় পরীক্ষার ২০ মিনিট আগে। কার এমন ‘ফটোজেনিক মেমোরি’ আছে যে প্রশ্ন দেখে ২০ মিনিটে সবকিছু মুখস্থ করে লিখে ফেলে? তিনি বলেন, প্রযুক্তি যেমন সুযোগ তৈরি করে দেয়, আবার সমস্যাও তৈরি করে দেয়। গণমাধ্যমকর্মীদের তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁকারীদের ধরিয়ে দেন, তাদের শাস্তি দেব। পরীক্ষায় বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) বন্ধ করে দেব। আপনারা (গণমাধ্যমকর্মীরা) লেখেন, আমরা বন্ধ করে দেব। কিন্তু এটা নিয়ে সুর তুলে একবার মন্ত্রী, সচিব আবার সরকারকে দায়ী করা হচ্ছে। দয়া করে একটু খুঁজে দিন, কে প্রশ্নফাঁস করল, তার শাস্তি দেব আমরা।’

মার্চেই নিজেস্ব স্যাটেলাইট

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা ইতোমধ্যে ৪জিতে প্রবেশ করলাম। স্যাটেলাইটও প্রস্তুত হয়েছে। আগামী মার্চের যে কোনো সময় এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হবে। এটা হলে আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট হবে।

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার নানা টালবাহানা করেছে। তারা আট হাজার নিতে বলেছে এখন, আমরা বলছি আট হাজার আগে নিক। তারপর আমরা দেখব, তারা এদের সঙ্গে কী ব্যবহার করে। তিনি বলেছেন, নেওয়ার আগে রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য ভাসানচরে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। প্রথমে এক লাখ মানুষের বসবাসের ব্যবস্থা করা হবে। রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল নিয়ে প্রশ্নে শেখ হাসিনা প্রথমেই বলেন, রোহিঙ্গারা এখন বালুখালীতে আছে। আমরা চাচ্ছি এদের একটা অস্থায়ী ক্যাম্প করে রাখতে। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বলছি, সমস্যা সৃষ্টি করেছে মিয়ানমার, সমাধান তাদেরই করতে হবে। এখন একটা সমঝোতা হয়েছে, এখন আট হাজার পরিবারের তালিকা তৈরি, সবই তৈরি। এজন্য আমাকে ধন্যবাদ দিতে পারেন, যখন ঢোকা শুরু হল, তখনই প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে টাকা দিয়ে তালিকা, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছি। যারাই ঢুকেছে, তাদের ছবি নিয়ে তাদের আইডি কার্ড করিয়ে রেখেছি। এখন মিয়ানমার অস্বীকার করতে পারবে না যে এরা তাদের না।

আমি বলতে গেলেই তো

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্টের তহবিলে এখন যে ২৯ লাখ টাকা আছে, এখন সরকার কি তা এতিমদের কাছে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে কি না সে প্রশ্নে শেখ হাসিনা বলেন, অনেকে আছেন শুধু দিতেই পারে। আমরা দুই বোন, আমাদের একটা মাত্র বাড়ি। আমার আব্বা সারাজীবন জনগণের জন্য কাজ করেছেন, ওই বাড়িটি তাই জনগণের জন্য দিয়ে দিয়েছি। আমরা ট্রাস্ট করে ১৭০০ থেকে ১৮০০ জনকে সহায়তা করি। আমরা এটা নিয়ে খুব একটা প্রচারও করি না। কেউ যদি এতিমের টাকা আসার পরও মায়া ত্যাগ করতে না পারে, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। আমি বলতে গেলেই তো..

যদি আরও কিছু ডিমান্ড করে

শেখ হাসিনা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আমাকে শ্যাওলা ধরা একটি ভবনে রাখা হয়েছিল, খাট ছিল ভাঙা। তাকে রাখা হয়েছিল স্পিকারের বাড়িতে, তার সঙ্গে এই ফাতেমাকে দেওয়া হয়েছিল। এটা গোপন ছিল। ডিআইজি হায়দার (সামছুল হায়দার সিদ্দিকী) সাহেবকে জিজ্ঞাস করলেই জানতে পারবেন। আদালত দিয়েছেন। বেশি কিছু তো দেওয়ার নেই, একজন মেইড সার্ভেন্ট দিয়েছে। যদি আরও কিছু ডিমান্ড করে। হাসতে হাসতে নিজের দু’গালে হাত বুলিয়ে প্রসাধনীর কথা ঈঙ্গিত করেন শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়ার রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে কোনো টেলিফোন পাননি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিএনপিতে কি কেউ নেই

দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে খালেদা জিয়া বন্দি হওয়ার পর একই অভিযোগে দোষি সাব্যস্ত তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সমালোচনাও করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। মায়ের সঙ্গে জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত তারেক রহমান মুদ্রা পাচারের মামলায়ও আদালতের দণ্ড নিয়ে বিদেশে রয়েছেন। ফেরারী তারেককে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার প্রসঙ্গ ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপিতে কি একটাও নেতা নেই যিনি দেশে অবস্থান করছেন, যাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা যেত? বিএনপিতে দেখি অনেক নেতা আছেন, যারা দেখি কর্মঠ। তাদের মধ্যে থেকে কি একজনকেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা যেত না? কারও কি যোগ্যতা ছিল না?

বিএনপির অন্য নেতাদের উপর খালেদা জিয়ার আস্থা নেই বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। এই প্রসঙ্গে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নিজে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জিলহ্মুর রহমনাকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো বোনকে বা ছেলেকে করিনি।

বিএনপির গঠনতন্ত্র প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, বিএনপির একটি গঠনতন্ত্র আছে, ওটার কোনো খোঁজও পাওয়া যায় না। খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের আগেই বিএনপির গঠনতন্ত্রের একটি ধারা সংশোধনের সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা, যে ধারায় আদালতে দণ্ডিত কারও কারও বিএনপির সদস্যপদ না পাওয়ার শর্ত ছিল।

নতুন ডিজিটাল আইন নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই

৫৭ ধারা বাদ দিয়ে নতুন ডিজিটাল আইন হয়েছে, এই আইনটি গণমাধ্যমকর্মীদের ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ হবে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী । শেখ হাসিনা বলেন, সাইবার ক্রাইম একটি বিরাট সমস্যা। এ দেশসহ সারা বিশ্বে এ সমস্যা আছে। সিআরপিসিতে যেসব ধারা আছে, সেগুলো। আপনাদের এত ভয় কেন? কেউ যদি এমন অপরাধ করেন, তাহলে তাঁর ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হবে। ফৌজদারি আইন (সিআরপিসি) অনুযায়ী কেউ অপকর্ম না করলে সেখানে অপপ্রয়োগ কেন হবে। প্রযুক্তি যেমন সুযোগ করে দেয়, মাঝেমধ্যে দুঃসহ যন্ত্রণাও দেয়।

মিডিয়ার প্রচারেও বাড়ে চালের দাম

শেখ হাসিনা বলেন, চালের দাম বাড়ানোয় মিডিয়ারও একটু অবদান আছে। ব্যবসায়ীরা যখন চালের দাম বাড়ায়, তখন আপনারা যারা বলেন, তাতে ব্যবসায়ীরা বলেন, আরেকটু বাড়িয়ে নিই। চালের দাম সিন্ডিকেটের জন্যও বাড়ে, আবার মিডিয়ার প্রচারের জন্যও বাড়ে। বিডিনিউজ বাংলানিউজসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার খবর থেকে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ।

x