প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মুখে ক্যামব্রিয়ানের সাফল্য গাঁথা

এস কে এম আরিফ

শনিবার , ১২ মে, ২০১৮ at ৬:৪০ পূর্বাহ্ণ
206

টাঙ্গাইলের মেয়ে আফিয়া আনজুম। বাবার চাকুরির সুবাদে চট্টগ্রামেই তার বেড়ে উঠা। বিএন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করে বাবার ইচ্ছাতেই ক্যামব্রিয়ান কলেজ চট্টগ্রামে ভর্তি হয়। অবশেষে ২০১৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত। ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। তার স্বপ্ন এখন অনেকটাই সত্যি। তার লালিত স্বপ্ন বাস্তবরূপ পেতে ক্যামব্রিয়ান কিভাবে সহায়ক হয়েছিল? এমন প্রশ্ন সে বলেতার অগ্রযাত্রায় পরিপূর্ণভাবে সহায়ক ছিল তার প্রিয় ক্যামব্রিয়ান। ক্যামব্রিয়ানের শি কদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে বলে ক্লাস চলাকালীন সময়ে আমাদের এক মুহূর্তের জন্যও একঘেয়েমি লাগতো না কারণ প্রতিটি বিষয়ের ক্লাস বিশেষ আঙ্গিকে সাজানো হতো যেখানে ছিল শিক্ষকদের প্রাণবন্ত সাবলীল উপস্থাপন, স্মার্ট বোর্ডে স্লাইডের মাধ্যমে বিভিন্ন টপিকের আলোচনা এবং ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বিনোদনের জন্য শিক্ষামূলক মুভি দেখানো ইত্যাদি সকল বিষয় একজন শিক্ষার্থীকে ক্লাসে পাঠে মনোযোগী করতে দারুণ সহায়ক বলে সে উল্লেখ করে। এসএসসিতে গোল্ডেন এ+ পাওয়া ক্যামব্রিয়ানের এই কৃতি শিক্ষার্থী জানায়– ‘নিয়মানুবর্তিতা’ বিষয়টা ক্যামব্রিয়ানে সব সময় চর্চা হয়। ক্লাসে শতভাগ উপস্থিতির জন্য সে পুরস্কৃত হয়েছিল বলেও সে জানায়।

সে আরও বলেনিয়মিত সাপ্তাহিক, মাসিক পরীক্ষার কারণে আমাদের ক্লাসের পড়া ক্লাসে শেষ করতে হতো। আজ পড়বনা, পরে একসাথে পড়ে নিবো এই ভাবনা বা মানসিকতা রাখার সুযোগ ক্যামব্রিয়ানে ছিল না বরং ক্লাসের পড়া ক্লাসে শেষ করার এই চাপ বা নিয়ম একজন শিক্ষার্থীকে কতটুকু পরিণত ও এগিয়ে রাখে আজকের এই অবস্থানে এসে তা আমি এখন অনভুব করি। আমার এই অবস্থানকে যদি সফল বলা হয় তবে আমার ভাষায় বলব ক্যামব্রিয়ানের সে সকল চাপ বা নিয়ম রপ্ত করেই আজকে আমি সফল। কারণ ক্লাসের বাহিরে আমি কখনও প্রাইভেট পড়িনি এবং সব সময় ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করতাম।

শিক্ষকদের হাতেকলমে যত্নসহকারে পাঠদান, কোন শিক্ষার্থী ক্লাসে না বুঝলে ছুটি শেষে বিশেষ সেশনে পুনরায় বুঝিয়ে দেয়ার রেওয়াজ শুধুমাত্র ক্যামব্রিয়ানেই রয়েছে এবং যা খুবই কার্যকরী বলে সে মনে করে। ক্যামব্রিয়ানে পড়ে কেউ ঠকবে না বরং এই প্ল্যাটফর্মে যে কোন মানের শিক্ষার্থী নিজেকে শিক্ষাদীক্ষায় পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি, কথাগুলো বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথেই বলল ক্যামব্রিয়ানের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আফিয়া আনজুম।

বিজ্ঞানের ব্যবহারিক বিষয়গুলো নিয়মিত অনুশীলনের পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল বিধায় সে রসায়ন, পদার্থ ও জীব বিজ্ঞান ব্যবহারিক বিষয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিল। যার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছে এইচএসসি ফাইনাল বোর্ড পরীক্ষায়।

তার মতে, ক্যামব্রিয়ান একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সম্পৃক্ত রাখে। যার দরুন একজন শিক্ষার্থী নেতৃত্বদানের বিভিন্ন গুণাবলী অর্জন করে ক্যাম্পাস থেকেই। তাই যে কোন শিক্ষার্থী শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, সামাজিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়। একবার ক্লাস রুমে স্বাধীনতা দিবস নিয়ে তার উপস্থিত বক্তৃতার কথা সে স্মৃতিচারণ করে। সে বলে আমার জীবনের প্রথম বক্তৃতা ছিল এটি যেখানে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে সংক্ষেপে আমাকে বলতে হয়েছিল। সেই দিন থেকে বিভিন্ন সভা সেমিনারে কথা বলার যে সাহস পেয়েছিলাম তা আমাকে এখনও অনুপ্রাণিত করে। মেয়ে হিসেবে কিভাবে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হয় এবং যে কোন প্রতিকূল পরিবেশে একজন মেয়ের প্রতিবাদী চরিত্র কি হওয়া উচিত, জীবনে চলার পথে কিভাবে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতে হয় ইত্যাদি বিষয়ে তার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক লায়লা নুর ম্যাডামের নিকট অনেক কিছুই শিখেছে বলে সে জানায়। এক কথায়শিক্ষকরাই তার জীবনের অন্যতম আদর্শ।

গোল্ডেন এ+ প্রাপ্ত হিসেবে সরকারি যে কোন কলেজে ভর্তির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাবার ইচ্ছাতেই ক্যামব্রিয়ানে ভর্তি হয় এবং সে ঠকেনি এবং কোন শিক্ষার্থীও ক্যামব্রিয়ানে পড়ে ঠকবেনা বলে আবারও যোগ করে আফিয়া।

ক্যামব্রিয়ানের আরেকজন প্রাক্তন মেধাবী শিক্ষার্থী তাকসির আহমেদ। সে বর্তমানে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত। পারিবারিক আর্থিক অসচ্ছলতার মাঝেও তার অদম্য পথচলা সত্যিই যে কোন শিক্ষার্থীর জন্য অনুকরণীয়। কথার শুরুতেই ক্যামব্রিয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে সে বলেআমার আজকের এই অবস্থানের শতভাগ কৃতিত্ব ক্যামব্রিয়ানের। কারণ ক্যামব্রিয়ান তাকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিল। এবং কঠোর অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে তার মূল্যায়ন রাখতেও সে সর্বদাই সচেষ্ট রয়েছে। উল্লেখ্য ৭ম জাতীয় রসায়ন অলিম্পিয়াডে চট্টগ্রাম বিভাগে ১ম স্থান এবং ২০১৭১৮ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষায় ১ম স্থান অর্জন করেছিল। মেডিকেল ভর্তি পরিক্ষায় কৃতকার্য হলে সে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে নিয়মিত অধ্যয়ন শুরু করে। ক্যামব্রিয়ানে সে সব সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ পেয়েছে বলে সে জানায়। যা তার জীবনে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যুগিয়েছে। যার জন্য ক্যামব্রিয়ানের শিক্ষকবৃন্দ ও সহপাঠীদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ।

শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা শেষ করে চাকুরী করতে হবে এমন মানসিকতা পরিহার করে বরং অন্য কাউকে চাকুরী দিতে হবে এমন মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে’এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে লায়ন এম কে বাশার স্যারের এমন উদ্ধৃতিতে মুগ্ধ হয়ে ক্যামব্রিয়ানে ভর্তি হয়েছিল লক্ষ্মীপুরের মেধাবী সন্তান নাঈম মাহমুদ। ক্যামব্রিয়ান থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে বর্তমানে সে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)-এ অধ্যয়নরত। ক্যামব্রিয়ানের শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারনে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করতে পারে বলে নাঈম মনে করে। গুনগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ক্যামব্রিয়ানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা মনিটরিং ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে এই শিক্ষার্থী।

সাপ্তাহিক, মাসিক যে কোন পরীক্ষা সিসি ক্যামরার মাধ্যমে কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখেন তাদের প্রিয় প্রিন্সিপাল লায়ন মাহবুব হাসান লিংকন স্যার। তাই ক্লাসে বা পরীক্ষা চলাকালীন নুন্যতম অনিয়ম করে কোন শিক্ষার্থী পার পেত না। তাই যে শিক্ষার্থী জানে পরীক্ষার হলে ডানেবামে তাকাতে পারবে না কিন্তু ভালো লিখতে হবে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষার হলে আসবে বলে তার ধারনা। তারপর আবার প্রতিটি পরীক্ষায় নির্দিষ্ট ভালো নম্বর না পেলে অভিভাবক ডেকে তার জবাবদিহিতা করতে হয়। এই সকল অনভিপ্রেত ঘটনা এড়িয়ে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ক্যামব্রিয়ানের প্রতিটি সাপ্তাহিক, মাসিক সকল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা তার নিকট অধিক সম্মান ও আনন্দের ছিল। ক্যামব্রিয়ানে এই সকল নিয়ম শৃঙ্খলাকে সে চাপ বলতে নারাজ বরং তা যে কোন শিক্ষার্থীর জন্য আশীর্বাদ বলে সে মনে করে।

এসএসসি পরীক্ষায় এ+ পেলেও সরকারি কলেজগুলোতে ভর্তি হতে না পেরে অনেকটা হতাশ ছিল নাঈম। লায়ন এম কে বাশার স্যারের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধুদের নিয়ে ক্যামব্রিয়ান কলেজ চট্টগ্রামে ঘুরতে যায়। ক্যামব্রিয়ানের সুসজ্জিত ডিজিটাল ক্লাস রুম, লাইব্রেরি, মনোরম পরিবেশ দেখে ভালো লাগে তার। অবশেষে ক্যামব্রিয়ানে ভর্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় নাঈম। সরকারি কলেজে ভর্তি হতে না পেরে তার ভেতর জেদ ছিল। তার মনের দৃঢ় ইচ্ছা এবং ক্যামব্রিয়ানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তার কাঙ্খিত সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে সে মনে করে। ক্যামব্রিয়ানে যে শুধু পড়াশুনা শিখেছি তা নয়, সহশিক্ষা কার্যক্রমেও আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। এইচএসসি ফাইনাল ব্যবহারিক পরীক্ষার পূর্বে বিভিন্ন কলেজের বন্ধুরা ব্যবহারিক বিষয় নিয়ে খুব চিন্তিত ছিল এবং অনেকেই আলাদা কোচিং করত কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমরা ব্যতিক্রম ছিলাম। কারণ ব্যবহারিক বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব সহকারে প্রথম থেকেই ক্যামব্রিয়ানের শিক্ষকদের কাছ থেকে আমরা শিখতে পেরেছিলাম। যার কারণে আমাদেরকে ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বে ব্যবহারিক বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। ক্যামব্রিয়ানে প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে তার অভিব্যক্তি জানতে চাওয়া হলে সে জানায়আমরা ক্যামব্রিয়ান পরিবারের সদস্যরা নিজেদেরকে কখনও প্রাক্তন মনে করি না। আমাদের বন্ধনটা অন্যরকম এবং আমি নিজে এখনও ক্যামব্রিয়ানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছি। অনুজদের উদ্দেশ্যে সে বলে নিজের ক্যারিয়ারের ভালোর জন্য একটু চাপ সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে। আস্তে আস্তে সে চাপ যে কোন শিক্ষার্থীকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবেই।

x